সিগারেটের চোরাচালান মিথ
বহুজাতিক তামাক কোম্পানিগুলো দীর্ঘদিন ধরে দেশে সিগারেটের চোরাচালান মিথ প্রচার করে আসছে। তামাক নিয়ন্ত্রণ গবেষক সুশান্ত সিনহা এক গবেষণায় দেখিয়েছেন, জাতীয় বাজেট ঘোষণার আগে এপ্রিল ও মে মাসে গণমাধ্যমে চোরাচালান সংক্রান্ত নানা প্রতিবেদন ও মতামত প্রকাশ হতে দেখা যায়।১ এসব চোরাচালান সংক্রন্ত সংবাদগুলো অধিকাংশই হুবহু একই ধরনের। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায়, এসব চোরাচালানের পিছনে কারা তাদের কোনো হদিস নেই। একইসঙ্গে এসব ঘটনায় কাউকে আটকও করতে দেখা যায় না। অধিকাংশ সময়ই তথাকথিত চোরাচালানকৃত সিগারেট বিমান বন্দরে লাগজের পাশে পড়ে থাকতে দেখা যায়।
দ্বিতীয়ত, বিদেশ থেকে বেশি দামে সিগারেট কিনে এনে কেনো বাংলাদেশে কম দামে বিক্রি করবে চোরাচালানকারীরা সেই প্রশ্নেরও উত্তর মেলেনি কখনো। কারণ উন্নত দেশ তো বটেই প্রতিবেশী দেশগুলোর চেয়ে বাংলাদেশে বিদেশি কোম্পানির সিগারেটের দাম অনেক কম। তাই বিদেশ থেকে বেশি দামের সিগারেট কিনে এনে কম দামে বিক্রি করা ব্যবসায়িক বা আর্থিকভাবে কখনোই লাভজনক নয়। ফলে এ ধরনের সিগারেট চোরাচালানের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তোলার অবকাশ রয়েছে।
তৃতীয়ত, এনবিআরের আটককৃত শীর্ষ ১০ পণ্যের তালিকায় সিগারেট নেই।২ অথচ চোরাচালানের সংবাদ এমনভাবে প্রচার করা হয় যেনো মনে হয় সরকারের কোটি কোটি টাকা রাজস্ব ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে। চোরাচালানকৃত সিগারেটের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রেস রিলিজগুলোতে দেখা যায় বিশাল অংকের সিগারেট জব্দ করা হয়েছে। আসলে চোরাচালানকৃত সিগারেটের পরিমান কম হলেও এক্ষেত্রে ৩৫০ শতাংশ আমদানি শুল্ক যুক্ত করে দিয়ে টাকার অংক বেশি দেখানো হয়।

চোরাচালানের নিউজ বিশ্লেষণ
চোরাচালানে জড়িত সিগারেট কোম্পানি
গবেষণায় দেখা গেছে, বাজেটের আগে দেশের আনাচে কানাচে-গ্রামে-মাঠে ও পরিত্যাক্ত ভবনে নকল সিগারেট কারখানা আবিষ্কার হয়। আইনশৃংখলা বাহিনীর অভিযানে ভাঙ্গাচোরা পুরানো মেশিন, তামাক পাতার গুড়া ও কিছু সিগারেট দেখানো হয় তথাকথিত নকল সিগারেট কারখানাগুলোয়। যেখানে একজন দারোয়ান ছাড়া বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আর কাউকেও আটক করতে দেখা যায়নি। বাংলাদেশে সিগারেট বাজারের ৯৫%-এর বেশি নিয়ন্ত্রণ করে দুটি বহুজাতিক তামাক কোম্পানি।
এরা নিজেরাই সর্বোচ্চ খুচরা মূল্যের চেয়ে বেশি দামে সিগারেট বিক্রি করে বছরে ৫০০০ কোটি টাকার বেশি কর ফাঁকি দেয়। সারাদেশে এজেন্টদের মাধ্যমে খুচরা বিক্রেতাদের নিয়ন্ত্রণ করে তামাক কোম্পানিগুলো। ফলে কোম্পানির নজরদারির বাইরে অবৈধ সিগারেটের ব্যবসা পরিচালনা করা দূরহ বিষয়। বরং সরকার যাতে খুচরা শলাকা সিগারেট বিক্রি বন্ধ এবং সিগারেটের দাম বৃদ্ধি না করে সেজন্যই কৌশলের অংশ হিসেবে চোরাচালানের মিথ প্রচার করে। পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরে যেসব অবৈধ সিগারেট পাওয়া যায় সেগুলোর সাথে কোনোনা কোনোভাবে জড়িত বহুজাতিক তামাক কোম্পানিগুলো।
