
রাজশাহীর পানের বাজারে ব্যাপক ধস নেমেছে। এক বিড়া ছোট আকৃতির পান বিক্রি হচ্ছে মাত্র চার থেকে পাঁচ টাকায়। অথচ মাসখানেক আগেও এই পানের দাম ছিল অন্তত ১০ গুণ বেশি। হঠাৎ করে দাম কমে যাওয়ায় চরম বিপাকে পড়েছেন জেলার হাজার হাজার পানচাষী। উৎপাদন খরচ তো দূরের কথা, পান বিক্রি করে শ্রমিকের মজুরিও তুলতে পারছেন না তারা।
রাজশাহীর মোহনপুর উপজেলার মৌগাছি বাজার, যা পানের অন্যতম বড় মোকাম, সেখানে গিয়ে দেখা যায় কৃষকদের হতাশার চিত্র। উপজেলার বাকশিমইল ইউনিয়নের খাড়ইল গ্রামের কৃষক এনামুল হক জানান, তিনি দুই বিঘা জমিতে পান চাষ করেছেন। সম্প্রতি বাজারে প্রতি বিড়া পান চার টাকা দরে বিক্রি করেছেন তিনি। এনামুলের ভাষায়, ‘একজন শ্রমিক সারাদিনে বরজ থেকে সর্বোচ্চ তিন পোয়া পান তুলতে পারেন। এই পান হাটে আনতে শ্রমিকের খরচই পড়ে ৬০০ টাকা। আর তিন পোয়া পান বিক্রি করে পাচ্ছি ৪০০ টাকা। পানে এখন শুধু লসই হচ্ছে।’

রাজশাহী নগরীতে পাইকারি বিক্রির জন্য পান সাজাচ্ছেন দুই পান ব্যবসায়ী। ছবি : নিজস্ব প্রতিবেদক
পানচাষীরা জানান, রাজশাহীতে এক বিড়ায় ৬৪টি পান থাকে এবং ৩২ বিড়ায় এক পোয়া হয়। আকারে ছোট পানের দাম সবচেয়ে কম হলেও, ভালো মানের বড় পানের দামও কমে গেছে আশঙ্কাজনকভাবে। মাত্র ১৫ দিন আগেও যেখানে এক বিড়া বড় পান ১২০ টাকায় বিক্রি হয়েছে, এখন তা ৩০-৪০ টাকায় নেমে এসেছে।
দাম কমার কারণ কী?
কৃষক ও ব্যবসায়ীরা পানের এই অস্বাভাবিক দরপতনের পেছনে একাধিক কারণ উল্লেখ করেছেন। এর পেছনে পানের সঙ্গে খাওয়া দরকারি সুপারির দামও বাড়ার কারণ বলেছেন। এ ছাড়া রাজশাহীতে অতিরিক্ত সরবরাহ, উৎপাদন বেশি, রপ্তানি বন্ধসহ সিন্ডিকেটের প্রভাবের কথা জানিয়েছেন।
রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চলতি বছর জেলায় ৪ হাজার ৫০৯ হেক্টর জমিতে পানের আবাদ হয়েছে, যা গত বছরের চেয়ে বেশি। জুন থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত পানের ভরা মৌসুম হওয়ায় উৎপাদন ও সরবরাহ দুটোই বেড়েছে। কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, এ বছর উৎপাদন দ্বিগুণ হওয়ায় এবং দেশের অন্যান্য অঞ্চলেও ফলন ভালো হওয়ায় বাজারে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
ব্যবসায়ীদের মতে, বাজারে সুপারির দাম বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষ পান খাওয়া কমিয়ে দিয়েছে। মো. ইসমাঈল ব্যাপারী নামে একজন ব্যবসায়ী জানান, ঢাকায় পাঠানো পানও বিক্রি হচ্ছে না। চাহিদা না থাকায় তারা পান কিনতে ভয় পাচ্ছেন। তার মতে, একটি কাঁচা সুপারির দামই ১০ থেকে ১৫ টাকা। সেখানে গরীব মানুষ পান বেশি খায়। তাদের সুপারি কেনার সামর্থ্য নেই।
শুধু তাই নয়, রাজশাহীর মিষ্টি পানের একটি বড় বাজার ছিল মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ। কিন্তু নানা জটিলতায় সেই রপ্তানি এখন প্রায় বন্ধ। এটিও দাম কমার অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। অনেক চাষি অভিযোগ করেছেন, ব্যাপারীদের সিন্ডিকেটের কারণেও তারা ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
চাষিদের দুরবস্থা
পানের দাম কমে যাওয়ায় চাষিরা সংকটে পড়েছেন। দুর্গাপুরের পানচাষি আলাউদ্দিন মোল্লা জানান, পানের আয় দিয়েই তার সংসার চলত, কিন্তু এখন লোকসান গুনতে হচ্ছে। অনেকে এনজিও বা মহাজনের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে পান চাষ করেছেন। এখন পানের দাম না থাকায় ঋণের কিস্তি পরিশোধ নিয়ে তারা চরম দুশ্চিন্তায় আছেন। পবার বড়গাছির পানচাষী মিজানুর রহমান বলেন, গত এক মাস ধরে পানের দাম কমতির দিকে। এখন তো ছোট পানগুলো আর বিড়া করে বিক্রি হয় না। গাড়ি ধরে বিক্রি হয়। বরজ থেকে পান তোলার খরচই উঠছে না। আবার ক্ষেত্রে পান নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

রাজশাহী নগরীতে পাইকারি বিক্রির জন্য পান নিয়ে বসে আছেন পান ব্যবসায়ী। ছবি : নিজস্ব প্রতিবেদক
কৃষি কর্মকর্তারা যা বলছেন
রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক উম্মে ছালমা বলেন, জুন-সেপ্টেম্বর তিন মাসে সবচেয়ে বেশি পান উৎপাদন হয়। ফলে এ সময়ে দাম কমে যায়। তবে এবার অধিক বৃষ্টি এবং খাওয়ার অন্য উপকরণের দাম বাড়ায় দাম কমে গেছে। তিনি আরও বলেন, মার্চ থেকে মে পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি দামে পান বিক্রি হয়। এ সময়ে প্রতি বিড়া পান সর্বোচ্চ ১৬০ টাকায় বিক্রি হয়। আর বছরের অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত গড়ে ১০০ টাকা দরে প্রতি বিড়া পান বিক্রি হয়। সুতরাং কৃষক পান বিক্রি করে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, এটা বলা যাবে না।
গত বছর রাজশাহীর মিষ্টি পান ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। এই অঞ্চলে বছরে প্রায় সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকার পান কেনাবেচা হয়। তবে বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত কয়েক লাখ মানুষের জীবন-জীবিকা হুমকির মুখে পড়েছে।