
টুথপেস্টের পর এবার কাঁচা দুধ, বিভিন্ন ব্র্যান্ডের প্যাকেটজাত তরল ও গুঁড়া দুধ, দুগ্ধজাত পণ্য এবং চিনিতেও ক্ষতিকর ‘মাইক্রোপ্লাস্টিক’-এর উপস্থিতি শনাক্ত করেছেন গবেষকরা। গবেষণায় উঠে এসেছে, খাদ্য উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ ও প্যাকেজিংয়ের বিভিন্ন ধাপে প্লাস্টিকের সংস্পর্শে আসার কারণেই এসব খাদ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিকের দূষণ বাড়ছে।
দুধে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি নিয়ে গবেষণাটি পরিচালনা করেছেন যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (যবিপ্রবি) পুষ্টি ও খাদ্যপ্রযুক্তি বিভাগের একদল গবেষক। সানাউল্লাহ মাজুমদারের নেতৃত্বে ১০ সদস্যের গবেষক দল দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সংগ্রহ করা কাঁচা দুধ এবং সুপারশপে বিক্রি হওয়া প্রসেসড দুধের নমুনা পরীক্ষা করেন। গবেষকদের দাবি, বাংলাদেশে দুধের মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ ও পলিমার ঝুঁকি নিয়ে এটিই প্রথম বিস্তারিত বৈজ্ঞানিক গবেষণা।
গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি ১০০ মিলিলিটার প্রসেসড বা ব্র্যান্ডের দুধে গড়ে ১৫৬ দশমিক ০৬টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে। কাঁচা দুধে প্রতি ১০০ মিলিলিটারে গড়ে ৯৩ দশমিক ৩৯টি এবং অন্যান্য দুগ্ধজাত পণ্যে গড়ে ৭০ দশমিক ৮০টি কণা শনাক্ত হয়েছে।
গবেষকদের ধারণা, খামার থেকে দুধ সংগ্রহ, সংরক্ষণ, অ্যালুমিনিয়াম ও প্লাস্টিক পাইপে পরিবহন, কারখানায় প্রক্রিয়াজাতকরণ, প্লাস্টিকের গ্লাভস ব্যবহার এবং বোতলজাতকরণের মতো বিভিন্ন ধাপে প্লাস্টিকের সংস্পর্শে আসার কারণেই প্যাকেটজাত দুধে মাইক্রোপ্লাস্টিকের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়।
গবেষণাগারে উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে বিশ্লেষণে দেখা যায়, শনাক্ত হওয়া অধিকাংশ প্লাস্টিক কণাই ছিল স্বচ্ছ এবং তন্তু বা আঁশের মতো। এসব নমুনায় পিটিএফই (টেফলন), পিইটি, নাইলন-৬ এবং পিভিসিসহ বিভিন্ন ধরনের পলিমারের উপস্থিতি পাওয়া গেছে।
গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় শিশুদের শরীরে মাইক্রোপ্লাস্টিক প্রবেশের ঝুঁকি অনেক বেশি। বিশেষ করে ৪ থেকে ১০ বছর বয়সী শিশুদের খাদ্যতালিকায় দুধের পরিমাণ বেশি থাকায় তাদের শরীরে এসব ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা বেশি প্রবেশ করতে পারে।
এদিকে, চিনিতে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি নিশ্চিত করেছে Journal of Food Composition and Analysis-এ প্রকাশিত একটি গবেষণা। গবেষণাটি পরিচালনা করেছেন সাদিয়া আফরিন, নায়ন হোসেন এবং মোস্তাফিজুর রহমান।
গবেষণার জন্য ঢাকার বিভিন্ন খুচরা বাজার থেকে সংগ্রহ করা সাত ধরনের ব্র্যান্ডেড ও খোলা চিনির নমুনা পরীক্ষা করা হয়। এতে দেখা যায়, ব্র্যান্ডেড চিনিতে প্রতি কেজিতে গড়ে ৩২২টি এবং খোলা বা নন-ব্র্যান্ডেড চিনিতে গড়ে ৪০৩টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা রয়েছে। যদিও দুই ধরনের চিনির মধ্যে পরিসংখ্যানগতভাবে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য পাওয়া যায়নি, তবে খোলা চিনিতে দূষণের মাত্রা তুলনামূলক বেশি ছিল।
পরীক্ষায় শনাক্ত হওয়া কণাগুলোর আকার ছিল প্রায় ১২ মাইক্রোমিটার থেকে ৩ দশমিক ১৯ মিলিমিটার পর্যন্ত। এর মধ্যে প্রায় ৬৩ শতাংশ ছিল তন্তু (ফাইবার), ২১ শতাংশ খণ্ড (ফ্র্যাগমেন্ট), ১১ শতাংশ পাতলা স্তর (ফিল্ম) এবং ৫ শতাংশ গোলাকার কণা।
গবেষকদের মতে, এসব মাইক্রোপ্লাস্টিক মূলত প্লাস্টিকের প্যাকেজিং, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ যন্ত্রপাতি, পরিবহন, সংরক্ষণ এবং পরিবেশে ছড়িয়ে থাকা ক্ষয়প্রাপ্ত প্লাস্টিক থেকে খাদ্যে প্রবেশ করছে।
রাসায়নিক বিশ্লেষণে অ্যাক্রাইলোনাইট্রাইল বিউটাডিয়েন স্টাইরিন (এবিএস), পলিভিনাইল ক্লোরাইড (পিভিসি), পলিইথিলিন টেরেফথ্যালেট (পিইটি), পলিটেট্রাফ্লুরোইথিলিন (পিটিএফই), উচ্চ ঘনত্বের পলিইথিলিন (এইচডিপিই) এবং নাইলনসহ বিভিন্ন ধরনের প্লাস্টিক পলিমারের উপস্থিতি নিশ্চিত হয়েছে।
গবেষকদের মতে, খাদ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ কমাতে উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ ও প্যাকেজিং ব্যবস্থায় প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানোর পাশাপাশি এ বিষয়ে আরও বিস্তৃত গবেষণা এবং কার্যকর নীতিমালা গ্রহণ জরুরি।