ঢাকাবুধবার , ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  1. সর্বশেষ

আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমছে, বাংলাদেশে কেন বাড়ল?

প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক
২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১:০৮ বিকাল

Link Copied!

আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম কমতে শুরু করেছে। বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ৯৮ দশমিক ১৬ ডলারে নেমেছে, যা আগের দিনের তুলনায় ১ দশমিক ১ শতাংশ কম। একই সময়ে ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের (ডব্লিউটিআই) দাম ১ দশমিক ৬৭ শতাংশ কমে ৮৯ দশমিক ১ ডলারে দাঁড়িয়েছে। সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতির আশা এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনার সম্ভাবনা আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমার অন্যতম কারণ হিসেবে কাজ করছে।

অন্যদিকে, বাংলাদেশে ২১ সেপ্টেম্বর থেকে ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রোল ও অকটেনের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা করে বাড়ানো হয়েছে। এতে ডিজেলের দাম ১১৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৩৫ থেকে ১৫৫ টাকা, পেট্রোল ১৪০ থেকে ১৬০ টাকা এবং অকটেন ১৪৫ থেকে ১৬৫ টাকা হয়েছে।

তাহলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমার সময় বাংলাদেশে কেন দাম বাড়ানো হলো?

একদিনের আন্তর্জাতিক দাম দিয়ে বাংলাদেশের মূল্য নির্ধারণ হয় না

এর অন্যতম কারণ হলো, বাংলাদেশের ২১ সেপ্টেম্বরের মূল্য সমন্বয়টি ২৩ সেপ্টেম্বরের আন্তর্জাতিক বাজারদরের ওপর ভিত্তি করে নেওয়া হয়নি। মূল্যবৃদ্ধির সময় আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় কয়েক মাস ধরে বাড়ছিল।

সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, মার্চ থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। একই সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে জাহাজভাড়া বা ফ্রেইট চার্জও অনেক বেড়েছে। ফলে বাংলাদেশে জ্বালানি আমদানির মোট ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) চেয়ারম্যান ড. মো. রফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, মার্চ থেকে ছয় মাসে আন্তর্জাতিক জ্বালানি মূল্য ও ফ্রেইট চার্জ বৃদ্ধির কারণে জ্বালানি আমদানিতে অতিরিক্ত প্রায় ২৩ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করতে হয়েছে। এই সময়ে মাসে অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে গড়ে প্রায় ৩ হাজার ৮১৩ কোটি টাকা।

ফ্রেইট চার্জ বেড়েছে কয়েক গুণ

শুধু জ্বালানির আন্তর্জাতিক দাম নয়, তা বাংলাদেশে নিয়ে আসার খরচও বেড়েছে। বিপিসি চেয়ারম্যানের তথ্য অনুযায়ী, আগে প্রতি ইউনিট জ্বালানি পরিবহনে ফ্রেইট চার্জ ছিল প্রায় ৩ থেকে ৪ ডলার। মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের পর তা বেড়ে ১৫ থেকে ১৭ ডলারে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ পরিবহন ব্যয় প্রায় চার থেকে পাঁচ গুণ বেড়েছে।

ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের মূল দাম কিছুটা কমলেও আমদানি ব্যয়ের পুরো হিসাব একই সময়ে কমে যায় না।

ছয় মাসে বিপিসির লোকসান ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি টাকা

দাম না বাড়িয়ে দীর্ঘ সময় জ্বালানি বিক্রি করায় বিপিসির ওপর বড় ধরনের লোকসান জমেছে।

জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী আনিন্দ্য ইসলাম আমিত জানিয়েছেন, মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত ছয় মাসে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে দেশের জ্বালানির দাম পুরোপুরি সমন্বয় না করায় বিপিসির লোকসান হয়েছে ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ প্রতি মাসে গড়ে লোকসান হয়েছে প্রায় ৩ হাজার ৮১৩ কোটি টাকা।

প্রতিমন্ত্রীর হিসাবে, আন্তর্জাতিক বাজারের দামের সঙ্গে পুরোপুরি সমন্বয় করা হলে দেশে ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি প্রায় ২০৫ টাকা হতে পারত। তবে সরকার দাম বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা করেছে। ফলে নতুন দামেও প্রতি লিটার ডিজেলে সরকারের প্রায় ৭০ টাকা বহন করার বিষয়টি উল্লেখ করেছেন তিনি।

আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কেন আগে বেড়েছিল?

বাংলাদেশে দাম বাড়ানোর আগে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছিল। এর পেছনে মূলত মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ কাজ করেছে।

১৫ সেপ্টেম্বর ব্রেন্ট ক্রুডের দাম এক পর্যায়ে ব্যারেলপ্রতি ১০৬ দশমিক ৯৩ ডলারে উঠেছিল। সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ তেল অবকাঠামোয় হামলা এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগের কারণে তখন বাজারে দাম বাড়ছিল।

অর্থাৎ বাংলাদেশের ২১ সেপ্টেম্বরের মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্তের সময় আন্তর্জাতিক বাজারের সামগ্রিক পরিস্থিতি ছিল কয়েক সপ্তাহ আগের তুলনায় অনেক বেশি ব্যয়বহুল।

তাহলে ২৩ সেপ্টেম্বর দাম কমছে কেন?

২৩ সেপ্টেম্বরের দরপতন মূলত নতুন কিছু বাজার পরিস্থিতির কারণে হয়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌদি আরব গুরুত্বপূর্ণ একটি পাইপলাইনের কার্যক্রম পুনরায় শুরু করায় উপসাগরীয় অঞ্চলে সরবরাহ পরিস্থিতি উন্নত হওয়ার আশা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনাও বাজারে আশাবাদ তৈরি করেছে। এসব কারণে ব্রেন্ট ও ডব্লিউটিআইয়ের দাম কমেছে।

তাই ২৩ সেপ্টেম্বরের এই দরপতনকে ২১ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক হিসেবে দেখলে পুরো পরিস্থিতি পাওয়া যাবে না। বাংলাদেশের মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্তে আগের কয়েক মাসের আন্তর্জাতিক দাম ও আমদানি ব্যয়ের চাপ গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

জ্বালানি পাচারের ঝুঁকিও সরকারের বিবেচনায়

মূল্যবৃদ্ধির আরেকটি কারণ হিসেবে সরকার সীমান্তপথে জ্বালানি পাচারের ঝুঁকির কথা জানিয়েছে।

জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, বাংলাদেশে জ্বালানির দাম তুলনামূলক কম থাকায় প্রতিবেশী দেশগুলোতে পাচারের একটি প্রণোদনা তৈরি হচ্ছিল। একই সঙ্গে আমদানি করা জ্বালানির মূল্য পরিশোধ করতে বৈদেশিক মুদ্রার প্রয়োজন হয়। ফলে বিপিসির লোকসান ও বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ কমাতেও মূল্য সমন্বয়ের প্রয়োজন হয়েছে বলে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থার সঙ্গে বিষয়টি কীভাবে যুক্ত?

বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জ্বালানির দাম সমন্বয়ের ব্যবস্থা রয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারের প্রতিটি দিনের দর দেশের বাজারে তাৎক্ষণিকভাবে প্রতিফলিত হয় না। আমদানি ব্যয়, আন্তর্জাতিক জ্বালানির দাম এবং পরিবহন ব্যয়ের সামগ্রিক পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে দেশের দাম সমন্বয় করা হয়।

সরকারের বক্তব্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ার পরও বাংলাদেশ দীর্ঘ সময় দেশের ভোক্তাদের ওপর পুরো চাপটি দেয়নি। ফলে বিপিসি নিজস্ব অর্থ থেকে বড় ধরনের লোকসান বহন করেছে।

সামনে আন্তর্জাতিক দাম কমলে বাংলাদেশেও দাম কমবে?

এটি নির্ভর করবে আন্তর্জাতিক জ্বালানির দাম, ফ্রেইট চার্জ এবং সামগ্রিক আমদানি ব্যয়ের ওপর। ২৩ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক বাজারে যে দরপতন দেখা যাচ্ছে, তা যদি স্থায়ী হয় এবং বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানির মোট ব্যয়ও কমে আসে, তাহলে পরবর্তী মূল্য সমন্বয়ে তার প্রভাব পড়ার সুযোগ রয়েছে।

তবে মাত্র এক বা দুই দিনের আন্তর্জাতিক দরপতন দিয়ে দেশের বাজারে তাৎক্ষণিকভাবে একই হারে দাম কমার সিদ্ধান্ত হবে—এমনটা ধরে নেওয়া ঠিক হবে না।

বাংলাদেশে ২১ সেপ্টেম্বর জ্বালানির দাম বাড়ানোর মূল ব্যাখ্যা ২৩ সেপ্টেম্বরের আন্তর্জাতিক বাজারের দরপতন নয়। মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে কয়েক মাস ধরে আন্তর্জাতিক জ্বালানি মূল্য ও পরিবহন ব্যয় বেড়েছিল। এর ফলে মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত ছয় মাসে বিপিসির লোকসান দাঁড়ায় ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি টাকা এবং জ্বালানি আমদানিতে অতিরিক্ত ব্যয় হয় প্রায় ২৩ হাজার কোটি টাকা। একই সময়ে ফ্রেইট চার্জও কয়েক গুণ বেড়েছিল।

অন্যদিকে, ২৩ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমেছে মূলত সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতির আশা এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনার সম্ভাবনার কারণে।

Facebook Comments Box

আরও পড়ুন

পাসপোর্ট হারালে এবার দিতে হবে বাড়তি ১০ হাজার টাকা!

‘জলবায়ু পদক্ষেপ রাজনীতির জন্যও ভালো’-ব্রিটিশ জলবায়ুমন্ত্রী

জরুরি ঝুঁকি মোকাবিলায় সহনশীল কৃষিখাদ্য ব্যবস্থা গড়ার আহ্বান পরিবেশমন্ত্রীর

ভাটারায় দ্রুতগতির ট্রাকের ধাক্কায় মোটরসাইকেলচালক নিহত

বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরার ট্রলার ডুবে নিখোঁজ ২, উদ্ধার ১১ জেলে

অটোরিকশার চাকার নিচে পিষ্ট হয়ে ৫ বছরের শিশুর মৃত্যু

সংঘাত তীব্র হওয়ায় ইয়েমেনে বড় ধরনের শরণার্থী সংকটের আশঙ্কা

স্বাধীন তদারকি ও জবাবদিহিতা নিয়ে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর উদ্বেগ

ডেঙ্গু চিকিৎসায় ৪০ জেলায় ১ হাজার ৬০০ চিকিৎসককে বিশেষ প্রশিক্ষণ

হামের উপসর্গে আরও ২ শিশুর মৃত্যু

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় বাড়ল বাসভাড়া

899 Public Transport Drivers Trained Under BRTA and DAM Initiative