
চা, কফি কিংবা যেকোনো পানীয় খুব বেশি গরম বা ফুটন্ত অবস্থায় পান করার অভ্যাস অনেকেরই রয়েছে। তবে সাম্প্রতিক একটি স্বাস্থ্য গবেষণায় চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে যে, অতিরিক্ত গরম পানীয় পানের অভ্যাস খাদ্যনালীর মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে এবং এটি ক্যান্সারের ঝুঁকি তিনগুণ পর্যন্ত বাড়িয়ে দিতে পারে। স্বাস্থ্যবিষয়ক আন্তর্জাতিক পোর্টাল ‘হেলথলাইন’-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়েছে।
সম্প্রতি আন্তর্জাতিক ক্যান্সার গবেষণা জার্নালে প্রকাশিত একটি বড় পরিসরের গবেষণায় এই বিষয়টি তুলে ধরা হয়। যুক্তরাজ্যভিত্তিক প্রায় ১০ লাখ মানুষের ওপর দীর্ঘ সময় ধরে চালানো এই গবেষণায় দেখা গেছে, যারা নিয়মিত ‘খুব গরম’ বা স্ফুটন্ত তাপমাত্রায় চা-কফি বা পানীয় পান করেন, তাদের খাদ্যনালীর এক বিশেষ ধরনের ক্যান্সার—যাকে স্কোয়ামাস সেল কার্সিনোমা বলা হয়—তা হওয়ার ঝুঁকি স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় তিন গুণ বেশি থাকে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সমস্যাটি কফি বা চায়ের উপাদানে নয়, বরং পানীয়টি ঠিক কতটুকু উচ্চ তাপমাত্রায় পান করা হচ্ছে তার ওপর নির্ভর করে। খাদ্যনালী হলো সেই পেশল নল যা মুখ থেকে খাবার ও তরল পদার্থ পাকস্থলীতে পৌঁছে দেয়। অত্যন্ত উচ্চ তাপমাত্রার কোনো তরল পান করলে এর ভেতরের মিউকাস আস্তরণে মারাত্মক তাপীয় আঘাত বা থার্মাল ইনজুরি হতে পারে। মুখ বা জিহ্বা অতিরিক্ত গরমে তৎক্ষণাৎ সংবেদনশীল হয়ে উঠলেও খাদ্যনালীতে পর্যাপ্ত ব্যথা রিসেপ্টর না থাকায় মানুষ সাধারণত বুঝতে পারে না যে গলা দিয়ে নিচে নামার সময় টিস্যুগুলো পুড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
দীর্ঘদিন ধরে বারবার এ ধরনের তাপীয় আঘাত ও প্রদাহের ফলে খাদ্যনালীর কোষগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং অস্বাভাবিক কোষ বিভাজন শুরু হতে পারে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহ ও কোষের পরিবর্তন স্কোয়ামাস সেল কার্সিনোমা নামক ক্যান্সারের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। গবেষণায় আরও দেখা গেছে, শুধু তাপমাত্রা নয়, যারা প্রতিদিন অতিরিক্ত গরম পানীয় ৬ কাপ বা তার বেশি পরিমাণে পান করেন, তাদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকির মাত্রা আরও তীব্র হয়ে ওঠে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) ক্যান্সার গবেষণা বিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা (আইএআরসি) ইতিমধ্যে প্রায় ১৪৯ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা তার বেশি তাপমাত্রার পানীয়কে মানুষের জন্য ‘সম্ভাব্য কার্সিনোজেনিক’ বা ক্যান্সার সৃষ্টিকারী হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। চিকিৎসকদের মতে, সাধারণত ১৪০ থেকে ৪৯ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা তার বেশি তাপমাত্রার যেকোনো তরল নিয়মিত পান করা স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে সবার প্রিয় কফি বা চা চিরতরে বাদ দিতে হবে। সামান্য কিছু অভ্যাসের পরিবর্তন আনলেই এই বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়ানো সম্ভব।
বিশেষজ্ঞরা সতর্কতা অবলম্বনে যে পরামর্শ দিলেন:
ঠান্ডা হতে সময় দিন: চা বা কফি চুলা বা কেটলি থেকে নামানোর পর সঙ্গে সঙ্গেই পান না করে তা ১৪৯ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা নিরাপদ তাপমাত্রার নিচে নামার জন্য কিছুক্ষণ অপেক্ষা করুন।
ছোট চুমুক: প্রথম চুমুক দেওয়ার আগে চামচ দিয়ে নেড়ে বা ফুঁ দিয়ে তাপমাত্রা যাচাই করে নিন। যদি জিহ্বা বা ঠোঁটে অতিরিক্ত গরম লাগে, তবে বুঝবেন তা খাদ্যনালীর জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।
দুধ বা পানি মেশানো: গরম পানীয়তে সামান্য ঠান্ডা দুধ বা পানি মিশিয়ে এর তীব্র তাপমাত্রা কমিয়ে সহনীয় পর্যায়ে আনা যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা আরও মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, খাদ্যনালীর ক্যান্সারের পেছনে গরম পানীয় ছাড়াও ধূমপান, অতিরিক্ত মদ্যপান, স্থূলতা এবং দীর্ঘমেয়াদি গ্যাস্ট্রোইসোফেজিয়াল রিফ্লাক্স ডিজিজ বা এসিড রিফ্লাক্সের মতো পুরোনো সমস্যাগুলো প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে। তাই সামগ্রিক সুস্থতা নিশ্চিত করতে ধূমপান ও ক্ষতিকর নেশা বর্জনের পাশাপাশি দৈনন্দিন পানীয় গ্রহণের ক্ষেত্রে তাপমাত্রা সচেতনতা বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি।