ঢাকামঙ্গলবার , ১৩ অক্টোবর ২০২৬
  1. সর্বশেষ
  2. লাইফস্টাইল

কাদায় লাফিয়ে বেড়ায় যে মাছ, ডাঙাতেও নেয় শ্বাস!

প্রতিবেদক
বিপ্লব হোসাইন
১৩ অক্টোবর ২০২৬, ১:১৭ বিকাল

Link Copied!

মাছ মানেই পানিতে সাঁতার কাটা-প্রকৃতিতে এমন ধারণার ব্যতিক্রমও রয়েছে। এমন এক অদ্ভুত মাছের নাম মাডস্কিপার (Mudskipper), বাংলায় যা চিড়িং মাছ নামে পরিচিত। এরা শুধু পানিতে সাঁতার কাটে না, কাদার ওপর উঠে লাফিয়ে বেড়ায়, পাখনাকে পায়ের মতো ব্যবহার করে চলাফেরা করে এবং বাতাস থেকেও অক্সিজেন গ্রহণ করতে পারে। শরীরের গঠন, চোখের অবস্থান ও জীবনযাপনের বিশেষ কৌশলের কারণে মাডস্কিপার মাছ প্রকৃতির অন্যতম বিস্ময়কর প্রাণী।

পাখনা যেন পা, চোখ মাথার ওপরে
মাডস্কিপারের সবচেয়ে আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্য হলো এর বক্ষপাখনা। সাধারণ মাছের মতো শুধু সাঁতার কাটার কাজে সীমাবদ্ধ না থেকে এরা শক্তিশালী বক্ষপাখনা ব্যবহার করে কাদার ওপর ভর দিয়ে এগিয়ে যায়। কখনো পাখনার সাহায্যে শরীর টেনে নেয়, আবার কখনো লাফিয়ে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় চলে যায়। বিপদের মুখে লেজের সাহায্যেও দ্রুত লাফ দিতে পারে।

এদের চোখ দুটি মাথার ওপরের দিকে উঁচু হয়ে থাকে। ফলে শরীরের বেশির ভাগ অংশ কাদায় রেখেও চারপাশে নজর রাখতে পারে। পানির ভেতর ও বাইরে-দুই পরিবেশেই দেখার উপযোগী চোখ এদের শিকার খোঁজা এবং শত্রুর উপস্থিতি বুঝতে সাহায্য করে। চোখ আর্দ্র রাখতে এরা চোখ নিচের দিকে গড়িয়ে বিশেষ জলপূর্ণ অংশের সংস্পর্শে আনে। দূর থেকে দেখলে মনে হয়, মাছটি চোখের পলক ফেলছে।

মাছ হয়েও কীভাবে ডাঙায় শ্বাস নেয়?
মাডস্কিপারের জীবনযাপনের সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক হলো বাতাস থেকে অক্সিজেন গ্রহণের ক্ষমতা। পানিতে থাকলে অন্যান্য মাছের মতো ফুলকার সাহায্যে শ্বাস নেয়। কিন্তু কাদার ওপর উঠে এলে শুধু পানির ওপর নির্ভর করে না। প্রজাতিভেদে এরা ত্বক, মুখ ও ফুলকার ভেতরের বিশেষ আর্দ্র অংশের মাধ্যমে বাতাস থেকে অক্সিজেন গ্রহণ করতে পারে।

এ জন্য শরীরের এসব অংশ আর্দ্র থাকা জরুরি। ত্বক ও মুখের ভেতরের আস্তরণে থাকা রক্তনালির মাধ্যমে বাতাসের অক্সিজেন রক্তে প্রবেশ করে। পাশাপাশি ফুলকার চেম্বারে ধরে রাখা পানি ও বাতাসও শ্বাসপ্রশ্বাসে সহায়তা করে। তবে মাডস্কিপার পুরোপুরি স্থলচর প্রাণী নয়; স্বাভাবিক জীবনযাপনের জন্য তার আর্দ্র পরিবেশ এবং পানির সঙ্গে যোগাযোগ প্রয়োজন।

