
উন্নত ভবিষ্যৎ, কাজের সুযোগ ও নিরাপত্তার আশায় ইউরোপের পথে পা বাড়ানো শিশু এবং তরুণ অভিবাসীরা পথে পথে চরম শারীরিক নির্যাতন, অপহরণ ও দাসত্বের শিকার হচ্ছেন। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম), জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক তহবিল (ইউনিসেফ) এবং জাতিসংঘ শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা (ইউএনএইচসিআর)-এর সাম্প্রতিক এক যৌথ প্রতিবেদনে এই উদ্বেগজনক তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, আইনি ও নিরাপদ অভিবাসন পথ সীমিত থাকায় এসব তরুণ ও শিশুরা বাধ্য হয়ে বিপজ্জনক রুট বেছে নিচ্ছেন এবং মানবপাচারকারী অপরাধী চক্রের জালে বন্দি হচ্ছেন।
জাতিসংঘের তথ্যানুযায়ী, গত বছর গ্রিস, ইতালি, স্পেন, বুলগেরিয়া ও মাল্টায় প্রায় ৩১ হাজার ১০০ জন শিশু ও তরুণ অভিবাসী প্রবেশ করেছে, যা আগের বছরের তুলনায় ২৫ শতাংশ কম। তবে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, এই শিশুদের মধ্যে ২০ হাজার ৮০০ জনেরও বেশি—অর্থাৎ প্রায় ৬৭ শতাংশই এসেছে মা-বাবা কিংবা কোনো প্রাপ্তবয়স্ক অভিভাবক ছাড়া একেবারে একা। বিশেষ করে ইতালি ও স্পেনে পৌঁছানো শিশু অভিবাসীদের মধ্যে অভিভাবকহীন শিশুর হার প্রায় ৮৬ শতাংশে গিয়ে ঠেকেছে।
১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী ৪ হাজার ৬০০-এর বেশি তরুণ ও শিশুর সাক্ষাৎকার নিয়ে তৈরি এই প্রতিবেদনে তাদের যাত্রাপথের ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। জরিপে অংশ নেওয়া অভিবাসীদের প্রায় ৫০ শতাংশ জানিয়েছেন, তারা দীর্ঘ যাত্রাপথে মারাত্মক শারীরিক সহিংসতার শিকার হয়েছেন। এছাড়া ২৮ শতাংশ অভিবাসীকে তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোনো গোপন আস্তানায় বন্দি করে রাখা হয়েছিল এবং ১৭ শতাংশকে কোনো পারিশ্রমিক ছাড়াই জোরপূর্বক নামমাত্র দাসত্ব ও শ্রমে বাধ্য করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, অভিবাসীদের ওপর অধিকাংশ নির্যাতন ও শোষণের ঘটনা ঘটেছে উত্তর আফ্রিকার দেশগুলোতে—বিশেষ করে লিবিয়া এবং আলজেরিয়ায়। লিবিয়া থেকে মধ্য ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালিতে পৌঁছানোর পথটি বর্তমানে অভিবাসীদের জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক ও অপরাধীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে।
সংগৃহীত সাক্ষ্যে লিবিয়া হয়ে ইউরোপগামী এক ১৯ বছর বয়সী বাংলাদেশি তরুণের কথা বলা হয়, যার পাসপোর্ট কেড়ে নিয়ে তাকে জোরপূর্বক দাস হিসেবে খাটানো হতো এবং সামান্য ত্রুটি পেলেই নির্মমভাবে প্রহার করা হতো।
আইওএম’র মহাপরিচালক অ্যামি পোপ এবং জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন যে, শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ইউরোপীয় দেশগুলোর সঙ্গে অভিবাসন রুটে থাকা দেশগুলোর সমন্বিত আইনি পদক্ষেপ জরুরি। নিরাপদ ও আইনি পথ সুগম না করা পর্যন্ত আন্তর্জাতিক মানবপাচারকারী চক্রগুলোকে দমন করা সম্ভব নয়। জাতিসংঘ অবিলম্বে এসব অপরাধী নেটওয়ার্ক ধ্বংস এবং পথ হারানো শিশুদের জন্য জরুরি মানবিক সুরক্ষার আহ্বান জানিয়েছে।