ঢাকাশনিবার , ২৮ মার্চ ২০২৬
  • অন্যান্য

ইরান যুদ্ধের প্রভাবে সার ও জ্বালানি নিয়ে বড় শঙ্কায় বাংলাদেশ!

নিজস্ব প্রতিবেদক
মার্চ ২৮, ২০২৬ ১০:৪০ পূর্বাহ্ণ । ১৯ জন

ইরানকে ঘিরে চলমান যুদ্ধের প্রভাবে বৈশ্বিক জ্বালানি ও সারের বাজারে তীব্র অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বাংলাদেশেও। বোরো মৌসুমে ইতোমধ্যে সেচ সংকটে পড়েছেন কৃষকরা, আর সামনে আমন মৌসুমকে ঘিরে সারের সরবরাহ নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ।

সরকার বলছে, দেশে পর্যাপ্ত সার মজুদ রয়েছে এবং আপাতত কোনো সংকট নেই। কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ জানিয়েছেন, বর্তমান মজুদ দিয়ে অন্তত এক বছর চাহিদা পূরণ করা সম্ভব। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে সংকট এড়াতে বিকল্প উৎস থেকে সার ও জ্বালানি আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

বাংলাদেশ মূলত সৌদি আরব ও কাতারের মতো মধ্যপ্রাচ্যের দেশ থেকে সারের বড় অংশ আমদানি করে। এছাড়া দেশের উৎপাদিত সারও নির্ভরশীল আমদানিকৃত গ্যাসের ওপর। কিন্তু উপসাগরীয় অঞ্চলে চলমান যুদ্ধের কারণে এই সরবরাহ এখন অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।

সরকার ইতোমধ্যে চীন, মিশরসহ বিকল্প বাজারের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেছে। তবে মাঠ পর্যায়ে কিছু এলাকায় কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে বাড়তি দামে সার বিক্রির অভিযোগ উঠেছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. মোহাম্মদ আমিরুল ইসলাম সতর্ক করে বলেন, বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি ও সারের বাস্তব সংকট তৈরি হতে পারে। তবে তার মতে, “বাংলাদেশে প্রকৃত সংকটের আগেই কৃত্রিম সংকট তৈরি হওয়াটাই বড় সমস্যা।”

এদিকে জ্বালানি সংকটের প্রভাবও দৃশ্যমান হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে জ্বালানি তেলের জন্য দীর্ঘ লাইন দেখা যাচ্ছে। সরকারও জ্বালানি ব্যবহারে সাশ্রয়ী হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে এবং বিকল্প উৎস খোঁজার কথা বলছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি স্থাপনাগুলোতে হামলার কারণে সার উৎপাদন আরও ব্যাহত হতে পারে। কারণ দেশের সার কারখানাগুলো তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি)-এর ওপর নির্ভরশীল।

গ্যাস সাশ্রয়ের লক্ষ্যে মার্চের শুরু থেকে রাষ্ট্রায়ত্ত পাঁচটি সার কারখানার মধ্যে চারটি বন্ধ রাখা হয়েছে। বেসরকারি কাফকো কারখানার উৎপাদনও বন্ধ রয়েছে, যা কৃষিখাতের জন্য উদ্বেগজনক।

তবে কৃষিমন্ত্রী জানিয়েছেন, এসব কারখানা শিগগিরই চালু করা হবে। ঘোড়াশাল সার কারখানা চালু হলে প্রতিদিন প্রায় ২৮০০ টন উৎপাদন সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

বাংলাদেশে বছরে প্রায় ৭০ লাখ টন সারের চাহিদা রয়েছে। এর মধ্যে ইউরিয়ার চাহিদা প্রায় সাড়ে ২৬ লাখ টন, যার মাত্র ১০ লাখ টন দেশে উৎপাদিত হয়। ফলে বড় অংশই আমদানির ওপর নির্ভরশীল।

বর্তমানে দেশে ইউরিয়া ৪ লাখ ৯৩ হাজার টন, টিএসপি ৩ লাখ ৮২ হাজার টন, ডিএপি ৫ লাখ ৯ হাজার টন এবং এমওপি ৩ লাখ ৪২ হাজার টন মজুদ রয়েছে বলে জানিয়েছে কৃষি মন্ত্রণালয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এখন বোরো মৌসুম শেষের দিকে থাকায় সারের চাহিদা কম। তবে ভবিষ্যতের জন্য দ্রুত বিকল্প উৎস থেকে আমদানি নিশ্চিত করা জরুরি, না হলে বড় ধরনের সংকট দেখা দিতে পারে।

আন্তর্জাতিক বাজারেও এর প্রভাব স্পষ্ট। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে বৈশ্বিক জ্বালানির প্রায় ২০ শতাংশ এবং সারের এক-তৃতীয়াংশ সরবরাহ হয়। যুদ্ধের কারণে এই পথ আংশিকভাবে বন্ধ থাকায় সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় চাপ তৈরি হয়েছে।

বিশ্লেষক সংস্থা সিআরইউ গ্রুপ জানিয়েছে, যুদ্ধ শুরুর পর বিশ্ববাজারে ইউরিয়া সারের দাম প্রায় ২৫ শতাংশ বেড়ে টনপ্রতি ৪৯০ ডলার থেকে ৬২৫ ডলারে পৌঁছেছে।

এদিকে ভারত, যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশ ইতোমধ্যে সার সংকটে পড়েছে। যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল ফার্মার্স ইউনিয়নের সভাপতি টম ব্র্যাডশ বলেছেন, জ্বালানি ও সারের বাড়তি খরচ কৃষকদের ওপর বড় চাপ তৈরি করছে।

গবেষণা সংস্থা কিয়েল ইনস্টিটিউট সতর্ক করেছে, হরমুজ প্রণালির সংকট বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তায়ও বড় প্রভাব ফেলতে পারে। তাদের মতে, এতে বিশ্বে গমের দাম ৪.২ শতাংশ এবং ফল-সবজির দাম ৫.২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতিতে রাশিয়া বিশ্ববাজারে সারের বড় যোগানদাতা হিসেবে আরও শক্ত অবস্থান নিতে পারে। ফলে বাংলাদেশসহ আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য প্রতিযোগিতা ও ব্যয়—দুটিই বাড়তে পারে।

সব মিলিয়ে, আপাতত মজুদ থাকলেও দীর্ঘমেয়াদে ইরান যুদ্ধের প্রভাব বাংলাদেশ কৃষিখাতে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

তথ্যসুত্র: বিবিসি বাংলা