ঢাকাসোমবার , ২৯ জুন ২০২৬
  1. সর্বশেষ

বর্জ্যের পাশাপাশি শীতলক্ষ্যায় বাড়ছে সাকার ফিশের আগ্রাসন

প্রতিবেদক
Ibrahim Khalil
২৯ জুন ২০২৬, ১২:০১ বিকাল

Link Copied!

হাসান মাহমুদ: একসময়ের প্রাণবন্ত শীতলক্ষ্যা নদী এখন যেন তার স্বাভাবিক ছন্দ হারিয়ে ধুঁকছে। শিল্পকারখানার বিষাক্ত বর্জ্যে পানি দূষণের ক্ষত না শুকাতেই নতুন আতঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে বিদেশি ‘সাকার মাউথ ক্যাটফিশ’ বা সাকার ফিশ। নদীর বুকে এখন আর আগের মতো রূপালি ইলিশ বা সুস্বাদু রুই-কাতলার ঝাঁক দেখা যায় না। জেলেদের জালে এখন নিয়মিত ধরা পড়ছে কাঁটাওয়ালা, শক্ত চামড়ার এই রাক্ষুসে মাছ। এই আগ্রাসী প্রজাতির দাপটে শীতলক্ষ্যার জীববৈচিত্র্য আজ চরম হুমকির মুখে।

জেলেদের ভাষ্যমতে, সাকার ফিশ কেবল রাক্ষুসে মাছই নয়, এটি নদীর মৎস্যজীবীদের জীবন-জীবিকার ওপরও বড় আঘাত। উপজেলার ভাদার্ত্তী গ্রামের জেলে লিটন মিয়া আক্ষেপ করে বলেন, ‘আগে শীতলক্ষ্যা ছিল মৎস্যভাণ্ডার। কিন্তু গত কয়েক বছরে নদীর পানি বিষাক্ত বর্জ্যে কালো হয়ে গেছে। এর ওপর গত এক সপ্তাহ ধরে অন্য মাছের আশায় জাল ফেললেও প্রতিদিন অন্তত ৫ থেকে ২০ কেজি পর্যন্ত সাকার ফিশ জালে আটকে যাচ্ছে। এই মাছ কেউ খেতে চায় না, বাজারে এর কোনো চাহিদা নেই।

তিনি আরো বলেন, ‘এই মাছ জালে আটকালে জালের মারাত্মক ক্ষতি হয়। এর পিঠের শক্ত ও ধারালো কাঁটা জালের সুতোয় আটকে যায়, যা ছাড়াতে গিয়ে আমাদের হাত প্রায়ই রক্তাক্ত হয়। আবার এই মাছ ছাড়াতে গিয়ে অনেক সময় জাল ছিঁড়ে ফেলতে হয়, যা আমাদের জন্য বড় আর্থিক ক্ষতির কারণ।’

স্থানীয় বাসিন্দা সাইফুর রহমান ও আল আমিন সরকার সুমনের মতে, সাকার ফিশ নদীর তলদেশে থাকা ছোট মাছ ও তাদের ডিম খেয়ে ফেলে। এটি অত্যন্ত কষ্টসহিষ্ণু হওয়ায় দূষিত পানিতেও এই মাছ দ্রুত বংশবিস্তার করতে পারে।

সংশ্লিষ্টারা বলছেন, সাকার ফিশের শরীরে কোনো আঁশ নেই এবং এর মাংস শক্ত ও আঁশযুক্ত হাড়ের মতো আবরণে ঢাকা থাকায় এটি খাওয়ার উপযোগী নয়। এমনকি নদীতে মরে পড়ে থাকা এই মাছ পচে পানিকে আরও বেশি দুর্গন্ধময় করে তুলছে। স্থানীয় বাসিন্দা ও কৃষকদের অভিযোগ, সাকার ফিশের সংখ্যা বাড়ার সাথে সাথে শীতলক্ষ্যার পানি আগের চেয়ে বেশি ঘোলাটে ও অস্বাস্থ্যকর হয়ে পড়ছে, যা নদীর সামগ্রিক পরিবেশের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এদিকে জেলেদের জালে যখন বারবার উঠে আসছে এই অনাহূত অতিথি, তখন প্রশ্ন উঠছে—শীতলক্ষ্যার দেশি মাছ কি তবে বিলুপ্তির পথে? স্থানীয় জেলেরা নদী বাঁচাতে এবং দেশি মাছের অস্তিত্ব রক্ষায় সরকারের কাছে জোরালো দাবি জানিয়েছেন। তারা বলছেন, শুধু মৎস্যজীবীদের সচেতন করলেই হবে না; সরকারি উদ্যোগে সাকার ফিশ নিধনে বিশেষ প্রণোদনা ও ‘নিধন অভিযান’ পরিচালনা করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে নদী দূষণ রোধে কারখানাগুলোর বর্জ্য পরিশোধন নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায়, নদীমাতৃক এই অঞ্চলের অর্থনীতি ও পরিবেশ বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখোমুখি হবে।

উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা আবু সামা জানান, সাকার ফিশ নিয়ন্ত্রণে আমরা বিভিন্ন সময় সচেতনতামূলক কর্মসূচি নিয়েছি। তবে এই মাছ নির্মূলে একটি সমন্বিত মহাপরিকল্পনা প্রয়োজন। এটি মানবদেহের জন্য সরাসরি ক্ষতিকর না হলেও, নিয়মিত উপস্থিতিতে আমাদের জলজ জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।

এই সংকট নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএফআরআই) ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. মশিউর রহমান। তিনি বলেন, ‘সাকার ফিশ কেবল একটি মাছ নয়, এটি আমাদের দেশীয় জলজ বাস্তুসংস্থানের জন্য একটি ‘ইনভেসিভ স্পিসিস’ বা আগ্রাসী প্রজাতি। এর বিশেষ গঠনশৈলীর কারণে এটি প্রাকৃতিকভাবে কোনো মাছের খাদ্য নয়। ফলে এদের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে রাখার মতো কোনো প্রাকৃতিক শিকারি মাছ আমাদের নদীতে নেই। এই মাছটি নদীর তলদেশে থাকা পলি এবং জলজ উদ্ভিদের পাশাপাশি দেশি মাছের ডিম ও পোনা খেয়ে এদের প্রজনন চক্রকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দিচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, সাকার ফিশ মূলত নিচ থেকে মাছ শিকার করে এবং অত্যন্ত দ্রুত বংশবৃদ্ধি করতে সক্ষম। আমাদের নদীগুলোতে যখন পানির গুণগত মান বা অক্সিজেন মাত্রা কমে যায়, তখন দেশি মাছ যেখানে টিকে থাকতে হিমশিম খায়, সাকার ফিশ সেখানে সহজেই খাপ খাইয়ে নিতে পারে। এটি শুধু মাছের সংখ্যাই কমায় না, নদীর পানির গুণগত মানও পরিবর্তন করে দেয়। বর্তমান পরিস্থিতিতে এদের বিস্তার রোধ করতে নিয়মিত ‘সিলেক্টিভ ফিশিং’ বা নির্দিষ্ট নেট ব্যবহারের মাধ্যমে এই মাছ ধরে নদী থেকে অপসারণ করা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।

Facebook Comments Box

আরও পড়ুন

মিয়ানমার সীমান্তে ৪.১ মাত্রার ভূমিকম্প, কেঁপেছে চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকা

আজ দেশের সব মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শুরু হচ্ছে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি

১১ জেলায় দুপুরের মধ্যে ঝড়-বৃষ্টির আশঙ্কা

বাংলাদেশ সীমান্তঘেঁষা ভারতের তিন এলাকায় ভোরে পরপর তিনটি মৃদু ভূমিকম্প

ইউরোপে তীব্র তাপপ্রবাহে ফ্রান্সে প্রায় ১ হাজার মৃত্যু

ভিটামিন ‘এ’ ঘাটতি কমাতে ছোট প্যাকেটের ভোজ্যতেল বাজারজাতের আহ্বান

ভেনেজুয়েলায় ভূমিকম্পে মৃত বেড়ে ১,৪৩০

দেশে ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গে আরও ৪ শিশুর মৃত্যু

ভিটামিন ‘এ’ প্লাস ক্যাম্পেইনেও শতভাগ সফলতার আশা: ডিএনসিসি প্রশাসক

ঠাকুরগাঁওয়ে ১৩৪ শিশুকে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল প্রদান

চীনে অ্যারোনটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক ৭ বাংলাদেশি

চকরিয়ায় মাইক্রোবাসের সঙ্গে মোটরসাইকেলের সংঘর্ষে নিহত ২