
গর্ভাবস্থায় মা ও শিশুর জন্য প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে প্রিক্ল্যাম্পসিয়া। উচ্চ রক্তচাপসহ নানা জটিলতার মাধ্যমে এ রোগ দেখা দিলেও এর সঠিক কারণ এতদিন পুরোপুরি জানা যায়নি। নতুন এক গবেষণায় বিজ্ঞানীরা VGLL3 নামের একটি জিনের অস্বাভাবিক কার্যক্রমকে প্রিক্ল্যাম্পসিয়ার সম্ভাব্য মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এই আবিষ্কার ভবিষ্যতে রোগটির আরও নির্ভুলভাবে শনাক্তকরণ, চিকিৎসা এবং এমনকি প্রতিরোধের পথ খুলে দিতে পারে বলে আশা করছেন গবেষকরা।
গবেষণাটি যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব মিশিগানের গবেষকদের নেতৃত্বে পরিচালিত হয়েছে এবং এর ফলাফল Circulation জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, VGLL3 জিনের অনিয়মিত কার্যক্রম প্ল্যাসেন্টার গুরুত্বপূর্ণ কোষগুলোর স্বাভাবিক কাজকে ব্যাহত করতে পারে। ফলে গর্ভাবস্থায় মায়ের শরীরে প্রিক্ল্যাম্পসিয়ার মতো জটিলতা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে।
প্রিক্ল্যাম্পসিয়া সাধারণত গর্ভাবস্থার ২০ সপ্তাহের পর উচ্চ রক্তচাপের মাধ্যমে প্রকাশ পায়। এর সঙ্গে মাথাব্যথা, শ্বাসকষ্ট, বমি বমি ভাব ও বিভ্রান্তির মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। গুরুতর অবস্থায় এটি অকাল প্রসব, মা ও ভ্রূণের জটিলতা এমনকি মৃত্যুর কারণ হতে পারে।
বর্তমানে প্রিক্ল্যাম্পসিয়ার নির্দিষ্ট কোনো নিরাময় নেই। গুরুতর পরিস্থিতিতে সন্তান প্রসব করানোই মূল চিকিৎসা পদ্ধতি। তবে সন্তান প্রসবের পরও মায়ের দীর্ঘমেয়াদে হৃদরোগ, স্ট্রোকসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকি থেকে যেতে পারে।
নতুন গবেষণায় বিজ্ঞানীরা মূলত প্ল্যাসেন্টার বিশেষ ধরনের কোষ ট্রফোব্লাস্ট নিয়ে কাজ করেছেন। গর্ভাবস্থায় এসব কোষ ভ্রূণকে জরায়ুর দেয়ালে স্থাপন এবং প্ল্যাসেন্টায় প্রয়োজনীয় রক্তনালির বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পাশাপাশি তারা এমন কিছু সংকেতবাহী উপাদান তৈরি করে, যা মায়ের রক্তে প্রবেশ করতে পারে।
গবেষকদের মতে, ট্রফোব্লাস্টের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হলে প্ল্যাসেন্টায় রক্তপ্রবাহের সমস্যা তৈরি হতে পারে। এর সঙ্গে প্রিক্ল্যাম্পসিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বায়োমার্কার sFLT-1-এর সম্পর্ক রয়েছে। এই প্রোটিনের অস্বাভাবিক মাত্রা রক্তনালির কার্যকারিতায় সমস্যা তৈরির সঙ্গে যুক্ত।
২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন (FDA) এমন একটি রক্ত পরীক্ষার অনুমোদন দেয়, যা sFLT-1সহ নির্দিষ্ট বায়োমার্কার শনাক্ত করে প্রিক্ল্যাম্পসিয়ার ঝুঁকি সম্পর্কে ধারণা দিতে পারে। তবে এই পরীক্ষা রোগটি শনাক্ত করতে সহায়তা করলেও প্ল্যাসেন্টার কোষে ঠিক কী কারণে এই পরিবর্তন ঘটে, তা পুরোপুরি ব্যাখ্যা করতে পারে না।
গবেষকদের ধারণা, VGLL3 সেই রহস্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে। এই জিনটি নারীদের ত্বক ও প্ল্যাসেন্টা উভয় জায়গাতেই সক্রিয় থাকে। শুরুতে নারীদের অটোইমিউন রোগে আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে VGLL3 নিয়ে কাজ করছিলেন বিজ্ঞানীরা। পরে প্রিক্ল্যাম্পসিয়ার সঙ্গে এর সম্ভাব্য সম্পর্কের বিষয়টি সামনে আসে।
গবেষক জোহান গুডজনসনের নেতৃত্বে পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে, VGLL3-এর অনিয়ন্ত্রিত কার্যক্রম প্ল্যাসেন্টার কোষের স্বাভাবিক বিকাশ ও কার্যক্রমে প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে প্রিক্ল্যাম্পসিয়ার পেছনে এতদিন অজানা থাকা একটি গুরুত্বপূর্ণ জৈবিক প্রক্রিয়ার সন্ধান পাওয়া গেছে বলে মনে করছেন তারা।
গবেষণায় যুক্ত বিশেষজ্ঞদের মতে, এই আবিষ্কার আরও গবেষণার মাধ্যমে কার্যকর চিকিৎসা তৈরির সুযোগ তৈরি করতে পারে। ভবিষ্যতে VGLL3-এর কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করা গেলে প্রিক্ল্যাম্পসিয়া প্রতিরোধ বা চিকিৎসার নতুন পদ্ধতি তৈরি সম্ভব হতে পারে।
তবে গবেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, এখনই এটিকে প্রিক্ল্যাম্পসিয়ার নিশ্চিত কারণ বা নিরাময় হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না। মানুষের ওপর আরও গবেষণা ও ক্লিনিক্যাল পরীক্ষা প্রয়োজন। তবে এই আবিষ্কার গর্ভাবস্থার অন্যতম জটিল ও প্রাণঘাতী সমস্যাটির রহস্য উন্মোচনে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তথ্যসুত্র: ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক