
নেপালে ভূমিকম্পের পর তুষারধস থেকে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যায় ভয়াবহ বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। দেশটির নেপাল-তিব্বত সীমান্তবর্তী রসুয়া জেলায় এ দুর্যোগে এখন পর্যন্ত অন্তত ৯৫ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছে নেপালের পর্যটন মন্ত্রণালয়। এ ছাড়া ৩৪১ জন পর্যটক নিখোঁজ রয়েছেন, যাদের অধিকাংশই বিদেশি নাগরিক। খবর রয়টার্সের।
নিখোঁজ ও ক্ষতিগ্রস্তদের উদ্ধারে নেপালের সেনাবাহিনী ও নিরাপত্তা বাহিনী অভিযান চালাচ্ছে। উদ্ধার কার্যক্রমে ১৫টি হেলিকপ্টার মোতায়েন করা হয়েছে।
নেপাল ট্যুরিজম বোর্ড জানিয়েছে, তারা মোট ৩৪১ জন পর্যটককে নিখোঁজ হিসেবে শনাক্ত করেছে। তাদের মধ্যে বিদেশি নাগরিকের সংখ্যা বেশি। নিখোঁজদের মধ্যে যুক্তরাজ্যের ১২ জন নাগরিক রয়েছেন। ওই অঞ্চলে অবস্থান করা ভ্রমণকারীদের অবস্থান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কাজ চলছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
বুধবার ভোরে রাজধানী কাঠমান্ডুর উত্তরে অবস্থিত রসুয়া জেলায় আকস্মিক বন্যা আঘাত হানে। নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল পার্লামেন্টকে জানান, স্থানীয় সময় সকাল ৮টা ৩৭ মিনিটে ওই এলাকায় ভূমিকম্প আঘাত হানে। প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, ভূমিকম্পের পর তুষারধস শুরু হয় এবং এর ফলে আকস্মিক বন্যা দেখা দেয়। তবে এসব তথ্য এখনো যাচাই করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, নেপালের পাশাপাশি চীনও ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় নেপাল চীনের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছে।
তিনি জানান, এখন পর্যন্ত ২৬ জন পুলিশ সদস্য, নয়জন সশস্ত্র পুলিশ সদস্য এবং ৪৪ জন সেনা সদস্য নিখোঁজ রয়েছেন। এ ছাড়া কাস্টমস ও ইমিগ্রেশন বিভাগের কয়েকজন কর্মকর্তারও নিখোঁজ হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
বন্যা ও ভূমিধসে সড়ক, সেতু, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং জলবিদ্যুৎ অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। রসুয়া ও নুওয়াকোট জেলা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানান নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। ত্রিশুলি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং বিভিন্ন এলাকার সেতু ভেসে গেছে।
এর আগে বিবিসির প্রতিবেদনে ৩১ জনের মৃত্যুর খবর জানানো হয়েছিল। তখন নেপাল ট্যুরিজম বোর্ডের তথ্যের ভিত্তিতে ৩৮৪ জন নিখোঁজ থাকার কথা জানানো হয়। নিখোঁজ বিদেশিদের মধ্যে ১২ জন ব্রিটিশ, ১০৫ জন ভারতীয়, ৩৭ জন অনাবাসী ভারতীয় (এনআরআই), ১৭ জন মালয়েশীয়, চারজন দক্ষিণ আফ্রিকান, তিনজন মার্কিন, একজন অস্ট্রেলীয় ও একজন ডাচ নাগরিক ছিলেন। এ ছাড়া আরও ১১১ জনের জাতীয়তা নিশ্চিত করা যায়নি।
নেপালের সেনাবাহিনীর মুখপাত্র রাজারাম বাসনেট জানান, এ পর্যন্ত ৮৮ জন বন্যাদুর্গতকে উদ্ধার করা হয়েছে। একই সঙ্গে মাইলুং গ্রাম থেকে আরও ১১৫ জনকে উদ্ধারের চেষ্টা চলছে। অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযানের জন্য ১৫টি হেলিকপ্টার মোতায়েন করা হয়েছে।
নেপালের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তিমুরে, সিয়াব্রুবেসি ও বেত্রাবতীতে ব্যাপক প্রাণহানি ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে।
এদিকে নেপাল-চীন সীমান্তবর্তী একটি বাণিজ্যকেন্দ্রে ভূমিধসের ঘটনায় ব্যাপক হতাহতের খবর জানিয়েছে চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং নিখোঁজদের উদ্ধারে সর্বাত্মক তৎপরতা চালানোর নির্দেশ দিয়েছেন। একই সঙ্গে দ্বিতীয় দফার দুর্যোগ এড়াতে পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা জোরদার এবং আগাম সতর্কবার্তা চালুর তাগিদ দিয়েছেন তিনি।
চীনা সরকারের পক্ষ থেকে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনার জন্য উদ্ধারকারী দলকে তিব্বতে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম সিসিটিভিও চীন নিয়ন্ত্রিত তিব্বতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির খবর জানিয়েছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আকস্মিক বন্যার পর আটজন দক্ষিণ কোরীয় নাগরিকের সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। নিখোঁজ ব্যক্তিরা ওই এলাকায় একটি জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে কাজ করছিলেন। আরও ১০ জন দক্ষিণ কোরীয় নাগরিক সেখানে আটকা পড়েছেন এবং উদ্ধারের অপেক্ষায় রয়েছেন। তাদের উদ্ধারে নেপাল সরকার একটি হেলিকপ্টার পাঠিয়েছে।
এদিকে নেপালে অবস্থিত চীনা ব্যবসায়ী ইয়ে লিয়াং জানিয়েছেন, আকস্মিক বন্যাকবলিত এলাকায় তার প্রতিষ্ঠানের সাতটি কনটেইনার ট্রাক রয়েছে। এসব ট্রাকে নেপালি কর্মীরা কাজ করছিলেন। তাদের কারও সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না বলে জানান তিনি। এলাকায় কোনো মোবাইল সিগন্যাল না থাকায় তাদের কাছে পৌঁছানোও সম্ভব হচ্ছে না।
ইয়ে লিয়াং আরও বলেন, তার জানা মতে, দুর্যোগের আগে কোনো সতর্কবার্তা দেওয়া হয়নি। বর্ষাকালে ওই এলাকায় মাঝেমধ্যে কাদাধস ও ভূমিধস হলেও এবারের পরিস্থিতি অনেক বেশি গুরুতর বলে জানান তিনি।
অন্যদিকে তিব্বতের দিকে সিচুয়ান প্রদেশের গুয়ান দাওশুয়ান জানান, বুধবার বেলা বাড়ার দিকে তিনি তিব্বতে কর্মরত তার স্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ হারিয়ে ফেলেন। তার স্ত্রী সেখানে সড়ক ও সেতু নির্মাণ প্রকল্পে যুক্ত একটি রাষ্ট্রায়ত্ত নির্মাণ প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন।
গুয়ান জানান, সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় নেপালের কর্তৃপক্ষ হেলিকপ্টার পাঠিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের চেষ্টা করেছে। তবে প্রবল বাতাসের কারণে হেলিকপ্টারটির ঘটনাস্থলে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ে।