
এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে পানি সুরক্ষা নিশ্চিত করতে দ্রুত বিনিয়োগ ও প্রয়োজনীয় সংস্কারের আহ্বান জানিয়েছেন এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) প্রেসিডেন্ট মাসাতো কান্দা। একই সঙ্গে উন্নয়নশীল দেশগুলোর দুর্যোগ প্রস্তুতি, অবকাঠামো ও পানি ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করতে জাপানের সঙ্গে যৌথভাবে এডিবি পরিচালিত নতুন একটি তহবিলের কথাও জানিয়েছেন তিনি।
মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) জাপানের টোকিওতে জাপানের পানি দিবসের ৫০তম বার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত আন্তর্জাতিক সিম্পোজিয়ামে মূল বক্তব্যে এসব কথা বলেন মাসাতো কান্দা। অনুষ্ঠানে জাপানের সম্রাটও উপস্থিত ছিলেন।
মাসাতো কান্দা বলেন, পানি মানুষের স্বাস্থ্য, খাদ্য ও জ্বালানির ভিত্তি। এটি বাস্তুতন্ত্র টিকিয়ে রাখার পাশাপাশি অর্থনীতিকে সচল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিশেষ করে পরিচ্ছন্ন ও নির্ভরযোগ্য জলবিদ্যুতের ক্ষেত্রে পানি ও জ্বালানি নিরাপত্তার সম্পর্ক আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
তিনি বলেন, পানি সুরক্ষা কেবল একটি সম্পদের বিষয় নয়, এটি অর্থনৈতিক উন্নয়নের ভিত্তি। সংঘাত ও অস্থিতিশীল জ্বালানি বাজারের কারণে বিশ্ব যখন নানা অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তখন পানি ও জ্বালানি নিরাপত্তার মধ্যকার সম্পর্ক আগের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
এডিবি প্রেসিডেন্ট জাপানের পানি ব্যবস্থাপনার অভিজ্ঞতার প্রশংসা করে বলেন, দেশটির পাঁচ দশকের জাতীয় কর্মকাণ্ড টেকসই বিনিয়োগ, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান ও দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের একটি মডেল হতে পারে। ১৯৭৭ সালে পানি দিবস ও পানি সপ্তাহ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে জাপান পানিকে একটি যৌথ জাতীয় দায়িত্ব হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
তিনি জাপানের নদী অববাহিকার সমন্বিত ব্যবস্থাপনা, দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস, কার্যকর পানি সরবরাহ নেটওয়ার্ক এবং বিকেন্দ্রীভূত বর্জ্য পানি শোধন ব্যবস্থার বিষয়ও তুলে ধরেন। পাশাপাশি দুর্যোগ ঝুঁকি কমাতে সেন্দাই কাঠামো এগিয়ে নেওয়া এবং বিভিন্ন অঞ্চলের সম্প্রদায়ের সঙ্গে বাস্তবসম্মত সমাধান ভাগ করে নেওয়ার ক্ষেত্রে জাপানের ভূমিকার কথা উল্লেখ করেন।
মাসাতো কান্দা সতর্ক করে বলেন, এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে পানি ও পরিবেশগত ঝুঁকি মানুষের প্রস্তুতির তুলনায় দ্রুত বাড়ছে। বিশ্বের ৪০ শতাংশেরও বেশি বন্যা এশিয়ায় ঘটে। এ অঞ্চলের প্রায় ২২ কোটি মানুষ এখনও মৌলিক পানি সরবরাহ থেকে বঞ্চিত। একই সঙ্গে প্রায় ৫২ কোটি মানুষ মৌলিক স্যানিটেশন সুবিধা থেকে বঞ্চিত।
তবে পানি নিরাপত্তায় অগ্রগতির কথাও তুলে ধরেন তিনি। এডিবির ডিসেম্বর ২০২৫ সালে প্রকাশিত পঞ্চম ‘এশিয়ান ওয়াটার ডেভেলপমেন্ট আউটলুক’ অনুযায়ী, ২০১৩ সাল থেকে এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের প্রায় ২৭০ কোটি মানুষ চরম পানি নিরাপত্তাহীনতা থেকে বেরিয়ে এসেছে। অর্থাৎ প্রতি পাঁচজনের মধ্যে প্রায় তিনজন এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে এসেছে।
তবে এ অর্জনকে এখনও ভঙ্গুর বলে উল্লেখ করেন এডিবি প্রেসিডেন্ট। তিনি বলেন, প্রায় ৪০০ কোটি মানুষ এখনও অনির্ভরযোগ্য পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থা, পানিসম্পর্কিত দুর্যোগ এবং ক্রমাবনতিশীল বাস্তুতন্ত্রের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় শক্তিশালী নীতি, উন্নত শাসনব্যবস্থা, অধিক দক্ষতা, স্বাস্থ্যকর বাস্তুতন্ত্র এবং বাড়তি অর্থায়নের প্রয়োজন রয়েছে বলে জানান তিনি।
এডিবি জানিয়েছে, ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত পানি খাতে ১২.৭ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে সংস্থাটি। এসব বিনিয়োগের মাধ্যমে প্রায় ৬ কোটি ৩০ লাখ মানুষ উপকৃত হবে।
বিনিয়োগের আওতায় ফিজিতে ম্যানগ্রোভ, প্রবাল প্রাচীর ও মৎস্যজীবী সম্প্রদায় রক্ষায় বর্জ্য পানি পরিশোধন ব্যবস্থা সম্প্রসারণ, ফিলিপাইনে লাখ লাখ মানুষের পানি পরিষেবা উন্নত করা এবং শ্রীলঙ্কায় পানির অপচয় কমাতে সংস্কারে সহায়তার মতো বিভিন্ন উদ্যোগ রয়েছে।
এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে টেকসই, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও স্থিতিশীল প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে কাজ করছে এডিবি। ১৯৬৬ সালে প্রতিষ্ঠিত সংস্থাটির সদস্য ৬৯টি দেশ, যার মধ্যে ৫০টি এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের।