ঢাকামঙ্গলবার , ৩ নভেম্বর ২০২৬
  1. সর্বশেষ
  2. লাইফস্টাইল

স্মৃতিশক্তি বাড়াতে গভীর ঘুমের বৈজ্ঞানিক রহস্য উন্মোচন

প্রতিবেদক
হাসান মাহমুদ
১৫ জুলাই ২০২৬, ১১:৩৫ সকাল

Link Copied!

ব্যস্ত এই আধুনিক জীবনে অনেকেই আমরা ঘুমের সময়টা কমিয়ে আনছি। কিন্তু রাতের পর রাত কম ঘুমানো যে আমাদের মগজের স্থায়ী স্মৃতিশক্তিকে কতটা ক্ষতিগ্রস্ত করছে, তা কি আমরা জানি? গত সোমবার (১৩ জুলাই, ২০২৬) বিশ্ববিখ্যাত বিজ্ঞান সাময়িকী ‘নেচার নিউরোসায়েন্স’ -এ প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে মানুষের ঘুম ও স্মৃতিশক্তির গভীর সংযোগ নিয়ে এক যুগান্তকারী মেকানিজম বা জৈবিক প্রক্রিয়া উন্মোচন করা হয়েছে। তোলপাড় সৃষ্টি করা এই গবেষণাটি মানুষের গভীর ঘুমের সময় ব্রেনের ভেতরে ঠিক কী ঘটে, তার একটি নিখুঁত চিত্র তুলে ধরেছে।

গবেষণার শিরনাম ও যারা জড়িয়ে ছিলেন:
এই গবেষণাটি মূলত ‘সিনক্রোনাইজড ব্রেইন ওয়েভস ডিউরিং ডিপ স্লিপ প্রিসিড লং-টার্ম মেমোরি কনসোলিডেশন’ (দীর্ঘমেয়াদী স্মৃতি সংরক্ষণের পূর্বে গভীর ঘুমে মস্তিষ্কের তরঙ্গের সমন্বিত রূপ) শিরোনামে পরিচালিত হয়। যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় (ইউসি বার্কলে) এবং যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়-এর স্নায়ুবিজ্ঞানীদের একটি যৌথ দল দীর্ঘ ৪ বছর ধরে এই গবেষণাটি পরিচালনা করেছেন। গবেষণার প্রধান তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন ইউসি বার্কলের স্লিপ অ্যান্ড নিউরোইমেজিং ল্যাবরেটরির প্রধান অধ্যাপক ড. ম্যাথিউ ওয়াকার এবং অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউরোফিজিওলজি বিভাগের সিনিয়র গবেষক ড. সারাহ জেনিংস।

গবেষণার ফলাফলের নিখুঁত সত্যতা যাচাইয়ে বিজ্ঞানীরা মোট ১০০ জন মানুষের ওপর পরীক্ষা চালান। এর মধ্যে ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সী ৬০ জন সুস্থ তরুণ-তুর্কী এবং ৬০ বছর ঊর্ধ্ব বয়সী ৪০ জন প্রবীণ ব্যক্তি শামিল ছিলেন। টানা ১৪ দিন ধরে ঘুমানোর ঠিক আগে তাদের কিছু জটিল তথ্য ও ছবি মনে রাখার ‘টাস্ক’ দেওয়া হতো। এরপর তারা যখন ঘুমাতেন, তখন হাই-রেজোলিউশন ইলেকট্রোএনসেফালোগ্রাম (ইইজি) এবং ফাংশনাল এমআরআই মেশিনের মাধ্যমে তাদের মস্তিষ্কের ভেতরের প্রতিটি তরঙ্গের স্পন্দন রিয়েল-টাইমে রেকর্ড করা হতো। মানব নমুনার পাশাপাশি গবেষণাগারে ইঁদুরের ওপরও সমান্তরালভাবে এই পরীক্ষা চালানো হয়।

মস্তিষ্কের সেই রহস্যময় মেকানিজম:

গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, মানুষের মস্তিষ্কের গভীরে থাকা ‘হিপোক্যাম্পাস’ সাময়িক স্মৃতি জমা রাখার ব্যাংক হিসেবে কাজ করে। আমরা সারাদিনে যা কিছু দেখি, শুনি বা শিখি—তার প্রাথমিক তথ্য এই হিপোক্যাম্পাসে এসে জমা হয়। কিন্তু হিপোক্যাম্পাসের ধারণক্ষমতা সীমিত। আর এই ধারণক্ষমতা খালি করার কাজটিই অলক্ষ্যে ঘটে আমরা যখন গভীর ঘুমে মগ্ন থাকি।

বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, গভীর ঘুমের সময় মস্তিষ্কের কর্টেক্স বা উপরিভাগের তরঙ্গের সাথে হিপোক্যাম্পাসের ভেতরের তরঙ্গের এক অভূতপূর্ব সিনক্রোনাইজেশন বা ছন্দময় সমন্বয় ঘটে। সহজ ভাষায়, ঘুমের একটি নির্দিষ্ট ধাপে ব্রেনের এই দুই অংশের মধ্যে এক ধরণের ‘ডেটা ট্রান্সফার’ বা ফাইল স্থানান্তর শুরু হয়। হিপোক্যাম্পাস তার সারাদিনের জমানো শর্ট-টার্ম স্মৃতিগুলোকে সিগন্যালের মাধ্যমে কর্টেক্সে পাঠিয়ে দেয়। মস্তিষ্কের এই কর্টেক্স অংশটি হলো মানুষের পার্মানেন্ট মেমোরি ড্রাইভ বা দীর্ঘমেয়াদী স্মৃতির ভাণ্ডার।