তামাক কর বৃদ্ধিতে চোরাচালানের গুজব
সিগারেটের মূল্য ও কর বৃদ্ধি করলে রাজস্ব কমে যাবে বলেও প্রতি বছর তামাক কোম্পানিগুলো প্রপাগান্ডা চালায়। কিন্তু তাদের এই অপপ্রচারেরও কোনো ভিত্তি নেই। কারণ এনবিআরের তথ্যে দেখা গেছে, ২০০৪-০৫ অর্থবছরে তামাকজাত দ্রব্য থেকে রাজস্ব আদায় হয়েছে ২৮৮৮ কোটি টাকা। আর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রাজস্ব আদায় হয়েছে ৪০,০৩১ কোটি টাকা! এর মধ্যে কোনো অর্থবছরেই রাজস্ব আদায়ের হার কমেনি। বরং গত ১৮ বছরে তামাকজাত দ্রব্যে থেকে রাজস্ব আয় বেড়েছে প্রায় সাড়ে ১১ গুণ।
ফলে তামাক কোম্পানি রাজস্ব কর বৃদ্ধিকালীন সময়ে চোরাচালানের মিথের বাস্তবিক কোনো সত্যতা নেই। বরং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা গেছে কর বৃদ্ধির ফলে দেশের রাজস্ব বৃদ্ধি পেয়েছে।

বিভিন্ন অর্থবছরে রাজস্ব বৃদ্ধির পরিমাণ
বিএটিবি’র অবৈধ মুনাফা থেকে বেআইনি মুনাফা
সম্প্রতি ক্যাম্পেইন ফর টোব্যাকো-ফ্রি কিডস (সিটিএফকে) এর প্রকাশিত প্রতিবেদনে বাংলাদেশে ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো (বিএটিবি)-এর সিগারেট চোরাচালান কার্যক্রম সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। এ প্রতিবেদনে ‘এশিয়ায় সিগারেট চোরাচালান : বিএটি ও বাংলাদেশ’৪ শীর্ষক অধ্যায়ে বাংলাদেশে সিগারেট চোরাচালানে বিএটিবি’র ৬টি বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে। যেখানে দেশে চোরাচালানের ক্ষেত্রে বিএটিবির সম্পৃক্ত বিষয়গুলো দেয়া হলো :
চোরাচালানের ব্যাপকতা এবং ধরণ : বাংলাদেশে বিএটি চোরাচালানের মাধ্যমে অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে নিজেদের ব্র্যান্ডগুলো প্রথমে নিয়ে আসে। কোম্পানির অভ্যন্তরীণ নথিপত্র অনুযায়ী, দীর্ঘ বছর ধরে বিপুল পরিমাণ সিগারেট বাংলাদেশে পাচার করে বিএটিবি। বিশেষ করে বেনসন অ্যান্ড হেজেস এবং স্টেট এক্সপ্রেস ৫৫৫ ব্র্যান্ডগুলো বিপুল পরিমাণে চোরাচালান করা হতো। এমনকি বাংলাদেশকে এই অঞ্চলে পাচারের একটি বড় কেন্দ্র হিসেবে তৈরি করে বিএটি। একইসঙ্গে দেশ থেকে প্রতিবেশী দেশ ভারতেও অবৈধভাবে সিগারেট সরবরাহ করেছে বিএটিবি।
দৈনন্দিন ব্যবসার অংশ হিসেবে চোরাচালান : বিএটিবি’র ব্যবসায়িক কার্যক্রমের সাথে চোরাচালান এতটাই ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিল যে তারা নিয়মিতভাবে চোরাই সিগারেটের গুণমান এবং প্যাকেজিংয়ের অবস্থা পরীক্ষা করার জন্য মাসিক প্রতিবেদন তৈরি করত। ইংল্যান্ডে অবস্থিত বিএটি’র প্রধান কার্যালয় থেকে চোরাই সিগারেটের মূল্য নিয়ন্ত্রণ করা হতো। এছাড়া সিঙ্গাপুরভিত্তিক ট্রেডিং কোম্পানি এসইউটিএল ছিল এই চোরাচালান প্রক্রিয়ার প্রধান মধ্যস্থতাকারী। যারা কয়েক দশক ধরে বিএটি’র হয়ে এই কাজ পরিচালনা করে আসছিল।
