ঢাকাবুধবার , ৪ মার্চ ২০২৬
  • অন্যান্য

চাঁদ দেখা কেনো জরুরি?

নূরনবী সরকার
মার্চ ৪, ২০২৬ ১২:২৮ পূর্বাহ্ণ । ২৫ জন

ঈদুল ফিতরের চাঁদ দেখা নিয়ে ধর্মপ্রাণ মুসল্লিদের আগ্রহ থাকে। রোজা ২৯ না ৩০ এ নিয়েও রোজাদার তরুণদের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ আলোচনা চলে। হাদিস শরীফের নির্দেশ, চাঁদ দেখে আরবি মাস শুরু করতে হবে। আমাদের দেশে চাঁদ দেখার জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে কমিটি নির্ধারণ করা আছে। তারা প্রতি আরবি মাসের শেষে বৈঠকে বসে সিদ্ধান্ত নেন কবে থেকে আরবি মাস শুরু হবে। এটা মুসলিম বিশ্বে শরীয়তের বিধান। অন্যান্য মুসলিম দেশের মত আমাদের এখানেও ১৯ মার্চ জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটি বৈঠকে বসবে। সারা দেশের চাঁদ দেখার তথ্য নিয়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে জানাবে ঈদুল ফিতর কবে?

নতুন চাঁদের জন্ম কখন?
মুনফেস ডেটা বিশ্লেষণ করে জেমিনি এআই ও চ্যাটজিপিটি, গ্রোক বলছে ১৮ মার্চ বুধবার সকাল ৮ টা ৫৫ মিনিটে অমাবস্যা তিথি শুরু হবে (চাঁদ, পৃথিবী ও সূর্য সমান্তরালে থাকা) তিথি শেষ হবে ১৯ মার্চ বৃহস্পতিবার সকাল ৭ টা ২২ মিনিটে। এরপর ৭ টা ২৩ মিনিটে শাওয়ালের চাঁদ জন্ম নেবে। শুরু হবে চাঁদের বয়স গণনা।

চাঁদ দেখা যাবে কত তারিখে?
১৯ মার্চ বাংলাদেশে সূর্যাস্ত ৬ টা ৯ মিনিটে । কালবৈশাখী ঝড়ের মৌসুম, সারাদেশে একযোগে আকাশ মেঘাচ্ছন্ন ও বৃষ্টি হবে এ সময় ,তা বলা হচ্ছে না, তবে পশ্চিমাঞ্চল দিয়েই কালবৈশাখী ঝড় আসে। ধরে নিলাম আকাশ পরিষ্কার থাকবে, সন্ধ্যা ৬ টা ৯ মিনিটে চাঁদের বয়স হবে ১০ ঘন্টা ৪৬ মিনিট। চাঁদে স্থায়ীত্ব হবে ১২ মিনিট। মুনফেস ডেটা বিশ্লেষণ করে এআই টুলসগুলো আরও বলছে, চাঁদ খালি চোখে দেখতে ১৫-২০ ঘন্টা বয়স হতে হয়, চাঁদ আকাশে থাকবে মাত্র ১২ মিনিট, যা দেখার জন্য কম সময়। আর ঐদিন নতুন চাঁদের মাত্র ০.৩ ভাগ আলোকিত থাকবে। সুতরাং ১৯ মার্চ চাঁদ দেখা যাবে না। ২০ তারিখ দেখা যাবে। ২০ মার্চ রোজা পূর্ণ হবে ৩০ টা। ২১ মার্চ শনিবার ঈদুল ফিতর হবে বাংলাদেশে।

মধ্যপ্রাচ্যে, সৌদি আরবে কবে ঈদ?
সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কয়েকটি দেশের জ্যোর্তিবিদরা জানিয়েছে ১৯ মার্চ চাঁদ দেখা যাবে ২০ মার্চ আর মধ্যপ্রাচ্যে ঈদুল ফিতর ২০ মার্চ। বলা বাহুল্য মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো খালি চোখের বদলে তারা প্রযুক্তির সহায়তা নিয়ে চাঁদ দেখে। সুতরাং বাংলাদেশে যেটা খালি চোখে অসম্ভব তাদের ওখানে প্রযুক্তির কারণে সম্ভব হয়।

সূর্যঘড়ি ও চন্দ্রপঞ্জিকা
সূর্যের হিসাব মেনে চলে আমাদের হাতঘড়ি। আমরা এই সময়কেই অনুসরণ করি। এক মিনিটের ব্যবধানের কারণে চাঁদ দেখার হিসাবে ব্যাপক তারতম্য হয়। সেকারণে বাংলাদেশের সূর্যোদয়ের পর চাঁদ দেখা না গেলেই বয়সের তারতম্যের কারণে একই দিন সৌদি আরবে ও মধ্যপ্রাচ্যে চাঁদ দেখা যায়। এ ঘটনার সাক্ষী আমরা অনেকবার হয়েছি।

