ঢাকাশনিবার , ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  1. সর্বশেষ

বালিয়াড়ি ধ্বংস করে সড়ক, কক্সবাজার সৈকতের পরিবেশ ঝুঁকিতে

প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক
২৫ অগাস্ট ২০২৬, ১১:৪৯ সকাল

Link Copied!

কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের হারানো প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ফিরিয়ে আনতে যখন বালিয়াড়ি দখলমুক্ত করার উদ্যোগ চলছে, ঠিক তখনই সেই বালিয়াড়ি ও সাগরলতা গুঁড়িয়ে নির্মাণ করা হচ্ছে দীর্ঘ সড়ক। এতে একদিকে সৈকতের প্রাকৃতিক প্রতিবেশ নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে ঢেউ, ঝড় ও উপকূলীয় ক্ষয় থেকে সৈকতকে রক্ষাকারী প্রাকৃতিক বালুর ডেইলও ধ্বংস করা হচ্ছে।

কক্সবাজার শহরের সুগন্ধা পয়েন্ট এলাকায় সরেজমিনে দেখা গেছে, সৈকতের বিস্তীর্ণ অংশ ভরাট করে চলছে সড়ক নির্মাণকাজ। নির্মাণের জন্য সরিয়ে ফেলা হচ্ছে প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা বালুর ডেইল। একই সঙ্গে ধ্বংস হচ্ছে সাগরলতা, লাল কাঁকড়াসহ বিভিন্ন প্রাণীর আবাসস্থল।

পরিবেশবাদীদের অভিযোগ, সৈকতের পরিবেশগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ অংশে সড়ক নির্মাণের আগে বিকল্প স্থান বিবেচনা করা হয়নি। পর্যটন অবকাঠামো উন্নয়নের নামে কক্সবাজারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সুরক্ষা ব্যবস্থাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলা হচ্ছে।

কক্সবাজার পৌরসভা সূত্রে জানা গেছে, সুগন্ধা পয়েন্ট থেকে হোটেল সায়মন পর্যন্ত ১ দশমিক ৬ কিলোমিটার দীর্ঘ উপকূলীয় সড়কটি ‘নগর উন্নয়ন ও নগর শাসন প্রকল্প’-এর আওতায় নির্মাণ করা হচ্ছে। সড়কটির প্রস্থ ২৮ মিটার। ২০২৫ সালের ১৭ জুন প্রকল্পটির দরপত্র আহ্বান করা হয়। পরে ৬৩ কোটি ৫০ লাখ টাকায় নির্মাণকাজের দায়িত্ব পায় ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ার্স (এনডিই)। প্রকল্পটির অর্থায়ন করছে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা) এবং বাস্তবায়ন করছে কক্সবাজার পৌরসভা। ২০২৭ সালের ৫ অক্টোবর প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।

তবে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকার মধ্যে সৈকতের বালিয়াড়ি ভরাট করে এ অবকাঠামো নির্মাণে পরিবেশগত ছাড়পত্র নেওয়া হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

এনডিইর প্রকল্প ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ শাহীন মিয়া বলেন, পরিবেশের ছাড়পত্র নেওয়ার বিষয়টি কক্সবাজার পৌরসভা বলতে পারবে।

কক্সবাজার পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী রুমেল বড়ুয়া বলেন, সমুদ্রসৈকতের সৌন্দর্যবর্ধন, ভাঙনকবলিত এলাকা রক্ষা এবং পর্যটকদের সুবিধার জন্য সড়কটি নির্মাণ করা হচ্ছে।

তবে পরিবেশগত ছাড়পত্রের বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজার জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক খন্দকার মাহমুদ পাশা বলেন, সৈকতের বালিয়াড়ি ভরাট করে সড়ক নির্মাণের বিষয়টি তিনি শুনেছেন। বিষয়টি সরেজমিনে পরিদর্শন করে প্রতিবেদন দিতে একজন কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদন পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তিনি আরও বলেন, কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ)। এ এলাকায় কোনো ধরনের কাজ করতে হলে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র প্রয়োজন। তবে সুগন্ধা পয়েন্ট থেকে কলাতলী পয়েন্ট পর্যন্ত সড়ক নির্মাণের জন্য পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে কোনো ছাড়পত্র নেওয়া হয়নি।

এ বক্তব্যের পর প্রকল্পটির অনুমোদন ও পরিবেশগত যাচাই নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

ধ্বংস হচ্ছে প্রাকৃতিক সুরক্ষা ব্যবস্থা

পরিবেশবাদীদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ সড়ক নির্মাণে ধ্বংস হওয়া বালুর ডেইল নিয়ে। প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা এসব বালিয়াড়ি শুধু সৈকতের সৌন্দর্যের অংশ নয়, উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্রেরও গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। ঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও ঢেউয়ের অভিঘাত থেকে উপকূলকে রক্ষায় বালিয়াড়ি প্রাকৃতিক প্রতিরোধক হিসেবে কাজ করে।

ইয়ুথ এনভায়রনমেন্ট সোসাইটির (ইয়েস) প্রধান নির্বাহী ইবরাহীম খলিল মামুন বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও উপকূলীয় ক্ষয় মোকাবিলায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রাকৃতিকভাবে সৈকতে বালুর ডেইল সৃষ্টি ও সংরক্ষণে বিপুল অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, কক্সবাজার সৈকতের ভাঙন রোধ এবং পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সুরক্ষায় যুক্তরাষ্ট্রের অর্থায়নে প্রাকৃতিক সুরক্ষা ব্যবস্থা হিসেবে বালুর ডেইল সৃষ্টি করা হয়েছিল। অথচ পাশেই বিকল্প জায়গা থাকার পরও সড়ক নির্মাণের নামে সেই ডেইল ধ্বংস করা হচ্ছে।

