
হাসান মাহমুদ: মানুষের শরীরের কোনো অঙ্গ নষ্ট হলে এখন আর অন্যের অঙ্গের জন্য মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে হবে না। চিকিৎসা বিজ্ঞানের এক অভাবনীয় সাফল্যে বিজ্ঞানীরা এখন ল্যাবরেটরিতে তৈরি করছেন মানুষের শরীরের অবিকল প্রতিলিপি, যা চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় ‘অর্গানয়েড’ নামে পরিচিত। তবে এটি কেবল গবেষণাগারের গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ নেই; বরং এই প্রযুক্তি এখন যুক্ত হয়েছে কৃত্রিম মাইক্রো-চিপের সাথে, যা চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভবিষ্যৎ চিরতরে বদলে দেওয়ার অপেক্ষায়।
বিজ্ঞান সাময়িকী ‘সেল’ এবং ‘নেচার’ -এ প্রকাশিত সাম্প্রতিক গবেষণা নিবন্ধগুলো থেকে জানা যায়, হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি এবং ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা এই প্রযুক্তিতে অভাবনীয় সাফল্য পেয়েছেন। ২০২৫ সালের শেষ দিকে এবং ২০২৬ সালের মে মাসে প্রকাশিত বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক জার্নালে প্রমাণিত হয়েছে, স্টেম সেল থেকে তৈরি এই ক্ষুদ্র অঙ্গগুলো হুবহু মানুষের অঙ্গের মতো জৈবিক কার্যকারিতা প্রদর্শন করছে। চলতি বছরের শুরুর দিকে ‘আমেরিকান অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য অ্যাডভান্সমেন্ট অব সায়েন্স (এএএএস)’-এর বার্ষিক সম্মেলনে বিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন, কীভাবে একটি মাত্র মাইক্রো-চিপের ওপর বসানো ‘মিনি-লিভার’ বা ‘মিনি-কিডনি’ ওষুধের বিষক্রিয়া পরীক্ষা করতে সক্ষম।
অর্গান-অন-চিপ প্রযুক্তি:
নতুন এই প্রযুক্তির নাম দেওয়া হয়েছে ‘অর্গান-অন-চিপ’। এটি এমন একটি ক্ষুদ্র ডিভাইসের ওপর বসানো টিস্যু স্ট্রাকচার, যা মানুষের রক্ত সঞ্চালন ব্যবস্থা এবং অঙ্গের অভ্যন্তরীণ পরিবেশকে হুবহু নকল করতে পারে। বিজ্ঞানীরা এখন কেবল টিস্যুই তৈরি করছেন না, বরং সেই টিস্যুকে একটি চিপের ওপর জীবন্ত রেখে তাতে বিভিন্ন ওষুধ প্রয়োগ করে দেখছেন। ফলে কোনো ওষুধ রোগীর শরীরে দেওয়ার আগে তা চিপে পরীক্ষা করেই শতভাগ নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে যে, এটি কতটা কার্যকর বা ক্ষতিকর।
ক্যান্সার ও জটিল রোগের ‘ম্যাজিক বুলেট’:
ক্যান্সার চিকিৎসায় এই প্রযুক্তি বর্তমানে ‘পার্সোনালাইজড মেডিসিন’ বা ব্যক্তিগত চিকিৎসার জন্য নতুন ভরসা হয়ে দাঁড়িয়েছে। একজন ক্যান্সার রোগীর টিউমার কোষ থেকে ল্যাবরেটরিতে তৈরি করা অর্গানয়েডের ওপর বিভিন্ন ধরনের কেমোথেরাপি পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে, কোন ওষুধটি ওই রোগীর টিউমার দমনে সবচেয়ে বেশি কার্যকর হবে। ফলে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ঝুঁকি প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে আসছে।
হার্ভার্ডের বায়ো-ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. আরিয়ান ব্লেয়ারের মতে, ‘এটি চিকিৎসার ভবিষ্যৎ। আমরা এখন রোগের উৎস নিয়ে কেবল অনুমান করছি না, আমরা রোগীর নিজস্ব অঙ্গের ক্ষুদ্র সংস্করণে ওষুধের কার্যকারিতা পরীক্ষা করে সুস্থ করার উপায় বের করছি।’
তবে এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বড় ধরনের নৈতিক বিতর্কও। বিজ্ঞানীরা যখন মানুষের মস্তিষ্কের ক্ষুদ্র সংস্করণ বা ‘মিনি-ব্রেইন’ তৈরি করছেন, তখন প্রশ্ন উঠছে—এই কৃত্রিম মস্তিষ্ক কি চেতনা বা অনুভূতি ধারণ করতে পারে? এই প্রশ্নটি এখন চিকিৎসা বিজ্ঞানের নীতি নির্ধারকদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট:
বাংলাদেশে বর্তমানে কিডনি বা লিভার সিরোসিস রোগীদের অঙ্গ প্রতিস্থাপন অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং দাতা পাওয়া দুষ্কর। অর্গানয়েড প্রযুক্তির মাধ্যমে ভবিষ্যতে কৃত্রিম অঙ্গ তৈরির পথ প্রশস্ত হলে শত শত প্রাণ বাঁচানো সম্ভব। তবে আমাদের দেশে স্টেম সেল গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় উন্নত ল্যাবরেটরি, বায়ো-প্রিন্টিং প্রযুক্তি এবং কঠোর আইনি কাঠামোর এখনো বড় অভাব রয়েছে।
বিশ্বব্যাপী চিকিৎসা বিজ্ঞান যখন অনুমানের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিখুঁত বা ‘প্রিসিশন মেডিসিন’-এর দিকে ঝুঁকছে, তখন আমাদের স্বাস্থ্য খাতকে কেবল ওষুধ আমদানিতে সীমাবদ্ধ না রেখে এই অত্যাধুনিক বায়ো-টেকনোলজিতে বিনিয়োগ করার এখনই সময়।