
সকালে ঘুম থেকে উঠে মেট্রোতে চড়ে কর্মক্ষেত্রে ছুটে চলা কিংবা দিনশেষে ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা হওয়া বেতনের অঙ্কটা—সবমিলিয়ে একজন সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মাপকাঠি ঠিক করে দেয় তার শহর। কিন্তু ভাবুন তো, আপনি এক শহরে কাজ করে যে বেতন পান, অন্য দেশের আরেকটি মেগাসিটির একজন কর্মী হয়তো তার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি বা কম আয় করছেন! বিশ্বের বড় বড় ৬৯টি শহরের কর্মজীবীদের কর পরবর্তী গড় মাসিক বেতনের এমনই এক রোমাঞ্চকর ও বৈষম্যমূলক চিত্র তুলে ধরেছে জনপ্রিয় অনলাইন মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ‘ভিজ্যুয়াল ক্যাপিটালিস্ট’। জার্মানির বহুজাতিক বিনিয়োগ ব্যাংক ও আর্থিক সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান ‘ডয়চে ব্যাংক’- এর মাধ্যমে সংগৃহীত নাম্বিও (বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম ক্রাউড-সোর্সড)-এর এই ডেটা বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, ভৌগোলিক অবস্থান ও অর্থনৈতিক কাঠামোর কারণে বিশ্বজুড়ে আয়ের ব্যবধানে রয়েছে আকাশ-পাতাল তফাত।
আয়ের শীর্ষে সুইজারল্যান্ডের জুরিখ:
প্রকাশিত এই র্যা ঙ্কিংয়ে বিশ্বের সব শহরকে পেছনে ফেলে তালিকার এক নম্বরে রয়েছে সুইজারল্যান্ডের অর্থনৈতিক কেন্দ্র জুরিখ. শহরটিতে একজন কর্মীর কর বাদে গড় মাসিক বেতন ৮ হাজার ৩৬৩ মার্কিন ডলার। এই পরিসংখ্যানটি বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় অত্যন্ত উচ্চ। এমনকি তালিকার একেবারে নিচের দিকে থাকা শহরগুলোর সঙ্গে তুলনা করলে এই ব্যবধান কয়েক গুণ বেশি হয়ে দাঁড়ায়। উদাহরণস্বরূপ, মিসরের রাজধানী কায়রো বা এশিয়ার বেশ কিছু শহরের সঙ্গে তুলনা করলে জুরিখের কর্মীরা প্রায় ৩৮ গুণ পর্যন্ত বেশি আয় করে থাকেন।
জুরিখের পাশাপাশি সুইজারল্যান্ডের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শহর জেনেভাও রয়েছে তালিকার ওপরের দিকে। জেনেভায় মাসিক গড় আয় ৭ হাজার ৪৪৪ মার্কিন ডলার, যা একে বৈশ্বিক তালিকার তৃতীয় স্থানে অবস্থান দিয়েছে। ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক স্থায়িত্ব এবং উচ্চ আয়ের দিক থেকে সুইজারল্যান্ডের এই দুই শহর বরাবরের মতোই বিশ্বজুড়ে শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রেখেছে।
শীর্ষ দশে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য:
বিশ্বের শীর্ষ ১০টি উচ্চ আয়ের শহরের মধ্যে চমকপ্রদভাবে আধিপত্য বিস্তার করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। তালিকার শীর্ষ দশে আমেরিকার মোট পাঁচটি শহর জায়গা করে নিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের শহরগুলোর মধ্যে সবার ওপরে এবং বৈশ্বিক তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে সান ফ্রান্সিসকো। প্রযুক্তি ও করপোরেট খাতের কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত এই শহরে কর্মীদের গড় মাসিক টেক-হোম স্যালারি বা ঘরে নেওয়ার মতো বেতন ৭ হাজার ৬০১ মার্কিন ডলার। এই অঙ্কটি আমেরিকার অন্য বড় শহরের তুলনায়ও বেশ বেশ কিছুটা বেশি। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, সান ফ্রান্সিসকোর গড় বেতন নিউইয়র্কের চেয়ে প্রায় ৩৭ শতাংশ এবং লস অ্যাঞ্জেলেসের তুলনায় প্রায় ৭০ শতাংশ বেশি।
সান ফ্রান্সিসকো ছাড়াও আমেরিকার বোস্টন শহর ৬ হাজার ২৫৮ ডলার নিয়ে চতুর্থ, নিউইয়র্ক ৫ হাজার ৫৩৪ ডলার নিয়ে পঞ্চম, শিকাগো ৪ হাজার ৯৮৪ ডলার নিয়ে সপ্তম এবং লস অ্যাঞ্জেলেস ৪ হাজার ৪৮০ ডলার নিয়ে দশম স্থান দখল করেছে। মার্কিন অর্থনীতির এই শক্ত অবস্থান দেশটির বড় শহরগুলোর কর্মসংস্থান বাজার এবং উচ্চ বেতনের চাকরিগুলোর প্রভাবকে স্পষ্ট করে তোলে।
