
২০১৭ সালের নভেম্বর-ডিসেম্বরে শীতে কক্সবাজারের কুতুপালং শরণার্থী ক্যাম্পে যখন হঠাৎ করেই ডিফথিরিয়া ছড়িয়ে পড়েছিল, তখন আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলেন স্বাস্থ্যকর্মী ও রোহিঙ্গারা। ক্যাম্পের ঘিঞ্জি একটি তাঁবুতে দুই সন্তানকে বুকে আগলে বসে থাকা ফাতেমা খাতুনের দিন কাটছিল চরম উৎকণ্ঠায়। বড় মেয়েটির গলায় তীব্র ব্যথা আর শ্বাসকষ্ট দেখা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তাকে স্থানীয় একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু সে সময় স্বাস্থ্যকেন্দ্রে কাগজে-কলমে রোগীর তথ্য নথিভুক্ত করার যে সনাতন ও ধীরগতির ব্যবস্থা ছিল, তাতে ফাতেমা খাতুনের মেয়ের প্রাথমিক রেজিস্ট্রেশন এবং তথ্য পৌঁছাতেই কয়েক দিন সময় লেগে যায়। ততক্ষণে এই সংক্রামক রোগ ক্যাম্পের আরও বহু শিশুর মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। চিকিৎসায় বিলম্বের কারণে ক্যাম্পের বহু পরিবার তাদের প্রিয়জনকে হারিয়েছিল—যে বেদনা আজও তাড়িয়ে বেড়ায় সেই জনপদের মানুষদের।
কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় সেই চিত্র এখন সম্পূর্ণ বদলে গেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এবং বাংলাদেশ সরকারের যৌথ উদ্যোগে কক্সবাজারের শরণার্থী ক্যাম্পগুলোতে প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় চালু হওয়া ডিজিটাল স্বাস্থ্য টুল ‘গো-ডেটা’ আজ ফাতেমা খাতুনদের মতো লাখো মানুষের জীবনে এক সুরক্ষার প্রাচীর গড়ে তুলেছে।
সম্প্রতি ডব্লিউএইচও‘র এক বিশেষ প্রতিবেদনে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্প ও স্থানীয় কমিউনিটিতে রোগ প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় ডিজিটাল স্বাস্থ্য টুল ‘গো-ডেটা’-এর সফল ব্যবহার এবং এর যুগান্তকারী প্রভাব তুলে ধরা হয়েছে। বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ এবং চ্যালেঞ্জিং মানবিক সংকটের এই অঞ্চলে রোগ সংক্রমণ রোধে এই প্রযুক্তি কীভাবে একটি রূপান্তরকারী ভূমিকা রেখেছে, তার বিস্তারিত বিবরণ এই প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
কক্সবাজারের শরণার্থী ক্যাম্পগুলো বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ মানবিক এলাকা হিসেবে পরিচিত, যেখানে অত্যন্ত সীমিত সুযোগ-সুবিধা এবং ঘিঞ্জি পরিবেশে ১২ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থী বসবাস করছেন। এই ধরনের জনবহুল ও প্রতিকূল পরিস্থিতিতে যেকোনো সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে। দেখা গেছে, এসব ক্যাম্পে প্রাদুর্ভাবগুলো প্রচলিত কাগজ-কলমের নজরদারি বা সনাতন পদ্ধতির চেয়ে অনেক দ্রুতগতিতে বিস্তার লাভ করে।
২০১৭ সালে যখন ক্যাম্পগুলোতে ডিফথিরিয়ার মারাত্মক প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়, তখন এক সপ্তাহেই নিশ্চিত রোগীর সংখ্যা ৫০ জনে গিয়ে ঠেকে এবং পরবর্তীতে আরও বড় আকারে তা ছড়িয়ে পড়ে। তখন স্বাস্থ্যকর্মী ও রেসপন্স টিমগুলোর কাছে সময়মতো নির্ভরযোগ্য বা কার্যকর ডেটা না থাকায় সঠিক পদক্ষেপে বড় ধরনের বিলম্ব হচ্ছিল। কাগজ-নির্ভর পুরোনো পদ্ধতিতে রোগীর প্রাথমিক তথ্য বা রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন করতেই তিন দিন পর্যন্ত সময় লেগে যেত, অথচ এই দীর্ঘ সময়ে রোগের সংক্রমণ বিনা বাধায় আরও অনেকের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ত।