কোথায় বাস করে মাডস্কিপার?
মাডস্কিপার সাধারণত গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ও উপক্রান্তীয় অঞ্চলের উপকূলীয় কাদাময় এলাকায় দেখা যায়। ম্যানগ্রোভ বন, নদীর মোহনা, জোয়ার-ভাটার প্রভাব রয়েছে এমন কাদার চর এবং অগভীর উপকূলীয় জলাভূমি এদের পছন্দের আবাসস্থল। বাংলাদেশের সুন্দরবনসহ উপকূলীয় ম্যানগ্রোভ অঞ্চলেও এ ধরনের মাছের দেখা মেলে।


জোয়ারের সময় এসব এলাকা পানিতে ডুবে যায়, আবার ভাটার সময় কাদামাটি উন্মুক্ত হয়ে পড়ে। এই পরিবেশে মাডস্কিপার সহজেই পানিতে থাকা ও ডাঙায় চলাফেরা-দুই ধরনের আচরণ করতে পারে। কাদার রঙের সঙ্গে মিশে থাকা শরীরের রংও অনেক সময় শিকারি প্রাণীর নজর এড়াতে সাহায্য করে।

কাদার নিচে তৈরি করে নিরাপদ আশ্রয়
মাডস্কিপার কাদার মধ্যে গর্ত তৈরি করে বসবাস করে। প্রজাতি ও পরিবেশ অনুযায়ী গর্তের আকৃতি ও গভীরতা আলাদা হতে পারে। এসব গর্ত তাদের আশ্রয় নেওয়া, প্রতিকূল পরিস্থিতি থেকে বাঁচা এবং প্রজননের কাজে লাগে। জোয়ারের পানি উঠে এলে কিংবা পরিবেশ অতিরিক্ত গরম হয়ে পড়লে গর্ত তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নিরাপদ জায়গা হয়ে ওঠে।

কিছু প্রজাতি গর্তের ভেতরে ডিম রাখার জন্য আলাদা প্রকোষ্ঠ তৈরি করে। সেখানে পানিতে অক্সিজেনের পরিমাণ কম থাকলেও ডিমের বিকাশ নিশ্চিত করতে পুরুষ মাছ বিশেষ কৌশল ব্যবহার করে। গবেষণায় দেখা গেছে, জাপানি মাডস্কিপারের পুরুষ মাছ মুখে করে বাতাস নিয়ে গর্তের ডিম রাখার কক্ষে পৌঁছে দেয়। এতে ডিমের বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় অক্সিজেন সরবরাহ হয়। ডিম ফুটে বাচ্চা বের হওয়ার সময় হলে গর্তের ওই প্রকোষ্ঠে পানি প্রবেশের ব্যবস্থাও করে।

কী খায় এই অদ্ভুত মাছ?
মাডস্কিপার মূলত ছোট ছোট জলজ ও কাদায় বসবাসকারী প্রাণী খেয়ে থাকে। প্রজাতি ও আবাসস্থল অনুসারে এদের খাবারের তালিকায় থাকতে পারে ছোট কাঁকড়া, পোকামাকড়, ছোট চিংড়ি, কৃমি এবং অন্যান্য ক্ষুদ্র প্রাণী। কিছু প্রজাতি কাদার ওপর জন্মানো শৈবাল ও অণুজীবও খায়।

খাবার খোঁজার সময় এরা কাদার ওপর ঘুরে বেড়ায়। মাথার ওপরের দিকে থাকা চোখ দিয়ে চারপাশ পর্যবেক্ষণ করে শিকার শনাক্ত করতে পারে। আবার বিপদের আশঙ্কা দেখা দিলে দ্রুত লাফ দিয়ে সরে যায় কিংবা গর্তে আশ্রয় নেয়।

নিজের এলাকা রক্ষায় বেশ আগ্রাসী
মাডস্কিপার শুধু অদ্ভুত চেহারার মাছ নয়, এদের আচরণও বেশ ব্যতিক্রমী। অনেক প্রজাতি নিজেদের গর্ত ও আশপাশের এলাকাকে নিজেদের সীমানা হিসেবে বিবেচনা করে। অন্য মাছ সেই এলাকায় ঢুকে পড়লে এরা মুখ বড় করে খুলতে পারে, পাখনা খাড়া করে প্রদর্শন করতে পারে কিংবা প্রতিপক্ষকে তাড়ানোর চেষ্টা করে।

প্রজনন মৌসুমে পুরুষ মাডস্কিপার স্ত্রী মাছকে আকৃষ্ট করতে শরীর ও পাখনা প্রদর্শন করে। কিছু প্রজাতির পুরুষ মাছ লাফিয়ে ওঠে এবং বিশেষ ভঙ্গিতে নিজেদের উপস্থিতি জানান দেয়। এসব আচরণ সঙ্গী আকর্ষণ এবং প্রতিদ্বন্দ্বীকে মোকাবিলায় ভূমিকা রাখে।

বিবর্তন বুঝতে কেন গুরুত্বপূর্ণ?
মাডস্কিপারকে প্রায়ই জলজ প্রাণীর ডাঙায় চলাচলের অভিযোজন বোঝার একটি আকর্ষণীয় উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এর পাখনা দিয়ে কাদার ওপর চলাফেরা, বাতাস থেকে অক্সিজেন গ্রহণ এবং জল-স্থল দুই পরিবেশে সক্রিয় থাকার ক্ষমতা দেখায়, কীভাবে প্রাণীরা ভিন্ন পরিবেশে টিকে থাকার জন্য বিশেষ বৈশিষ্ট্য অর্জন করতে পারে।

তবে মাডস্কিপারকে স্থলচর প্রাণীর সরাসরি পূর্বপুরুষ বলা ঠিক হবে না। বরং এটি এমন একটি মাছের গোষ্ঠী, যারা নিজস্ব বিবর্তনীয় ধারায় উভচরসদৃশ জীবনযাপনের উপযোগী বৈশিষ্ট্য অর্জন করেছে। এদের নিয়ে গবেষণা জলজ মেরুদণ্ডী প্রাণীর অভিযোজন, শ্বাসপ্রশ্বাস এবং আচরণ সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের নতুন ধারণা পেতে সাহায্য করে।

প্রকৃতির এক অনন্য অভিযোজন
মাডস্কিপার প্রমাণ করে, মাছের জীবন শুধু পানির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। শক্তিশালী পাখনা, মাথার ওপরের দিকে থাকা চোখ, বাতাস থেকে অক্সিজেন গ্রহণের ক্ষমতা এবং কাদার মধ্যে গর্ত তৈরি করে বসবাস-সব মিলিয়ে এরা প্রকৃতির এক বিস্ময়কর সৃষ্টি। বিশেষ করে উপকূলীয় ম্যানগ্রোভ ও কাদাময় জলাভূমিতে এদের উপস্থিতি এসব বাস্তুতন্ত্রের জীববৈচিত্র্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

তাই মাডস্কিপারকে শুধু অদ্ভুত মাছ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; এটি প্রাণীর অভিযোজন ও পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে টিকে থাকার এক চমৎকার উদাহরণ। উপকূলীয় জলাভূমি ও ম্যানগ্রোভ বন সংরক্ষণ করা গেলে এই অনন্য প্রাণীসহ সেখানকার বৈচিত্র্যময় জীবজগতও সুরক্ষিত থাকবে।

Facebook Comments Box

আরও পড়ুন

দেশের বাজারে কমল সোনা ও রুপার দাম

কাদায় লাফিয়ে বেড়ায় যে মাছ, ডাঙাতেও নেয় শ্বাস!

পাহাড়ের পরিত্যক্ত জমি থেকে ৭৪ কোটি টাকার বিদ্যুৎ!

মেক্সিকোয় গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ঝড় র‌্যাচেলের আঘাতে নিহত ৪

পানির প্রবাহ ছয় গুণ বেড়ে যাওয়ায় পর্যটকদের জন্য বন্ধ জলপ্রপাত

বিমানে ছারপোকার উপদ্রব, বাতিল রোম-পার্থ ফ্লাইট

বেনাপোল স্থলবন্দরে টানা আট দিন আমদানি-রপ্তানি বন্ধ

চবি রেলস্টেশন এলাকায় পরিচ্ছন্নতা অভিযান, নিরাপদ খাবার নিয়ে সচেতনতা

vivo Y32 Combines Long-Lasting Battery with Everyday Durability

দীর্ঘস্থায়ী ব্যাটারি ও উন্নত সুরক্ষায় ভিভো ওয়াই৩২

HONOR opens its first Alpha Store in Bangladesh, bringing its smart ecosystem to life

দেশের প্রথম আলফা স্টোর চালু করল অনার, মিলবে স্মার্ট ইকোসিস্টেমের বিভিন্ন পণ্য