
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব আর সর্বগ্রাসী নদীভাঙনের কবলে পড়ে ভিটেমাটি হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়া মানুষগুলোর জীবনসংগ্রাম যেন অন্তহীন। তবে প্রকৃতির এই নিষ্ঠুর বাস্তবতার সঙ্গে লড়ে বেঁচে থাকার অনুপ্রেরণামূলক উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন ২৪ বছর বয়সী তরুণী মুক্তা বেগম। বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলার মুসলিমপাড়ার বাসিন্দা মুক্তার এই ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প কেবল একজন নারীর টিকে থাকার লড়াই নয়, বরং জলবায়ু সহনশীলতা ও নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের এক অনন্য দলিল।
নদীভাঙন ও বাস্তুচ্যুতির কষ্টার্জিত পথ :
একসময় মুক্তা বেগম ও তার পরিবার সুখেই বসবাস করতেন বাকেরগঞ্জ উপজেলার নারঙ্গল গ্রামে। কিন্তু প্রমত্ত তুলতলী নদীর ভাঙন কেড়ে নেয় তাদের পৈত্রিক ভিটেমাটি। উপায় না পেয়ে অটোরিকশাচালক স্বামী ও দুই কন্যাসন্তানকে নিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছাড়তে হয় ঘর। বর্তমান ঠিকানা উপজেলার তুলতলী নদীর তীরবর্তী মুসলিমপাড়া গ্রাম। তবে নতুন এই ঠিকানাতেও মিলছিল না স্বস্তি। এখানকার জীবনও প্রতিনিয়ত হুমকির মুখে। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস এবং নদীভাঙনের নিয়মিত আতঙ্ক নিয়েই তাদের দিন কাটাতে হয়। স্বামীর সীমিত আয়ে চার সদস্যের সংসার চালানো এবং সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে ছিলেন মুক্তা। জলবায়ু পরিবর্তনের এই ঘনঘন অভিঘাত ও সীমিত আয়ের কারণে নিরাপদ ও স্থায়ী ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা তার জন্য প্রতিদিনের কঠিন লড়াইয়ে পরিণত হয়।
পরিবর্তনের সূচনা :
মুক্তার এই কঠিন পথচলায় আশার আলো হয়ে আসে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ‘ওয়েভ ফাউন্ডেশন’-এর উদ্যোগ। সংস্থাটির বাস্তবায়নাধীন ‘স্ট্রেনথেনিং কমিউনিটি প্রিপেয়ার্ডনেস, র্যা পিড রেসপন্স অ্যান্ড রিকভারি ইন বাংলাদেশ’ প্রকল্পের আওতায় তাকে বিকল্প জীবিকায়নের জন্য সহায়তা প্রদান করা হয়। প্রকল্পের অংশ হিসেবে উপজেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মাধ্যমে তাকে হাঁস-মুরগি লালন-পালন ও খামার পরিচালনার ওপর বিশেষ ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। প্রশিক্ষণের পাশাপাশি তাকে দেওয়া হয় ১০ হাজার টাকার প্রাথমিক অনুদান।
প্রশিক্ষণলব্ধ জ্ঞান কাজে লাগিয়ে মুক্তা ব্যবসায়িক পরিকল্পনা তৈরি করেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী, তিনি অনুদানের ৮ হাজার টাকা দিয়ে ২০টি হাঁস ও ২০টি মুরগি কেনেন। বাকি ২ হাজার টাকা রেখে দেন হাঁস-মুরগির মানসম্মত খাবার ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় উপকরণের জন্য। এভাবেই তিনি নিজের বাড়িতে শুরু করেন হাঁস-মুরগি পালন খামার, যা তার পরিবারের জন্য আয়ের একটি নতুন ও টেকসই উৎস হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
পারিবারিক সচ্ছলতা :
ব্যবসাটির প্রাথমিক পর্যায় থেকেই এর সুফল পেতে শুরু করেছেন মুক্তার পরিবার। স্বামীর আয়ের ওপর এককভাবে নির্ভরশীলতা কমে যাওয়ায় এই ক্ষুদ্র উদ্যোগটি তাদের পারিবারিক অর্থনীতিতে নতুন গতি এনে দিয়েছে। খামার থেকে পাওয়া ডিম ও মাংস বিক্রির লভ্যংশ দিয়ে একদিকে যেমন সংসারে বাড়তি আয়ের যোগান হচ্ছে, অন্যদিকে তেমনি আকস্মিক জলবায়ু বিপর্যয় বা দুর্যোগের ধাক্কা সামলানোর মানসিক ও অর্থনৈতিক শক্তি অর্জন করছে পরিবারটি। দুর্যোগের সময় পারিবারিক সম্পদ রক্ষা এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় এই ক্ষুদ্র সঞ্চয় ও আয় দারুণ ভূমিকা রাখছে।
নিজের অনুভূতি প্রকাশ করে মুক্তা বেগম বলেন, ‘এই সহায়তা আমার জীবনে আয়ের এক নতুন সুযোগ এনে দিয়েছে। আমি আমার এই পোলট্রি খামারটি আরও বড় করতে চাই, যাতে পরিবারের অর্থনৈতিক চাহিদা আরও ভালোভাবে মেটাতে পারি। এই আয়ের টাকা জমিয়ে আমি ভবিষ্যতে যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় আমার পরিবারকে নিরাপদ রাখতে প্রস্তুতি নিতে পারব।’
জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার সাধারণ নারীদের যথাযথ প্রশিক্ষণ, সঠিক সম্পদ এবং সুযোগ দেওয়া হলে তারা যে নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তনের পাশাপাশি পুরো পরিবারকে আলোর পথ দেখাতে পারেন, মুক্তার এই আত্মবিশ্বাস তারই এক উজ্জ্বল প্রমাণ।
ভবিষ্যতের বড় স্বপ্ন :
আগামী দিনগুলোতে খামারটিকে আরও সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে মুক্তার। হাঁস ও মুরগির সংখ্যা পর্যায়ক্রমে বাড়িয়ে ডিম এবং মাংসের বাণিজ্যিক উৎপাদন বাড়ানোর কথা ভাবছেন তিনি। খামারের লভ্যংশ পুনর্বিনিয়োগ করে একটি বড় ও লাভজনক পোলট্রি ফার্ম গড়ে তোলাই তার মূল লক্ষ্য। এই স্থায়ী আয়ের উৎস নিশ্চিত করার মাধ্যমে তিনি একদিকে যেমন চরম দারিদ্র্য ও জলবায়ুর ঝুঁকিকে পেছনে ফেলতে চান, অন্যদিকে সন্তানদের মুখে হাসি ফোটাতে চান।
এ বিষয়ে ওয়েভ ফাউন্ডেশনের প্রকল্প সমন্বয়কারী মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে দেশের উপকূলীয় ও নদীভাঙন কবলিত এলাকার প্রান্তিক মানুষ, বিশেষ করে নারীরা সবচেয়ে বেশি অরক্ষিত হয়ে পড়েন। তাদের দীর্ঘমেয়াদে রক্ষা করতে হলে কেবল ত্রাণ সহায়তা নয়, বরং বিকল্প ও টেকসই জীবিকার সুযোগ সৃষ্টি করা অত্যন্ত জরুরি। আমরা মুক্তার মতো জলবায়ু ক্ষতিগ্রস্ত নারীদের প্রশিক্ষণ ও প্রাথমিক মূলধন দিয়ে স্বাবলম্বী করার চেষ্টা করছি, যাতে তারা যেকোনো দুর্যোগের ধাক্কা কাটিয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারেন।’