এই সংকটজনক পরিস্থিতির স্থায়ী ও কার্যকরী সমাধানের লক্ষ্যে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, বাংলাদেশ সরকার এবং অংশীদারী সংস্থাগুলোর যৌথ উদ্যোগে ২০১৯ সালের শেষভাগে চালু করা হয় ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ‘গো-ডেটা’। বৈশ্বিক মহামারি ও প্রাদুর্ভাব সতর্কতা ও গ্লোবাল আউটব্রেক অ্যালার্ট অ্যান্ড রেসপন্স নেটওয়ারর্ক (জিওএআরএ)-এর মাধ্যমে এটি বিকশিত হয়েছিল।
এই প্ল্যাটফর্মের মূল কাজ হলো রোগ শনাক্তকরণ ও নজরদারিতে আধুনিক ডিজিটাল প্রযুক্তির ছোঁয়া আনা। এর মাধ্যমে ডিজিটাল ডিভাইসের (মোবাইল) সাহায্যে সহজে কেস এন্ট্রি করা যায়, স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রাদুর্ভাবের সূচকগুলো (আউটব্রেক ইন্ডিকেটরস) তৈরি হয় এবং সংক্রমণের চেইন বা ধারা নিখুঁতভাবে চিত্রায়ন (ভিজ্যুয়ালাইজ) করা সম্ভব হয়। এর ফলে নজরদারি দলগুলো দ্রুততার সঙ্গে রোগীর ক্লাস্টার বা ক্লাস্টারভিত্তিক সংক্রমণগুলো চিহ্নিত করতে পারে এবং সেই অনুযায়ী দ্রুত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে সক্ষম হয়।
রোগ তদন্তে রিয়েল-টাইম ডেটার বিপ্লব:
আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম)-এর ন্যাশনাল হেলথ অফিসার ডা. আবেদ হাসান এই ডিজিটাল রূপান্তরের বিষয়ে বলেন, ‘২০১৭ সালের ডিফথিরিয়া প্রাদুর্ভাবের সময় কাগজভিত্তিক সনাতন ব্যবস্থা আমাদের রেসপন্স কার্যক্রমে মারাত্মক বিলম্ব ঘটিয়েছিল এবং সমন্বয়হীনতা তৈরি করেছিল। কিন্তু ‘গো-ডেটা’ রোগতাত্ত্বিক তদন্ত বা আউটব্রেক ইনভেস্টিগেশনকে একটি দ্রুতগতির এবং ডেটা-চালিত কার্যক্রমে রূপান্তরিত করেছে।’
প্রথাগত রিপোর্টিংয়ের সীমাবদ্ধতা দূর করে ‘গো-ডেটা’ মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীদের কাজের গতি বহুলাংশে বাড়িয়ে দিয়েছে। এমনকি কম সংযোগ বা নিম্ন ইন্টারনেটের (লো-কানেকটিভিটি) পরিবেশেও এর অফলাইন কার্যকারিতা এবং মানসম্মত কর্মপ্রবাহ এটিকে রোগতাত্ত্বিক (এপিডেমিওলজিক্যাল) রিপোর্টিংয়ের জন্য অত্যন্ত উপযোগী করে তুলেছে।
মৃত্যুর হার হ্রাস ও রোগের সফল নিয়ন্ত্রণ:
ডিজিটাল এই পদ্ধতির সবচেয়ে বড় সাফল্য দেখা গেছে জীবন রক্ষা এবং রোগ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে। কাগজভিত্তিক ধীরগতির ব্যবস্থার অবসান ঘটিয়ে যখন ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ডেটা বিশ্লেষণ ও কন্টাক্ট ট্রেসিং শুরু হলো, তখন তা ক্যাম্পগুলোতে রোগের মৃত্যুহার কমাতে সরাসরি ভূমিকা রাখল।
ডিফথিরিয়া নিয়ন্ত্রণ: ডিফথিরিয়া প্রাদুর্ভাবের ক্ষেত্রে দেখা যায়, ২০১৭ সালে যেখানে ৩০ জন এবং ২০১৮ সালে ১৪ জনের মৃত্যু হয়েছিল, সেখানে ২০১৯ সালে তা মাত্র তিনজনে নেমে আসে। পরবর্তীতে ২০২০ সালে এই সংখ্যা শূন্যে নেমে আসে, ২০২১ সালে পাঁচজন এবং ২০২৪-২০২৫ সালের মধ্যে তা শূন্যের কোঠায় পৌঁছায়। দ্রুত কেস শনাক্তকরণ, সময়মতো কন্টাক্ট ট্রেসিং এবং দ্রুত ক্লিনিক্যাল ইন্টারভেনশনের ফলেই এই অভাবনীয় সাফল্য অর্জন সম্ভব হয়েছে।