সৌদি আরবের পর দিন বাংলাদেশে ঈদ, এই বিতর্ক কেনো?
চাঁদ তার নিয়ম মেনে চলে আসমানে। জমিনে আমরা আমাদের মতামত দিয়ে সেটাকে নানাভাবে দেখি। আমাদের এখানে প্রযুক্তি, জ্যোর্তিবিদের জ্ঞান কমই নেয় জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটি। তারা বরাবর খালি চোখের ওপর নির্ভর করে। আমাদের আলেমরা সরলভাবে খালি চোখের ওপর নির্ভর করে। যেকারণে ঝড়বৃষ্টির সময় তারা সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। প্রতিবেশি ভারত, পাকিস্তানেও রয়েছে প্রযুক্তি নির্ভর ব্যবস্থাপনা, যদিও আমাদের চাঁদপুরপন্থীদের মত সৌদির সাথে মিল রেখে ঈদ করা লোকের সংখ্যা ভারত পাকিস্তানসহ গোটা দুনিয়াতে আছে। সেই প্রযুক্তির কারণে অনেক সময় আমাদের দেশে মধ্যরাতে সরকার তাদের চাঁদ দেখা কমিটি বদল করে ঈদের ঘোষণা দেয়, এটা আমরা একাধিকবার হতে দেখেছি। এখানে বিজ্ঞানের তথ্য ব্যবহার করলেই আমরা এই ঝামেলা এড়াতে পারি।

গোটা দুনিয়াতে একদিনে ঈদ উদযাপন করা সম্ভব হয় না কেনো?
অর্গানাইজেশন অফ ইসলামিক কোঅপারেশন বা ওআইসিসহ আরেক দল ইসলাম ধর্মের মানুষ আছে তারা চায় গোটা দুনিয়াতে একদিনে ঈদ করা হোক, সেটাই শরিয়ত-( কোরআন, হাদিস, ইজমা, কিয়াস) সম্মত। তারা বলে গোটা দুনিয়া একটাই এখানে কেন একেক দিনে ঈদ করতে হবে। এখন প্রযুক্তি উন্নত, কেউ যদি ল্যাটিন আমেরিকা থেক চাঁদ দেখার খবর দেয় তাহলে গোটা দুনিয়া সেই তথ্য নেবে। এরপর সূর্য ওঠার পর ঈদ পালন করবে। তাহলে চাঁদ দেখা নিয়ে ঝামেলা কেটে যায়।

কেনো আমরা ভিন্ন ভিন্ন দিনে ঈদ করি?
হাদিসের বিধান হলো চাঁদ দেখে আরবি মাস শুরু করা। যদি মাসের ২৯ তারিখে চাঁদ দেখা না যায় তাহলে ৩০ দিন পূর্ণ করে আরবি নতুন মাস শুরু করতে হবে। আরবি মাস চাঁদের সাথে বাংলা মাস সূর্যোদয়ের সাথে আর ইংরেজি মাস ঘড়ির সাথে সম্পর্কিত। যেহেতু আমরা ভূখন্ড ও স্বাধীন দেশ বানিয়েছি। তাই আমরা হাদিসের বিধান মানি খালি চোখে নিজেরা চাঁদ দেখে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি, যেকারণে ভিন্ন ভিন্ন দিনে আরবি মাস শুরু হয়। গোটা দুনিয়াতে যেহেতু রাত ও দিনের পার্থক্য আছে, সেই পার্থক্য ধরে আরবি মাস পালন ১ দিন কমবেশি হয়ে থাকে। এটা মতামতগত, বিজ্ঞানগত, বাস্তবতাগত ভিন্নতার জন্যই হয়ে আসছে।

মেরু অঞ্চলে চাঁদ সূর্যের অবস্থান
উত্তর ও দক্ষিণ মেরুতে সূর্য তার অবস্থানের কারণে ৬ মাস অস্ত যায় না, ৬ মাস ডোবে না। ১৪ দিন দৃশ্যমান: চাঁদ যখন তার কক্ষপথে উত্তর দিকে হেলে থাকে, তখন উত্তর মেরুতে এটি টানা প্রায় ১৪ দিন দিগন্তের উপরে থাকে (অস্ত যায় না)। এই সময় দক্ষিণ মেরুতে চাঁদ দেখা যায় না। ১৪ দিন অদৃশ্য: পরের ১৪ দিন চাঁদ যখন দক্ষিণ দিকে হেলে যায়, তখন উত্তর মেরুতে এটি দিগন্তের নিচে চলে যায় এবং মোটেও দেখা যায় না। এই মেরু অঞ্চলে চন্দ্র সূর্যের স্বাভাবিক হিসাব মেনে রোজা নামায় চলে না। এখানে অবস্থান করা মুসল্লিরা নিজ নিজ দেশের নিয়ম মেনে প্রার্থনা ও উৎসব করে। লন্ডনের ইসলামিক সোসাইটি এটা নিয়ে আবেদনের প্রেক্ষিতে ইজমা( ইসলামি আইনবিদদের সম্মিলিত সিদ্ধান্ত) করে জানায় যে, নিকটতম স্বাভাবিক শহরে টাইমজোন ব্যবহার করে মুসল্লিরা যেন ইবাদাত করে, এটাই শরিয়তের বিধান। যদি নিজ নিজ দেশের হিসাবে প্রার্থনা করে তাহলে সেটা সঠিক হবে না। তারপরও সেখানকার মুসল্লিরা নিজেদের মত করে ইবাদাত করছে।

লেখক : প্লানিং এডিটর, একাত্তর টিভি