
তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে ওঠা নজিরবিহীন এক দাবদাহে ফুটছে পুরো পূর্ব এশিয়া। ঐতিহাসিক সব রেকর্ড ভেঙে দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান ও হংকংজুড়ে বিরাজ করছে প্রখর খরা ও চরম তাপমাত্রা। তাপমাত্রার এই তাণ্ডবে শত শত একর জমির ফসল পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে, মারা যাচ্ছে লাখ লাখ গবাদিপশু ও খামারের মাছ। গৃহপালিত পশুর পাশাপাশি হিট স্ট্রোকে প্রাণ হারাচ্ছেন সাধারণ মানুষও। দ্য গার্ডিয়ান, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস এবং লাইভমিন্ট-এর মতো আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোতে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার অবস্থা ভয়াবহ:
দক্ষিণ কোরিয়ার রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ সংস্থার (কেডিএ) তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার (১৪ আগস্ট) পর্যন্ত অন্তত ৩১ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়েছে। এ ছাড়া তীব্র গরমে দেশটিতে ৯ লাখের বেশি গবাদিপশু এবং ১৪ লাখের বেশি খামারের মাছ মারা গেছে।
গ্যাংওয়ান প্রদেশের আলুচাষি লি সং-হিয়ক উত্তর-পূর্বের ইয়াংগু কাউন্টিতে জমিতে নেমে দেখেন আলুগুলো পচে নরম হয়ে গেছে। স্থানীয় সম্প্রচারমাধ্যম এসবিএসকে তিনি জানান, মাটি যেন ওভেনের মতো গরম হয়ে গেছে। পুরো মাঠের আলুর একই অবস্থা।
অন্যদিকে গুয়াংজু অঞ্চলের ৫০ বছরের অভিজ্ঞ তরমুজ চাষি হং কিয়ং-হি জানান, কয়েক দিনের গরমে তার তরমুজগুলো গলে নরম মণ্ডে পরিণত হয়েছে। পাঁচ দশকের কৃষি জীবনে তিনি এমন পরিস্থিতি কখনো দেখেননি। দক্ষিণ জোল্লা প্রদেশের স্ট্রবেরি চাষি ইউন উ-হা তাঁর তিন মাসের পরিশ্রমে গড়ে তোলা চারা গাছ হারিয়েছেন, যা কৃষি বিমার আওতাভুক্ত না থাকায় তাঁকে চরম আর্থিক ঋণের মুখে ফেলেছে।
গত ২ আগস্ট দক্ষিণ কোরিয়ার দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় শহর ইয়ানসানে তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় রেকর্ড ৪২ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা ১৯০৪ সালের পর সর্বোচ্চ। পরিস্থিতির ভয়াবহতায় দেশটির প্রেসিডেন্ট লি জে-মিয়ং মন্ত্রিপরিষদকে সংকট মোকাবিলা ব্যবস্থাকে পুরোপুরি ঢেলে সাজানোর নির্দেশ দিয়েছেন।
জাপান ও হংকংয়েও ত্রাহি অবস্থা:
দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিবেশী দেশ জাপানেও একাধিক স্থানে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে গেছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দেশের আবহাওয়া সংস্থা এই বছর ৪০ ডিগ্রির ওপরের তাপমাত্রার জন্য প্রথমবারের মতো ‘কোকুশোবি’ বা ‘নিষ্ঠুর গরমের দিন’ নামে নতুন ক্যাটাগরি চালু করেছে। টোকিওর একটি চিড়িয়াখানায় হিট স্ট্রোকে তিনটি সিংহ মারা গেছে। জাপানি গবেষকদের মতে, মানবসৃষ্ট বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ছাড়া জুলাই মাসের এই তীব্র দাবদাহ হওয়া ‘প্রায় অসম্ভব’ ছিল।
একই সময়ে হংকংয়ে তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় রেকর্ড ৩৬ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা ১৮৮৪ সালের পর সর্বোচ্চ। তবে উন্মুক্ত স্থানে কর্মরত শ্রমিকদের জন্য রাখা তাপ-সতর্কতা ব্যবস্থা নিয়ে সেখানে ইতিমধ্যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
এ ছাড়া চীনের জিনজিয়াং অঞ্চলে তাপমাত্রা ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছেছে এবং উত্তর কোরিয়ার রাজধানী পিয়ংইয়ংয়ে রাতের তাপমাত্রা ২৫ ডিগ্রির নিচে না নামায় দেখা দিয়েছে ‘ট্রপিক্যাল নাইট’ বা উষ্ণ রাতের পরিস্থিতি।
জলবায়ু বিজ্ঞানীদের সতর্কবার্তা:
পুসান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির জলবায়ু বিজ্ঞানী এবং জাতিসংঘের জলবায়ুবিষয়ক প্যানেলের (আইপিসিসি) প্রধান লেখক জুনে-ই লি জানান, তিব্বতীয় মালভূমি ও পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরের উচ্চচাপ বলয় এবং এল নিনো প্রভাবের যৌথ কারণেই এই দাবদাহ ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার (ডব্লিউএমও) প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৯৯১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে এশিয়ার উষ্ণায়নের গতি আগের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে বলেছেন, দ্রুত গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন কমানো এবং সমন্বিত অভিযোজন পরিকল্পনা গ্রহণ করা না হলে আগামীতে এ ধরনের দুর্যোগ আরও নিয়মিত ও ভয়াবহ রূপ নেবে।