
চিকিৎসাসেবার গুণগত মানোন্নয়নে চিকিৎসক, রোগী ও রোগীর উদ্বিগ্ন স্বজন-এই তিন পক্ষের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা, সম্মান ও সহানুভূতির সম্পর্ক বজায় রাখা জরুরি বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, এই তিন পক্ষের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা ও সম্মানের পরিবর্তে চিকিৎসকেরা যদি নিরাপত্তাহীনতা অনুভব করেন কিংবা রোগী ও স্বজনেরা চিকিৎসকের ওপর বিশ্বাস ও মর্যাদার সম্পর্ক অনুভব না করেন, তাহলে হাসপাতালের অবকাঠামোগত উন্নয়ন যতই করা হোক, চিকিৎসার জন্য বিদেশমুখিতা বন্ধ করা যাবে না।
শনিবার (১৫ আগস্ট) সকালে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে ৫০০ শয্যাবিশিষ্ট ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস অ্যান্ড হাসপাতালের নবনির্মিত ১৫ তলা ‘ভবন-২’ (নিউরোসায়েন্স-২)-এর উদ্বোধন ও ফলক উন্মোচন শেষে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আধুনিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার লক্ষ্য শুধু অবকাঠামো ও প্রযুক্তির সম্প্রসারণ নয়। উন্নত প্রযুক্তি, দক্ষ মানবসম্পদ, সুশাসন এবং সময়োপযোগী নীতির সমন্বয়ের মাধ্যমে দেশের প্রতিটি মানুষের জন্য সহজলভ্য, সাশ্রয়ী ও মানসম্মত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করাই এর মূল লক্ষ্য।
তিনি বলেন, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস অ্যান্ড হাসপাতালের ভবন-২ উদ্বোধনের মাধ্যমে এই লক্ষ্য অর্জনের পথে দেশ আরও এক ধাপ এগিয়েছে বলে তিনি বিশ্বাস করেন।
প্রয়াত সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে স্মরণ করে তারেক রহমান বলেন, ২০০৬ সালের ২৩ অক্টোবর তিনি এই হাসপাতালের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন। সময়ের প্রয়োজনে আরও আধুনিক সুযোগ-সুবিধা নিয়ে হাসপাতালটি বর্তমানে আকার ও আয়তনে আরও বড় রূপ ধারণ করেছে।
প্রযুক্তি ও মানবিকতার সমন্বয়কে আধুনিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রযুক্তি রোগ শনাক্ত করতে পারে, কিন্তু রোগীর ভয়, উদ্বেগ ও মানসিক কষ্ট বুঝে তাকে আশ্বস্ত করার ক্ষেত্রে চিকিৎসকের মানবিক আচরণের কোনো বিকল্প নেই।
তিনি বলেন, সহানুভূতিশীল আচরণ, মনোযোগ দিয়ে রোগীর কথা শোনা এবং তার মানসিক অবস্থা বোঝা চিকিৎসার মানকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। তবে চিকিৎসাসেবা ও পরিবেশ নির্বিঘ্ন রাখার দায় শুধু চিকিৎসকদের একার নয়; এটি সবার সম্মিলিত দায়িত্ব।
প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, উন্নত চিকিৎসা শুধু শহরের বিত্তবান মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে সেটিকে পূর্ণাঙ্গ আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা বলা যায় না।
প্রত্যন্ত অঞ্চলের রোগীদের বিপুল অর্থ ব্যয় করে রাজধানীতে আসা এড়াতে ই-হেলথ কার্ডের মাধ্যমে একটি আধুনিক ও কার্যকর রেফারেল সিস্টেম গড়ে তোলার কাজ সরকার শুরু করেছে বলেও জানান তিনি।
তিনি বলেন, এর অংশ হিসেবে দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে পূর্ণাঙ্গ ‘প্রাইমারি হেলথ কেয়ার ইউনিট’ প্রতিষ্ঠার কাজ শুরু হয়েছে। পাশাপাশি বর্তমান সরকারের মেয়াদকালেই পর্যায়ক্রমে প্রতিটি উপজেলা হাসপাতালকে ১৫১ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালে উন্নীত করা হবে।
আজকের শিশুরাই আগামীর ভবিষ্যৎ উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সুস্থ আগামী’ বিনির্মাণে শিশুদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের প্রতি বিশেষ নজর দেওয়া সবার দায়িত্ব। এ লক্ষ্যেই সরকার শিশুদের জন্য নতুন শিক্ষা কারিকুলাম প্রণয়ন করছে এবং শিশু স্বাস্থ্যের প্রতিও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
জাতীয় বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দের বিষয়টি উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, ‘সুস্বাস্থ্যের বাংলাদেশ’ গড়ার অঙ্গীকার শুধু কোনো স্লোগান নয়। সরকার এমন একটি কার্যকর স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায়, যাতে নাগরিকদের চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে যেতে না হয় এবং অর্থের অভাবে কেউ চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত না হন।
নিউরোসায়েন্স হাসপাতালের নতুন ভবন চিকিৎসাসেবার সক্ষমতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্ট্রোক, এপিলেপসি, পারকিনসন্স, ডিমেনশিয়া ও মেরুদণ্ডের জটিল রোগের চিকিৎসা সক্ষমতা এই ভবনের মাধ্যমে বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।
সর্বাধুনিক আইসিইউ, অপারেশন থিয়েটার ও ডায়াগনস্টিক সুবিধাসম্পন্ন ভবনটি চিকিৎসাসেবার পাশাপাশি চিকিৎসা গবেষণা ও উচ্চতর শিক্ষার ক্ষেত্রেও একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
সরকার একটি কল্যাণমুখী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে যেখানে চিকিৎসা পাওয়ার জন্য কোনো নাগরিককে দেশের বাইরে যেতে হবে না এবং অর্থের অভাবে কেউ স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হবে না। সাধারণ মানুষের মানসম্মত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে চিকিৎসকদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান। এছাড়া সমাজকল্যাণ মন্ত্রী ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন, স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন, স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী এম এ মুহিত এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।