ইবরাহীম খলিল আরও বলেন, দাতা দেশগুলো বিষয়টি স্বাভাবিকভাবে নেবে না। নির্মাণকাজ দ্রুত বন্ধ করা প্রয়োজন।

কক্সবাজার-টেকনাফ সমুদ্রসৈকত ১৯৯৯ সালে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) হিসেবে ঘোষিত হয়। উচ্চ আদালতের বিভিন্ন আদেশ ও সরকারি নীতিতেও সৈকতের প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য ও পরিবেশ রক্ষার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

এ ছাড়া জোয়ার-ভাটার মধ্যবর্তী রেখা থেকে সৈকতসংলগ্ন প্রথম ৩০০ মিটার এলাকাকে ‘নো ডেভেলপমেন্ট জোন’ হিসেবে বিবেচনা করে সেখানে স্থাপনা নির্মাণে নিষেধাজ্ঞার বিষয়টিও আদালতের নির্দেশনা ও পরবর্তী প্রশাসনিক কার্যক্রমে উঠে এসেছে।

সাম্প্রতিক সময়েও সৈকতের বালিয়াড়ি দখলমুক্ত করতে অভিযান চালানো হয়েছে। ২০২৬ সালের মার্চে সুগন্ধা পয়েন্ট পরিদর্শন করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও সৈকতের বালিয়াড়িতে কোনো স্থাপনা না রাখার কথা জানিয়েছিলেন।

বালিয়াড়ি রক্ষায় প্রশ্ন পরিবেশবাদীদের

পরিবেশবাদীদের প্রশ্ন, যখন একদিকে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে বালিয়াড়ি ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ চলছে, তখন একই এলাকায় সরকারি প্রকল্পের নামে বালিয়াড়ি কেটে স্থায়ী সড়ক নির্মাণ কীভাবে পরিবেশ সুরক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ?

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) কক্সবাজারের সাধারণ সম্পাদক কলিম উল্লাহ বলেন, কক্সবাজার সৈকতে স্থাপনা নির্মাণ না করা এবং স্থায়ী-অস্থায়ী স্থাপনা উচ্ছেদের বিষয়ে উচ্চ আদালতের সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে।

তিনি বলেন, ২০১৩ সালের কক্সবাজারের মহাপরিকল্পনা অনুযায়ী জোয়ার-ভাটার মধ্যবর্তী লাইন থেকে সৈকতসংলগ্ন প্রথম ৩০০ মিটার এলাকাকে ‘নো ডেভেলপমেন্ট জোন’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সেখানে কোনো ধরনের স্থাপনা নির্মাণের সুযোগ নেই।

কলিম উল্লাহ আরও বলেন, এর পরও সৈকতের বালিয়াড়ি দখল করে সড়ক নির্মাণ অত্যন্ত দুঃখজনক ও উদ্বেগজনক। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত অবিলম্বে বিষয়টি পর্যালোচনা করে পরিবেশের ক্ষতি বন্ধ করা।

উচ্চ আদালতের সাম্প্রতিক রায়েও কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের পরিবেশগত বৈশিষ্ট্য রক্ষার গুরুত্ব পুনরায় উঠে এসেছে। আদালতের নথিতে সৈকতকে ইসিএ হিসেবে ঘোষণার পাশাপাশি এর প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য পরিবর্তনের ওপর নিষেধাজ্ঞার বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে।

তথ্যসুত্র: ঢাকা মেইল

Facebook Comments Box

আরও পড়ুন

টিসিবির কার্যক্রমে ডিজিটাল রূপান্তর, সাশ্রয় হবে ৩০০-৩৫০ কোটি টাকা

দুর্গম এলাকায় চিকিৎসাসেবা দিতে ভাসমান হাসপাতাল ‘স্বাস্থ্য তরী’ নির্মাণ করবে সরকার

চীনে বাংলাদেশি রোগীদের চিকিৎসায় বিশেষ সুবিধার ঘোষণা

বঙ্গোপসাগরে ঘূর্ণিঝড়ের সম্ভাবনা, সম্ভাব্য নাম ‘অর্নব’

‘সমন্বিত জলবায়ু পদক্ষেপ’ রক্ষা করতে পারে কোটি কোটি মানুষের প্রাণ

২০২৬ সালের ১২ সিনেমায় ৭৫১ বার দেখানো হয় ধূমপান ও তামাক ব্যবহারের দৃশ্য

রাজস্ব বৃদ্ধি ও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় জাতীয় তামাক কর নীতি প্রণয়ন জরুরি

চাকরি স্থায়ীকরণের দাবিতে কুষ্টিয়ায় ফের বিএটিবি কর্মীদের মানববন্ধন

ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তরকে প্রযুক্তি ও জনবলে শক্তিশালী করা হবে: বাণিজ্যমন্ত্রী

হাওরে হাঁস চড়াতে গিয়ে বজ্রপাতে যুবকের মৃত্যু

টিসিবির কার্যক্রমে আসছে ডিজিটাল নজরদারি, বাদ ৫৯ লাখ অযোগ্য আবেদনকারী

আগামী মাসে রূপপুর থেকে জাতীয় গ্রিডে যাবে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ: রুশ রাষ্ট্রদূত