
দেশে সড়ক, নৌ ও রেলপথে দুর্ঘটনার ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে এপ্রিল মাসের প্রতিবেদনে। এই এক মাসে মোট ৫০৪টি দুর্ঘটনায় ৪৩৪ জন নিহত এবং ৭৩৭ জন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন।
বুধবার (৬ মে) গণমাধ্যমে পাঠানো এই প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশের ৯টি জাতীয় দৈনিক, ১৭টি অনলাইন নিউজ পোর্টাল, বিভিন্ন ইলেকট্রনিক মিডিয়া এবং নিজস্ব তথ্যের ভিত্তিতে এই পরিসংখ্যান তৈরি করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এপ্রিল মাসে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটেছে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায়। ১৪২টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১১৩ জন, যা মোট নিহতের প্রায় ২৮ শতাংশ। এছাড়া পথচারী নিহত হয়েছেন ১০২ জন এবং যানবাহনের চালক ও সহকারী নিহত হয়েছেন ৪৬ জন।
যানবাহনভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, থ্রি-হুইলার (ইজিবাইক, সিএনজি, অটোরিকশা, লেগুনা) দুর্ঘটনায় ৬১ জন, ট্রাক-কাভার্ডভ্যান-পিকআপসহ ভারী যানবাহনে ৫১ জন, বাসে ৩০ জন, প্রাইভেটকার ও মাইক্রোবাসে ২৪ জন, স্থানীয়ভাবে তৈরি যানবাহনে ১০ জন এবং রিকশা ও বাইসাইকেল আরোহী ১৩ জন নিহত হয়েছেন।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, দুর্ঘটনার ৪১.৬৮ শতাংশ ঘটেছে আঞ্চলিক সড়কে, ৩৬.২৮ শতাংশ জাতীয় মহাসড়কে, ১২.৩১ শতাংশ শহরের সড়কে এবং ৯.৭১ শতাংশ গ্রামীণ সড়কে।
দুর্ঘটনার ধরন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ৪১.৯০ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটেছে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে, ২২.৮৯ শতাংশ পথচারীকে চাপা বা ধাক্কা দিয়ে, ২০.৯৫ শতাংশ মুখোমুখি সংঘর্ষে, ১১.২৩ শতাংশ পেছন থেকে ধাক্কায় এবং ৩.০২ শতাংশ অন্যান্য কারণে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, দুর্ঘটনায় সম্পৃক্ত যানবাহনের সংখ্যা ছিল মোট ৬৫৯টি। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ছিল ট্রাক, কাভার্ডভ্যান, পিকআপ ও ট্রাক্টরসহ ভারী যানবাহন (২৫.৯৪ শতাংশ), এরপর মোটরসাইকেল (২৩.২১ শতাংশ) এবং থ্রি-হুইলার (১৭ শতাংশ)।
বিভাগভিত্তিক হিসাবে ঢাকা বিভাগে সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি ঘটেছে। শুধু ঢাকায় ১০৯টি দুর্ঘটনায় ১০২ জন নিহত হয়েছেন। এরপর চট্টগ্রাম, খুলনা ও রংপুর বিভাগে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক দুর্ঘটনা ঘটে। সবচেয়ে কম দুর্ঘটনা হয়েছে সিলেট বিভাগে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, বিভিন্ন পেশার মানুষও দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে রয়েছেন পুলিশ সদস্য, বিজিবি সদস্য, শিক্ষক, সাংবাদিক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, আইনজীবী, ব্যাংক-বীমা কর্মকর্তা, এনজিও কর্মী, রাজনৈতিক কর্মী, ব্যবসায়ী, শ্রমিক, শিক্ষার্থীসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ।
সংস্থাটির পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, সড়ক দুর্ঘটনার পেছনে রয়েছে একাধিক কারণ। এর মধ্যে প্রধান কারণগুলো হলো—ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন ও সড়ক, বেপরোয়া গতি, চালকের অদক্ষতা ও অসুস্থতা, ট্রাফিক আইন না মানা, দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, মহাসড়কে ধীরগতির যানবাহন চলাচল, এবং পরিবহন খাতে অনিয়ম ও চাঁদাবাজি।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশন মনে করে, সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে অবকাঠামো উন্নয়ন, কঠোর আইন প্রয়োগ, চালকদের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা জোরদার করা জরুরি। অন্যথায় এ ধরনের প্রাণহানি কমানো কঠিন হবে।