ইউরোপ মহাদেশের ভেতরের বৈষম্য:
ইউরোপ মহাদেশের অর্থনৈতিক মানচিত্র বেশ বৈচিত্র্যময় এবং সেখানে আয়ের ক্ষেত্রে একটি স্পষ্ট বিভাজন লক্ষ্য করা যায়। একদিকে জুরিখ ও জেনেভার মতো অতি-উচ্চ আয়ের শহর রয়েছে, অন্যদিকে ইউরোপের দক্ষিণ ও পূর্বাঞ্চলের বড় বড় শহরগুলোতে গড় বেতন তুলনামূলক বেশ কম।
উত্তর ও পশ্চিম ইউরোপের দেশ ডেনমার্কের রাজধানী কোপেনহেগেনে মাসিক গড় বেতন ৪ হাজার ৭০৩ ডলার এবং নেদারল্যান্ডসের আমস্টারডামে তা ৪ হাজার ৫৫৪ ডলার। যুক্তরাজ্যের রাজধানী লন্ডনে এই পরিমাণটি ৪ হাজার ২৮৯ ডলার। তবে ইউরোপের সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত হলেও দক্ষিণ ইউরোপের শহরগুলো এই তালিকায় বেশ পিছিয়ে রয়েছে। স্পেনের মাদ্রিদ (২ হাজার ৫০৯ ডলার) ও বার্সেলোনা (২ হাজার ৩৯৪ ডলার), কিংবা ইতালির মিলান (২ হাজার ২১৬ ডলার) ও রোমের (১ হাজার ৯৯৩ ডলার) মতো ঐতিহাসিক শহরগুলো এই র্যা ঙ্কিংয়ের নিচের অর্ধে অবস্থান করছে। এমনকি জুরিখের সঙ্গে তুলনা করলে লন্ডনের বেতন প্রায় অর্ধেক এবং লিসবনের বেতন পাঁচ ভাগের এক ভাগের চেয়েও কম।
এশিয়ার শহরগুলোর বৈচিত্র্য:
এশিয়ার অর্থনৈতিক চিত্রটি আরও বেশি বৈচিত্র্যময়। এই অঞ্চলের শহরগুলোর মধ্যে মাথাপিছু বা গড় আয়ে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে সিঙ্গাপুর। সিঙ্গাপুরে একজন কর্মীর মাসিক গড় আয় ৩ হাজার ৯৭৫ মার্কিন ডলার। এর পরেই রয়েছে দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানী সিউল, যেখানে মাসিক গড় আয় ৩ হাজার ১৫ ডলার।
তবে এই তালিকায় সবচেয়ে বড় চমক দেখিয়েছে জাপানের রাজধানী টোকিও। বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম ও শক্তিশালী অর্থনৈতিক মহানগরী হওয়া সত্ত্বেও টোকিও এই ৬৯টি শহরের তালিকায় ৩৯তম অবস্থানে রয়েছে। শহরটিতে কর বাদে গড় মাসিক বেতন ২ হাজার ৩৯৪ ডলার, যা দুবাই, টরন্টো, বার্লিন কিংবা অকল্যান্ডের মতো শহরগুলোর থেকেও কম। টোকিওর এই গড় আয় জুরিখের আয়ের তিন ভাগের এক ভাগের চেয়েও কম।
এশিয়ার অন্যান্য উদীয়মান ও জনবহুল অর্থনৈতিক হাবগুলোর মধ্যে চীনের সাংহাইতে গড় বেতন ১ হাজার ৭০৮ ডলার এবং পেইচিংয়ে ১ হাজার ৫৬১ ডলার। তবে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে আয়ের চিত্র কিছুটা ভিন্ন। ভারতের ব্যাঙ্গালোর, মুম্বাই, দিল্লি কিংবা থাইল্যান্ডের ব্যাংকক, ফিলিপাইনের ম্যানিলা এবং ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তার মতো শহরগুলোতে কর্মীদের গড় মাসিক বেতন ১ হাজার ডলারের নিচে নেমে এসেছে। এর ফলে সিঙ্গাপুর ও জাকার্তার মতো দুটি এশীয় শহরের মধ্যে প্রায় ৯ গুণেরও বেশি বেতনের ব্যবধান তৈরি হয়েছে।
উচ্চ বেতন কি আসলেই স্বস্তিদায়ক?
অর্থনীতিবিদ এবং গবেষকদের মতে, এই পরিসংখ্যানগুলোতে কেবল কর্মীদের কর পরবর্তী নগদ আয়ের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। তবে শুধু বেতনের অঙ্ক দেখে কোনো শহরের জীবনযাত্রার প্রকৃত মান নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।
যেসব শহরে (যেমন—জুরিখ, সান ফ্রান্সিসকো বা নিউইয়র্ক) গড় বেতন সবচেয়ে বেশি, ঠিক একই শহরগুলোতে আবাসন, খাদ্য, যাতায়াত এবং সামগ্রিক জীবনযাত্রার ব্যয়ও বিশ্বের অন্য যেকোনো স্থানের তুলনায় অনেক বেশি। পক্ষান্তরে, কম আয়ের শহরগুলোতে জীবনযাপনের খরচ কিছুটা কম হতে পারে। তা সত্ত্বেও বৈশ্বিক শ্রমবাজার, মুদ্রার মান এবং আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সক্ষমতার একটি সামগ্রিক ও বাস্তবসম্মত দলিল হিসেবে ভিজ্যুয়াল ক্যাপিটালিস্টের এই প্রতিবেদনটি নীতিনির্ধারক ও গবেষকদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।