গবেষকেরা দেখতে পেয়েছেন, গভীর ঘুমের সময় মস্তিষ্কে এক ধরণের বিশেষ বৈদ্যুতিক তরঙ্গের স্পন্দন তৈরি হয়, যাকে বলা হয় ‘স্লিপ স্পিন্ডলস’ এবং ‘স্লো অসিলেশনস’। যখন এই দুই ধরণের তরঙ্গের নিখুঁত যুগলবন্দী ঘটে, ঠিক তখনই হিপোক্যাম্পাস থেকে স্মৃতিগুলো কর্টেক্সে স্থায়ীভাবে পুনর্লিখিত বা ‘কনসোলিডেট’ হতে শুরু করে। যদি কোনো কারণে মানুষের এই গভীর ঘুমের স্তরটি বাধাগ্রস্ত হয়, তবে এই তরঙ্গ দুটির ছন্দপতন ঘটে।

গবেষকদের বক্তব্য:

গবেষণার মূল ফলাফল নিয়ে অধ্যাপক ড. ম্যাথিউ ওয়াকার বলেন, ‘আমরা প্রথমবারের মতো প্রমাণ করতে পেরেছি যে, ঘুম কেবল ক্লান্ত মস্তিষ্কের বিশ্রাম নয়, বরং এটি একটি অত্যন্ত সক্রিয় ফাইল ট্রান্সফার প্রক্রিয়া। আপনি সারাদিন যা শিখছেন, তা যদি রাতে গভীর ঘুম না হয়, তবে ব্রেন তা স্থায়ী মেমোরিতে সেভ করার সুযোগই পায় না। ফলে পরদিন সকালে তা মস্তিষ্ক থেকে মুছে যায়।’

সহ-গবেষক ড. সারাহ জেনিংস এর চিকিৎসা শাস্ত্রীয় গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, ‘এই আবিষ্কারটি চিকিৎসা বিজ্ঞানের বেশ কিছু জটিল রহস্যের জট খুলতে সাহায্য করবে। বিশেষ করে বয়োবৃদ্ধ মানুষের ক্ষেত্রে স্মৃতিভ্রম বা আলঝেইমার্স রোগের চিকিৎসার ক্ষেত্রে এই নতুন মেকানিজম এক নতুন আশার আলো দেখাচ্ছে। আমরা যদি ওষুধের বা থেরাপির মাধ্যমে মস্তিষ্কের এই তরঙ্গের ছন্দ ঠিক রাখতে পারি, তবে আলঝেইমার্স রোগীদের স্মৃতিশক্তি দ্রুত লোপ পাওয়া ঠেকানো সম্ভব হবে।

শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের জন্য বার্তা:

ছাত্রছাত্রী এবং বুদ্ধিবৃত্তিক পেশার মানুষদের জন্য এই গবেষণার বার্তাটি অত্যন্ত জরুরি। অনেক শিক্ষার্থী পরীক্ষার আগের রাতে না ঘুমিয়ে পড়ার অভ্যাস করেন, যা বিজ্ঞানসম্মতভাবে সম্পূর্ণ ভুল। কারণ না ঘুমালে ব্রেন নতুন তথ্যগুলোকে স্থায়ী স্মৃতিতে রূপান্তর করার সুযোগই পায় না। ফলে পরীক্ষার হলে জানা জিনিসও মনে পড়ে না।

এই নতুন গবেষণাটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, ঘুম কোনো অলসতা বা সময়ের অপচয় নয়। শরীর সুস্থ রাখার পাশাপাশি নিজের মেধা, বুদ্ধি ও স্মৃতিশক্তিকে আজীবন তীক্ষ্ণ রাখতে হলে প্রতিদিন নিয়ম মেনে পর্যাপ্ত ও গভীর ঘুমের কোনো বিকল্প নেই। স্নায়ুবিজ্ঞানের এই নতুন আবিষ্কার আগামী দিনে মানুষের মানসিক স্বাস্থ্য ও মেমোরি থেরাপির ক্ষেত্রে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবে বলেই বিশ্বাস বিজ্ঞানীদের।

Facebook Comments Box

আরও পড়ুন

সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ গেল তরুণ ইনফ্লুয়েন্সার জেজুনের

হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসক-নার্স সংকট নিরসনে দ্রুত পদক্ষেপের আহ্বান রাষ্ট্রপতির

সময়মতো ন্যায্যমূল্যে কৃষকের কাছে সার পৌঁছানোর নির্দেশ কৃষিমন্ত্রীর

৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকায় পদ্মা ব্যারাজ, বদলে যাবে ১৯ জেলার চিত্র?

বাইন্যান্সের নিরাপত্তাব্যবস্থা ভেঙে ৬৩০ কোটি ডলার চুরি, নেপথ্যে কারা?

শুঁটকিতেও মিলল বিষাক্ত মাইক্রোপ্লাস্টিক: শীর্ষে লইট্টা ও চিংড়ি

যুদ্ধে বিপর্যস্ত কৃষ্ণসাগর: সাড়ে ৪ বছরে ১ লাখ ২০ হাজার ডলফিনের মৃত্যু

সড়ক দুর্ঘটনায় আহতদের জীবন বাঁচাতে তরুণদের প্রাথমিক চিকিৎসা ও সিপিআর প্রশিক্ষণ

হামের উপসর্গে ২৪ ঘণ্টায় দুই শিশুর মৃত্যু

কৃষকের কাছে সময়মতো ন্যায্যমূল্যে সার পৌঁছানোর তাগিদ কৃষিমন্ত্রীর

Tourism Fair Concludes with Tk 43 Crore in Business Over Three Days

তিন দিনে ৪৩ কোটি টাকার ব্যবসা, শেষ হলো পর্যটন মেলা