ঢাকাবুধবার , ৭ অক্টোবর ২০২৬
  1. সর্বশেষ

গ্যাসকে পেছনে ফেলে এশিয়ার জ্বালানি মানচিত্রে শীর্ষে এখন সৌরবিদ্যুৎ

প্রতিবেদক
হাসান মাহমুদ
৭ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৫৬ সকাল

Link Copied!

এশিয়ার জ্বালানি উৎপাদনে এক যুগান্তকারী বিপ্লব ঘটে গেছে। মহাদেশীয় বিদ্যুৎ উৎপাদনের মানচিত্রে জীবাশ্ম জ্বালানির দীর্ঘদিনের একাধিপত্য ভেঙে প্রথমবারের মতো প্রাকৃতিক গ্যাসকে পেছনে ফেলে শীর্ষস্থান দখল করেছে সৌরবিদ্যুৎ। যুক্তরাজ্যের খ্যাতিমান জলবায়ু গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘কার্বন ব্রিফ’-এর সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে এই ঐতিহাসিক মাইলফলক উন্মোচিত হয়েছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কার্বন নিঃসরণ কমানোর বৈশ্বিক অঙ্গীকার এবং সস্তা প্রযুক্তির সুবাদে এশিয়ার দেশগুলোতে সোলার বিপ্লব যে কতটা দ্রুতগতিতে এগোচ্ছে, এই পরিসংখ্যান তারই এক উজ্জ্বল প্রমাণ।

এশিয়ার বিদ্যুতের বাজারে সলারের নতুন যুগ :
কার্বন ব্রিফের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে যে, এশিয়া মহাদেশজুড়ে গত কয়েক বছরে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতার যে অভূতপূর্ব বিস্তার ঘটেছে, তা বিগত যেকোনো দশকের চেয়ে বহুগুণ বেশি। এক সময় যে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোকে এশিয়ার দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতিগুলোর মূল চালিকাশক্তি মনে করা হতো, তা আজ নবায়নযোগ্য শক্তির বিশেষ করে সৌরশক্তির কাছে জায়গা হারাচ্ছে। চীন, ভারত এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার উদীয়মান অর্থনীতিগুলোর নিরবচ্ছিন্ন প্রচেষ্টায় এই পরিবর্তন দ্রুত ত্বরান্বিত হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, সৌরবিদ্যুতের এই জয়যাত্রা কেবল একটি পরিসংখ্যানগত পরিবর্তন নয়; এটি বৈশ্বিক জ্বালানি সুরক্ষার ক্ষেত্রে এক বড় মোড় পরিবর্তনকারী ঘটনা। ঐতিহ্যগতভাবে গ্যাস বা কয়লার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল এশিয়া অঞ্চল তাদের শক্তি উৎপাদনের ভিত্তি পুনর্গঠন করছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে গ্যাসের দামের অস্থিরতা এবং সরবরাহ চেইনের সংকট এশিয়ার দেশগুলোকে বিকল্প ও দেশীয় নবায়নযোগ্য শক্তির দিকে ঝুঁকতে বাধ্য করেছে।

সাফল্যের নেপথ্যে চীন ও ভারতের ভূমিকা :
এশিয়ার এই জ্বালানি রূপান্তরের কেন্দ্রে রয়েছে মূলত দুটি পরাশক্তি—চীন এবং ভারত। বিশ্বের বৃহত্তম সৌর প্যানেল উৎপাদনে থাকা চীন গত কয়েক বছর ধরে নিজেদের অভ্যন্তরীণ বাজারে রেকর্ড পরিমাণে সোলার ইনস্টল করেছে। দেশটির প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে শুরু করে বিশাল শিল্পাঞ্চল পর্যন্ত সর্বত্র এখন ছাদভিত্তিক ও গ্রিড-সংযুক্ত সৌর পার্কের ছড়াছড়ি। চীনের এই ব্যাপক উৎপাদনের ফলে বিশ্ববাজারে সোলার প্যানেলের দাম উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে, যা এশিয়ার অন্যান্য দেশের পক্ষে সৌরপ্রযুক্তি সাশ্রয়ী মূল্যে গ্রহণ করা সহজ করে তুলেছে।

