
প্রশান্ত মহাসাগরের পানির তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় বিশ্বজুড়ে তীব্র আবহাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। জলবায়ু গবেষকদের বিশ্লেষণে ‘সুপার এল নিনো’ হিসেবে চিহ্নিত এই পরিস্থিতির প্রভাবে চলতি বছরের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বিশ্বে অতিরিক্ত প্রায় ৪ লাখ ৫১ হাজার মানুষের মৃত্যু হতে পারে। একই সময়ে বাংলাদেশেও তাপজনিত কারণে ৬০০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যুর আশঙ্কা করা হয়েছে। এর পাশাপাশি তীব্র তাপপ্রবাহ, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, খরা ও খাদ্য সংকটের ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক জলবায়ু গবেষণা প্রতিষ্ঠান ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট ল্যাব, বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (WMO) ও নাসার (NASA) সাম্প্রতিক তথ্য ও প্রতিবেদনের ভিত্তিতে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, প্রশান্ত মহাসাগরের ‘নিনো ৩.৪’ অঞ্চলের পানির তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ৩ দশমিক ১১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি রেকর্ড হয়েছে। গত দেড় শতাব্দীর রেকর্ডের তুলনায় এটি অত্যন্ত বেশি। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, এল নিনোর প্রভাব ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বা তারও বেশি সময় স্থায়ী হতে পারে।
এই সময়ে বিশ্বের স্থলভাগের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় ১ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি থাকতে পারে। একই সঙ্গে স্বাভাবিক বছরের তুলনায় ৪৪ শতাংশ বেশি তীব্র গরমের দিন দেখা যেতে পারে।
বিশ্বজুড়ে বাড়তে পারে প্রাণহানি
ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট ল্যাবের ‘451,000 at Risk: Where Action Can Save Lives During the Super El Niño’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে অতিরিক্ত প্রায় ৪ লাখ ৫১ হাজার মানুষের মৃত্যু হতে পারে।

তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে উন্নয়নশীল দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। আফ্রিকার সাহেল অঞ্চলে প্রায় ৬৬ হাজার ৮০০ অতিরিক্ত মৃত্যুর আশঙ্কা করা হয়েছে। এর মধ্যে নাইজেরিয়ায় প্রায় ৩১ হাজার ৪০০ এবং সুদানে ১৭ হাজার ৫০০ মানুষের মৃত্যুর আশঙ্কা রয়েছে। খরা, পানিশূন্যতা ও খাদ্য সংকট সেখানে পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে।
দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশেও প্রাণহানির আশঙ্কা রয়েছে। ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন ও ভিয়েতনামে প্রায় ১৯ হাজার করে এবং ভারতে প্রায় ১৫ হাজার ৮০০ অতিরিক্ত মৃত্যুর আশঙ্কা করা হয়েছে। এসব অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী দাবদাহ ও অনিয়মিত বৃষ্টিপাত বড় সংকট তৈরি করতে পারে।
দক্ষিণ আমেরিকার ব্রাজিলে প্রায় ১৩ হাজার ৩০০ অতিরিক্ত মৃত্যুর আশঙ্কা করা হয়েছে। আমাজন অঞ্চলে খরা ও রেকর্ড তাপমাত্রা এর অন্যতম কারণ হতে পারে।
বাংলাদেশেও বড় ধরনের ঝুঁকি
সুপার এল নিনোর প্রভাবে বাংলাদেশেও তাপজনিত মৃত্যুর আশঙ্কা রয়েছে। আন্তর্জাতিক তথ্য বিশ্লেষণের ভিত্তিতে আগামী ছয় মাসে দেশে অতিরিক্ত ৬০০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।

দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলকে তুলনামূলক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে শুধু খুলনা অঞ্চলে প্রায় ৩১০ জনের মৃত্যুর আশঙ্কা রয়েছে। বরিশাল ও চট্টগ্রাম অঞ্চলেও প্রাণহানির শঙ্কা রয়েছে।
এল নিনোর প্রভাবে বাংলাদেশের শীতকালও স্বাভাবিকের তুলনায় মৃদু হতে পারে বলে আবহাওয়াবিদদের মতামতে উল্লেখ করা হয়েছে। এমনকি শীতের তীব্রতা খুব কম থাকতে পারে এবং মৃদু ঠান্ডা এক থেকে দুই দিনের বেশি স্থায়ী নাও হতে পারে। এতে কৃষি ও জনস্বাস্থ্যে প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
খাদ্য নিরাপত্তাতেও চাপ
এল নিনোর কারণে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে খরা ও বন্যা দেখা দিলে কৃষি উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (WFP) এ বিষয়ে সতর্ক করেছে।

ফসলের উৎপাদন কমে গেলে বিশ্বজুড়ে খাদ্য সরবরাহে চাপ তৈরি হতে পারে। এর ফলে প্রায় ৫ কোটি মানুষ তীব্র খাদ্য সংকটে পড়তে পারে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্যশস্যের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
আগাম প্রস্তুতির ওপর জোর
গবেষকেরা বলছেন, সম্ভাব্য প্রাণহানির এই হিসাব কোনো অনিবার্য ঘটনা নয়; বরং এটি আগাম সতর্কবার্তা। সময়মতো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া গেলে অনেক প্রাণহানি এড়ানো সম্ভব।
তাপপ্রবাহের পূর্বাভাস পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জনগণকে সতর্ক করা, শহরগুলোতে শীতল আশ্রয়কেন্দ্র ও সুপেয় পানির ব্যবস্থা করা এবং খোলা জায়গায় কাজ করা শ্রমিকদের কাজের সময় পরিবর্তনের মতো পদক্ষেপ নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
এ ছাড়া হাসপাতালগুলোতে তাপজনিত রোগের চিকিৎসার জন্য পর্যাপ্ত ওআরএস, জরুরি তরল (আইভি ফ্লুইড) ও প্রয়োজনীয় ওষুধ মজুত রাখার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আগাম সতর্কতা, স্বাস্থ্যসেবা প্রস্তুতি এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করা গেলে সুপার এল নিনোর সম্ভাব্য মানবিক ক্ষতি অনেকটাই কমানো সম্ভব।