কোভিড-১৯ মহামারি মোকাবিলা: পরবর্তী সময়ে বিশ্বজুড়ে করোনা মহামারির সময়ও কক্সবাজারের ক্যাম্পগুলোতে র্যা পিড ইনভেস্টিগেশন অ্যান্ড রেসপন্স টিমকে ট্র্যাক করতে ‘গো-ডেটা’ অত্যন্ত কার্যকরী ভূমিকা পালন করে। সংগৃহীত ডেটা অনুযায়ী, ২০২১ সালের মে মাসের মধ্যে ৫৪১ জন এবং আগস্টের মধ্যে দুই হাজারের বেশি নিশ্চিত কোভিড কেস সাফল্যের সঙ্গে তদন্ত করা হয় এবং হাজার হাজার সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিকে সফলভাবে ফলোআপের আওতায় আনা হয়।
স্থানীয় সক্ষমতা বৃদ্ধি ও কমিউনিটির মালিকানা:
প্রযুক্তির সফল বাস্তবায়নের পাশাপাশি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা স্থানীয় বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা (এনজিও), আইওএম (আইওএম) এবং মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে। কেস ইনভেস্টিগেশন, কন্টাক্ট ট্রেসিং এবং ট্রান্সমিশন চেইন ম্যাপিংয়ের ওপর এই প্রশিক্ষণগুলো দেওয়া হয়, যাতে স্থানীয় জনবল নিজেরাই প্রযুক্তির পুরো সুফল পেতে পারে।
ফ্রেন্ডশিপ সংস্থার মনিটরিং, ইভ্যালুয়েশন অ্যান্ড লার্নিং কর্মকর্তা মং কে সি মারমা জানান, ‘গো-ডেটা প্রাদুর্ভাবের তদন্তকে ডিজিটালাইজ করে এবং প্রায় রিয়েল-টাইম (তাৎক্ষণিক) বিশ্লেষণের সুযোগ তৈরি করে আমাদের সেই সংকটগুলো দূর করেছে, যা আগে অসম্ভব ছিল।’ এই উদ্যোগটি স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মীদের মধ্যে মালিকানাবোধ তৈরি করেছে, যা ভবিষ্যতের যেকোনো জরুরি স্বাস্থ্য সংকট মোকাবিলায় দেশীয় সক্ষমতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
বর্তমান প্রস্তুতি ও ভবিষ্যতের রূপরেখা:
‘গো-ডেটা’ সিস্টেমটি বর্তমানে কোভিড-১৯ এবং ডিফথিরিয়ার প্রাদুর্ভাব ক্লাস্টারগুলো সফলভাবে তদারকি করে চলেছে। এর ধারাবাহিকতায় এবং ভবিষ্যতের স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়াতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট অংশীদাররা এখন বর্ষাকালে প্রাদুর্ভাবের উচ্চ ঝুঁকি থাকা কলেরা রোগ প্রতিরোধে সক্রিয় রিপোর্টিং শুরু করার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বাংলাদেশ প্রতিনিধি ড. আহমেদ জামশিদ মোহাম্মদ বলেন, ‘ডিজিটাল টুল, প্রশিক্ষিত দল এবং শক্তিশালী সমন্বয়ের এই মেলবন্ধন উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে প্রাদুর্ভাব প্রস্তুতি জোরদার করার একটি চমৎকার ও স্কেলযোগ্য মডেল তৈরি করেছে।’
কক্সবাজারের শরণার্থী ক্যাম্পে ‘গো-ডেটা’-এর সফল প্রয়োগ কেবল একটি প্রযুক্তিগত উন্নয়নই নয়, বরং এটি লাখ লাখ মানুষের জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় একটি জীবনরক্ষাকারী দৃষ্টান্ত। ডিজিটাল উদ্ভাবন ও মানবিক সহায়তার এই সমন্বয় প্রমাণ করেছে যে, সঠিক ডেটা ও সময়মতো পদক্ষেপের মাধ্যমে যেকোনো জটিল জনস্বাস্থ্য সংকট সফলভাবে মোকাবিলা করা সম্ভব।