‘ছাতা কার্যক্রম’ বা আইনি আবরণ (Umbrella Operations): বিএটি বাংলাদেশে তাদের চোরাচালান কার্যক্রমকে আড়াল করার জন্য ‘আমব্রেলা অপারেশনস’ নামক একটি কৌশল ব্যবহার করত। এর মাধ্যমে তারা খুব সামান্য পরিমাণ সিগারেট বৈধভাবে আমদানি করত, যা আসলে অনেক বড় আকারের অবৈধ চোরাচালানের জন্য একটি আইনি আবরণ হিসেবে কাজ করত। এই বৈধ আমদানির ফলে তারা প্রকাশ্যেই চোরাই পণ্যের বিজ্ঞাপন দিতে পারত এবং বিক্রেতারাও বৈধ বিক্রেতা সেজে চোরাই পণ্য বিক্রি করতে পারত।
রাজনৈতিক কৌশল এবং কর ফাঁকি : বিএটি চোরাচালানকে একটি রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে। তারা সরকারকে কর কমানোর জন্য চাপ দেয় এই বলে যে, সিগারেটে উচ্চ কর থাকলে চোরাচালান বৃদ্ধি পায় এবং সরকারের রাজস্ব ক্ষতি হয়। ১৯৯৪ সালে তারা বাংলাদেশের জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকেও অনুরূপ চিঠি দিয়েছিল, যেখানে তারা দাবি করেছিল যে চোরাচালান বন্ধ করতে হলে কর কমানো প্রয়োজন। অথচ তারা নিজেরাই সেই চোরাচালানের মূল কারিগর ছিল এবং চোরাচালান বৃদ্ধি বা হ্রাসের ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ ছিল।
চোরাচালানের পথ : অনুসন্ধানে দেখা গেছে, অধিকাংশ চোরাই সিগারেট ইংল্যান্ডের সাউদাম্পটন কারখানায় তৈরি হতো এবং সেখান থেকে সিঙ্গাপুরে পাঠানো হতো। সিঙ্গাপুর থেকে জাহাজযোগে মালাক্কা প্রণালী হয়ে বঙ্গোপসাগরের মাধ্যমে চট্টগ্রাম বা কক্সবাজার দিয়ে এই সিগারেটগুলো বাংলাদেশে প্রবেশ করত। পরবর্তীতে কাস্টমসের নজরদারি এড়ানোর জন্য তারা মিয়ানমার হয়ে স্থলপথে চোরাচালানের নতুন রুট তৈরি করেছিল।
উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সম্পৃক্ততা : নথিপত্র অনুযায়ী, বিএটি ও এসইউটিএল-এর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা এই চোরাচালান প্রক্রিয়ার সাথে সরাসরি জড়িত। এর মধ্যে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিচালক, বিপণন বিভাগের প্রধান এবং এমনকি বিএটিবি’র চেয়ারম্যান পর্যায়ের কর্মকর্তারাও চোরাচালান বা ‘ট্রানজিট’ কার্যক্রম তদারকি করতেন।
সিগারেট চোরাচালানের বাস্তবতা
তামাক কর বিষয়ক নলেজ হাব বিএনটিটিপি অনুসন্ধান করে দেখেছে, চোরাচালানের মিথ প্রচারের ক্ষেত্রে বহুজাতিক তামাক কোম্পানিগুলোর যোগসাজস রয়েছে এবং বাস্তবে এ হার অনেক কম। পিয়ার রিভিউ জার্নালে প্রকাশিত গবেষণায় দেখা গেছে দেশে অবৈধ সিগারেটের বাণিজ্যের হার মাত্র ৫.৪ শতাংশ।৩ তবে দেশে স্থানীয়ভাবে একটি চক্র ট্যাক্সবিহীন ব্যান্ডরোলের মাধ্যমে অবৈধ বাণিজ্য করছে। যে চক্রের সঙ্গে কোনোনা কোনোভাবে বহুজাতিক তামাক কোম্পানি জড়িত। অবৈধ এই বাণিজ্যের সঙ্গে বিক্রেতারাও দায়ী। যারা বেশি বিক্রির জন্য আইন লঙ্ঘন করে অবৈধ বাণিজ্যে ভূমিকা রাখছে।
লাইসেন্সিংয়ে এনবিআরের বিরোধীতা
চোরাচালান প্রতিরোধে অর্থ মন্ত্রণালয় ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড খুচরা বিক্রেতাদের লাইসেন্সিংয়ের বিরোধীতা করেছে। একইসঙ্গে ব্যান্ডরোলের আধুনিকায়নেও যথেষ্ট উদ্যোগ নেয়নি। অন্যদিকে চোরাচালান প্রতিরোধে এনবিআরের গঠিত কমিটিতে ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন ২০০৫ অনুযায়ী গঠিত প্রতিটি জেলা ও উপজেলা ট্রাস্কফোর্স কমিটির সদস্য যেমন স্থানীয় সরকারের লাইসেন্সিং কর্মকর্তা, স্যানিটারি ইন্সপেক্টরদের সম্পৃক্ত করা হয়নি। পাশাপাশি সরকারকে তামাকজাত দ্রব্যের আন্তর্জাতিক ইলিসিড ট্রেড প্রোটোকলে স্বাক্ষরের জন্যও কোনো উদ্যোগ নেয়নি। যার মাধ্যমে সত্যিকার অর্থেই দেশে সিগারেটের চোরাচালান প্রতিরোধ সম্ভব।
চোরাচালান প্রতিরোধে করণীয়
১. স্থানীয় সরকারের গাইড লাইন অনুসারে সকল খুচরা বিক্রেতাদের লাইসিন্সের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। এজন্য স্থানীয় সরকারকে অনুরোধ জানানো।
২. এনবিআরের চোরাচালান রোধে গঠিত কমিটিতে ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন ২০০৫ অনুযায়ী গঠিত প্রতিটি জেলার ট্রাস্কফোর্স কমিটির সদস্য যেমন স্থানীয় সরকারের লাইসেন্সিং কর্মকর্তা, স্যানিটারি ইন্সপেক্টরদের সম্পৃক্ত করতে হবে।
৩. সিগারেটের ব্যান্ডরোল ও স্ট্যাম্প ডিজিটালাইজ ও আধুনিকরণ করতে হবে। এর মাধ্যমে বাজার মনিটরিং ব্যবস্থা নিশ্চিত করা, অবৈধ সিগারেটের বাজার নিয়ন্ত্রণ সহজ হবে।
৪. অবৈধ বাণিজ্য রোধে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তামাকের ইলিসিড ট্রেড প্রোটোকলে স্বাক্ষরের জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ জানানো।
তথ্যসূত্র
১. Sushanta sinha, ‘An Investigation of Bangladesh’s Industry-Friendly Cigarette Pricing and Way Forward’. Link: https://bnttp.net/resource/an-investigation-of-bangladeshs-industry-friendly-cigarette-pricing-and-way-forward/
২. Sushanta sinha, ‘An Investigation of Bangladesh’s Industry-Friendly Cigarette Pricing and Way Forward’. Link: https://bnttp.net/resource/an-investigation-of-bangladeshs-industry-friendly-cigarette-pricing-and-way-forward/
৩. https://tobaccocontrol.bmj.com/content/early/2025/06/04/tc-2024-059131
৪. https://assets.tobaccofreekids.org/global/pdfs/en/Illegal_profits_to_illicit_profit_en.pdf
লেখক : ইব্রাহীম খলিল, জনস্বাস্থ্য বিষয়ক গবেষক।


