একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও উৎপাদন ব্যবস্থার মূল ভিত্তি হলো শ্রমজীবী মানুষ। কলকারখানা, কৃষিক্ষেত্র, নির্মাণ শিল্প, পরিবহন ব্যবস্থা কিংবা সেবা খাত, প্রতিটি স্তরে শ্রমিকদের ঘাম ও শ্রমেই গড়ে ওঠে জাতীয় অর্থনীতি। কিন্তু এই অপরিসীম অবদান সত্ত্বেও শ্রমিক শ্রেণি আজও ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত। শ্রম অধিকার বাস্তবায়নের পথে সবচেয়ে বড় ও মৌলিক বাধা হিসেবে যে বিষয়টি বারবার সামনে আসে, তা হলো শ্রমিকদের অজ্ঞতা ও সচেতনতার অভাব।
বাংলাদেশে শ্রম অধিকার সংক্রান্ত আইন ও বিধিবিধান নতুন নয়। শ্রম আইন অনুযায়ী ন্যূনতম মজুরি, নির্ধারিত কর্মঘণ্টা, সাপ্তাহিক ছুটি, মাতৃত্বকালীন সুবিধা, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা এবং ক্ষতিপূরণসহ বিভিন্ন মৌলিক অধিকার শ্রমিকদের জন্য নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। অথচ বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। অধিকাংশ শ্রমিক জানেই না যে এসব অধিকার তাদের আইনি প্রাপ্য। ফলে অধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলো নীরবে সহ্য করা ছাড়া তাদের আর কোনো পথ থাকে না।
শ্রমিকদের এই অজ্ঞতার পেছনে প্রধান ভূমিকা রাখে শিক্ষা ও তথ্যের অভাব। দারিদ্র্য, গ্রামীণ পশ্চাৎপদতা ও জীবিকার তীব্র চাপের কারণে বহু মানুষ অল্প বয়সেই শ্রমবাজারে প্রবেশ করতে বাধ্য হয়। শিক্ষার সুযোগ না থাকায় তারা শ্রম আইন, চুক্তি, মজুরি কাঠামো কিংবা অভিযোগ জানানোর পদ্ধতি সম্পর্কে অবগত হতে পারে না। ফলে মালিকপক্ষের একতরফা সিদ্ধান্তই তাদের ভাগ্য নির্ধারণ করে দেয়।
এ অবস্থায় ভয় একটি বড় নিয়ামক হিসেবে কাজ করে। চাকরি হারানোর আশঙ্কা, বিকল্প কর্মসংস্থানের অভাব এবং পরিবারের জীবিকা নির্বাহের দায়িত্ব শ্রমিকদের প্রতিবাদী হতে নিরুৎসাহিত করে। অনেক শ্রমিক অন্যায় বুঝলেও মুখ খুলতে সাহস পান না। এই নীরবতাই শোষণকে দীর্ঘস্থায়ী ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়।
শ্রমিক সংগঠন ও ট্রেড ইউনিয়নের ভূমিকা শ্রম অধিকার আদায়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও বাস্তবে এ খাতেও নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে শ্রমিক সংগঠনগুলো রাজনৈতিক প্রভাবাধীন বা মালিকপক্ষের নিয়ন্ত্রণে থাকে। ফলে প্রকৃত শ্রমিকস্বার্থ উপেক্ষিত হয়। আবার বহু শ্রমিক ইউনিয়নের কার্যক্রম, গুরুত্ব ও অধিকার সম্পর্কেও অবগত নয়। সংগঠিত না হলে যে শ্রমিকের কণ্ঠ দুর্বল হয়ে পড়ে, এই সত্যটি অজ্ঞতার কারণে তারা উপলব্ধি করতে পারে না।
রাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। শ্রম আইন প্রণয়নের পাশাপাশি তার কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব। কিন্তু শ্রম পরিদর্শন ব্যবস্থার দুর্বলতা, জনবল সংকট, দুর্নীতি এবং দীর্ঘসূত্র বিচারপ্রক্রিয়ার কারণে শ্রমিকরা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে অভিযোগ জানালেও তা কার্যকর সমাধানে পৌঁছায় না। ফলে শ্রমিকদের মধ্যে আইনের প্রতি আস্থা কমে যায় এবং অজ্ঞতা আরও গভীর হয়।
গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের ভূমিকা এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও তা এখনো পর্যাপ্ত নয়। শ্রমিকদের অধিকার, শ্রম আইন ও সফল আন্দোলনের উদাহরণগুলো যদি নিয়মিতভাবে গণমাধ্যমে উঠে আসে, তবে সচেতনতা বাড়তে পারে। কিন্তু অধিকাংশ সময় শ্রমিক ইস্যু প্রান্তিক হিসেবেই থেকে যায়।
শ্রম অধিকার নিশ্চিত করতে হলে সর্বাগ্রে শ্রমিকদের সচেতন করে তুলতে হবে। শ্রমিকদের জন্য সহজ ভাষায় শ্রম আইনভিত্তিক প্রশিক্ষণ, আইনি সহায়তা কেন্দ্র, কর্মক্ষেত্রভিত্তিক সচেতনতামূলক কার্যক্রম এবং স্বাধীন ও শক্তিশালী শ্রমিক সংগঠন গড়ে তোলা জরুরি। একই সঙ্গে রাষ্ট্রকে শ্রম পরিদর্শন ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে এবং আইন লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
সবশেষে বলা যায়, শ্রমিকদের অজ্ঞতা কেবল ব্যক্তিগত দুর্বলতা নয়, এটি একটি সামগ্রিক সামাজিক ও কাঠামোগত ব্যর্থতার প্রতিফলন। এই অজ্ঞতা দূর না হলে শ্রম অধিকার কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকবে এবং শোষণ চলতেই থাকবে। শ্রমিকের অধিকার নিশ্চিত করা মানেই শুধু একটি শ্রেণির ন্যায়বিচার নয়; বরং একটি মানবিক, ন্যায়ভিত্তিক ও টেকসই রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলার পূর্বশর্ত।