অন্যদিকে, ভারতও এই প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে নেই। দেশটির বিশাল ভৌগোলিক অবস্থান এবং রোদেলা আবহাওয়াকে কাজে লাগিয়ে সৌরশক্তিতে বড় ধরনের বিনিয়োগ করা হয়েছে। ভারতের লক্ষ্য হলো ২০৩০ সালের মধ্যে অ-জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে অন্তত ৫০০ গিগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা। রাজস্থান ও গুজরাটের মতো শুষ্ক অঞ্চলে বিশাল সব মেগা সোলার পার্ক স্থাপন করা হয়েছে, যা দেশের সামগ্রিক গ্রিডে প্রচুর পরিমাণে পরিচ্ছন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে। এই দুই দেশের হাত ধরেই এশিয়া অঞ্চল আজ গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকে পেছনে ফেলতে সক্ষম হয়েছে।

পরিবেশগত এবং অর্থনৈতিক সুফল :
গ্যাসকে পেছনে ফেলে সৌরবিদ্যুতের এই অগ্রযাত্রা পরিবেশের জন্য স্বস্তির খবর। জীবাশ্ম জ্বালানির পোড়ানোর ফলে যে পরিমাণ কার্বন ডাই-অক্সাইড বায়ুমণ্ডলে নির্গত হয়, সৌরবিদ্যুৎ তার তুলনায় সম্পূর্ণ পরিচ্ছন্ন ও পরিবেশবান্ধব। কার্বন ব্রিফের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এশিয়ার এই পরিবর্তন বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধিকে ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার লক্ষ্যমাত্রাকে বাঁচিয়ে রাখতে বড় ধরনের অবদান রাখছে।

অর্থনৈতিক দিক থেকেও সৌরবিদ্যুতের সুফল পাচ্ছে এশিয়া। একসময় সোলার প্রযুক্তির প্রাথমিক স্থাপন ব্যয় অনেক বেশি মনে হলেও, বর্তমানে প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের কারণে এর উৎপাদন খরচ জীবাশ্ম জ্বালানির চেয়েও অনেক নিচে নেমে এসেছে। এর ফলে দীর্ঘমেয়াদে বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ কমার পাশাপাশি আমদানিকৃত গ্যাসের ওপর দেশের নির্ভরতা হ্রাস পাচ্ছে। বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় হচ্ছে এবং দেশীয় পর্যায়ে বিশাল সবুজ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে, যা সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে গতিশীল করছে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট:
এশিয়ার সামগ্রিক এই জ্বালানি রূপান্তরের ধারার বাইরে নয় বাংলাদেশ। বরং ক্রমবর্ধমান শক্তি সংকট, গ্যাসের তীব্র ঘাটতি এবং এলএনজি আমদানির উচ্চমূল্যের কারণে বাংলাদেশের জন্যও সৌরবিদ্যুতায়ন এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। দেশের প্রচলিত বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থা মূলত প্রাকৃতিক গ্যাস এবং আমদানিকৃত তেল ও কয়লার ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলোতে উৎপাদন হ্রাসের ফলে বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর জন্য জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের বিশেষজ্ঞরা বারবার সৌরবিদ্যুৎ ও নবায়নযোগ্য শক্তির দিকে মনোযোগ দেওয়ার তাগিদ দিয়ে আসছেন। সরকারের পক্ষ থেকেও রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র বা কয়লা প্রকল্পের পাশাপাশি সোলার এনার্জিতে জোর দেওয়া হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিশেষ করে ছাদভিত্তিক সোলার এবং সৌর সেচ পাম্পের ব্যবহার বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। দেশের বড় বড় শিল্প কারখানায়, বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতের অনেক প্রতিষ্ঠান এখন তাদের নিজস্ব কারখানার ছাদ ও প্রাঙ্গণে সোলার প্যানেল স্থাপন করে নিজস্ব বিদ্যুতের চাহিদা মেটাচ্ছে এবং উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করছে।

তবে এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় বড় পরিসরে মেগা সোলার পার্ক স্থাপনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশে জমির স্বল্পতা একটি বড় বাধা। ঘনবসতিপূর্ণ এই দেশে কৃষিজমি নষ্ট করে বিশাল সৌর পার্ক করা কঠিন। এই সমস্যার সমাধানে বিশেষজ্ঞরা ভাসমান সোলার প্ল্যান্ট, উপকূল ও চরাঞ্চলের অনাবাদী জমি এবং দেশের জলসীমায় সৌরপ্রযুক্তি ব্যবহারের ওপর জোর দিচ্ছেন। এছাড়া সরকারি প্রণোদনা এবং সহজ শর্তে ঋণ প্রাপ্তি নিশ্চিত করা গেলে গৃহস্থালী পর্যায়েও সোলার সিস্টেমের ব্যবহার বহুগুণ বাড়িয়ে দেওয়া সম্ভব।

করণীয় ও টেকসই জ্বালানি নিরাপত্তা :
পরিবেশ ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ভবিষ্যতের পৃথিবী জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর টিকে থাকতে পারবে না। এশিয়া যেভাবে গ্যাসকে পেছনে ফেলে সোলার শক্তির হাত ধরে এগিয়ে চলেছে, বাংলাদেশকে তার বর্তমান সংকট কাটিয়ে উঠতে এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলাতে হবে। শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের ঘাটতি মেটানো নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদী জ্বালানি নিরাপত্তা ও কার্বন নিঃসরণ হ্রাসের আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতি রক্ষার্থে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।

সোলার প্রযুক্তির কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক ছাড় দেওয়া এবং গবেষণার মাধ্যমে প্রযুক্তির উন্নয়ন ঘটানো গেলে বাংলাদেশও খুব দ্রুত নবায়নযোগ্য জ্বালানির এই বৈশ্বিক বিপ্লবের সুফল ঘরে তুলতে পারবে। এশিয়ার অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশও যদি যথাযথ নীতি সহায়তা এবং সময়োপযোগী পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারে, তবে গ্যাস বা কয়লার ওপর নির্ভরতা কমিয়ে একটি পরিচ্ছন্ন, সবুজ ও টেকসই জ্বালানি নির্ভর ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা অসম্ভব কিছু নয়।

Facebook Comments Box

আরও পড়ুন

দখলমুক্ত মিরপুর-১০, ফুটপাতে ফিরেছে স্বস্তি

গ্যাসকে পেছনে ফেলে এশিয়ার জ্বালানি মানচিত্রে শীর্ষে এখন সৌরবিদ্যুৎ

সড়ক দুর্ঘটনায় তাৎক্ষণিক চিকিৎসায় ভূমিকা রাখছে স্বেচ্ছাসেবকরা

ল্যাবরেটরির নিঃসঙ্গ রাত থেকে বিজ্ঞানী কার্ল ডেইসারথের নোবেলের জয়

দেশে শব্দদূষণ কমাতে ১ লাখ ৩৯ হাজারের বেশি মানুষকে প্রশিক্ষণ

রাজশাহীতে ৪৮৯ মণ্ডপে দুর্গাপূজার প্রস্তুতি, বরাদ্দ ২৮৯ টন চাল

মৎস্য খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর পাশাপাশি অপচয় বন্ধে জবাবদিহিতা নিশ্চিতের আহ্বান

২২ জেলায় গড়ে উঠছে ‘শিশু স্বর্গ’: স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী

দুর্গম এলাকার মানুষের স্বাস্থ্য-পরিচ্ছন্নতায় ইউনিলিভার-ফ্রেন্ডশিপের নতুন উদ্যোগ

শিশুদের শৈশব নিরাপদ ও ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করার আহ্বান ডা. জুবাইদার

সৈকতে ইজিবাইকের চাকায় ওড়না পেঁচিয়ে নারী পর্যটকের মৃত্যু

জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি দেখতে টুভালুতে বিশ্বনেতারা