ধরুন, আপনার পকেটে থাকা একটি নোট দিয়ে আপনি এক কাপ কফি নয়, বরং তিন ডলারের বেশি দামের জিনিস কিনতে পারবেন। অথচ সেই নোটটি ডলার নয়। এমন অবাক করা বাস্তবতা আছে বিশ্বের কিছু মুদ্রার ক্ষেত্রে। আমরা প্রায়ই মনে করি মার্কিন ডলারই সবচেয়ে শক্তিশালী মুদ্রা, কিন্তু আন্তর্জাতিক বিনিময় হার বলছে ভিন্ন কথা। ২০২৬ সালে এমন বেশ কয়েকটি মুদ্রা রয়েছে, যাদের এক ইউনিটের মূল্য ডলারের চেয়েও বেশি-আর সেই তালিকার শীর্ষে রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের একটি ছোট কিন্তু অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী দেশ।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের আন্তর্জাতিক বিনিময় হার বিশ্লেষণ করে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী মুদ্রাগুলোর এই তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। একটি দেশের মুদ্রার একক দিয়ে কত মার্কিন ডলার কেনা যায়-এই মানদণ্ডে ওপেন এক্সচেঞ্জের মুদ্রা রূপান্তরকারীর তথ্য ব্যবহার করে শীর্ষ ১০টি মুদ্রা নির্ধারণ করা হয়।
কুয়েতি দিনার (KWD)
বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী মুদ্রা হিসেবে শীর্ষে রয়েছে কুয়েতি দিনার। বর্তমানে ১ কুয়েতি দিনারের মূল্য প্রায় ৩.২৫ মার্কিন ডলার। মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম বড় তেল রপ্তানিকারক দেশ কুয়েতের শক্তিশালী অর্থনীতি, বিপুল বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং দীর্ঘদিনের আর্থিক স্থিতিশীলতা এই মুদ্রার শক্তির মূল ভিত্তি।
বাহরাইনি দিনার (BHD)
দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা বাহরাইনি দিনার প্রতি এককে প্রায় ২.৬৫ ডলার সমমূল্যের। বাহরাইন সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তেলনির্ভরতা কমিয়ে অর্থনীতিকে বহুমুখীকরণে গুরুত্ব দিয়েছে। ২০২৪ সালে দেশটির জিডিপিতে তেল-বহির্ভূত খাতের অবদান ছিল প্রায় ৮৬ শতাংশ। বাহরাইনি দিনার দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন ডলারের সঙ্গে নির্দিষ্ট হারে সংযুক্ত।
ওমানি রিয়াল (OMR)
তৃতীয় স্থানে রয়েছে ওমানি রিয়াল, যার মূল্য প্রায় ২.৬০ ডলার। তেল ও গ্যাস রপ্তানিভিত্তিক শক্তিশালী অর্থনীতি এবং নিয়ন্ত্রিত মুদ্রানীতির কারণে এই মুদ্রা আন্তর্জাতিক বাজারে উচ্চমূল্য ধরে রেখেছে।
জর্ডানিয়ান দিনার (JOD)
চতুর্থ স্থানে থাকা জর্ডানিয়ান দিনার প্রতি এককে প্রায় ১.৪১ ডলার। তেলনির্ভর না হলেও দীর্ঘদিন ধরে স্থিতিশীল মুদ্রানীতির কারণে জর্ডানের মুদ্রা শক্ত অবস্থান ধরে রেখেছে। তবে ধীর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও সরকারি ঋণ দেশটির বড় চ্যালেঞ্জ।
ব্রিটিশ পাউন্ড স্টার্লিং (GBP)
বিশ্বের প্রাচীনতম ও প্রভাবশালী মুদ্রাগুলোর একটি ব্রিটিশ পাউন্ড স্টার্লিং রয়েছে পঞ্চম স্থানে। বর্তমানে এক পাউন্ডের মূল্য প্রায় ১.৩৭ ডলার। শতাব্দীপ্রাচীন ইতিহাস থাকা সত্ত্বেও পাউন্ড এখনও বৈশ্বিক বাণিজ্য ও আর্থিক ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
জিব্রাল্টার পাউন্ড (GIP)
ষষ্ঠ স্থানে রয়েছে জিব্রাল্টার পাউন্ড, যা ব্রিটিশ পাউন্ডের সঙ্গে নির্দিষ্ট হারে সংযুক্ত। ফলে এর মূল্যও প্রায় পাউন্ড স্টার্লিংয়ের সমান। এটি যুক্তরাজ্যের বিদেশি অঞ্চল জিব্রাল্টারে ব্যবহৃত হয়।
সুইস ফ্রাঙ্ক (CHF)
সপ্তম স্থানে থাকা সুইস ফ্রাঙ্ক প্রতি এককে প্রায় ১.২৮ ডলার। সুইজারল্যান্ডের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, শক্তিশালী ব্যাংকিং ব্যবস্থা এবং নির্ভরযোগ্য অর্থনৈতিক কাঠামোর কারণে এই মুদ্রাকে বিশ্বজুড়ে ‘নিরাপদ আশ্রয়স্থল’ হিসেবে দেখা হয়।
কেম্যান দ্বীপপুঞ্জ ডলার (KYD)
অষ্টম স্থানে রয়েছে কেম্যান দ্বীপপুঞ্জ ডলার, যার মূল্য প্রায় ১.১৯ ডলার। মার্কিন ডলারের সঙ্গে সংযুক্ত এই মুদ্রা আন্তর্জাতিক অফশোর আর্থিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত কেম্যান দ্বীপপুঞ্জে ব্যবহৃত হয়।
ইউরো (EUR)
নবম স্থানে থাকা ইউরো প্রতি এককে প্রায় ১.১৮ ডলার। ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২০টি দেশের সরকারি মুদ্রা হিসেবে ইউরো বিশ্ব অর্থনীতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং এটি অন্যতম প্রধান রিজার্ভ মুদ্রা।
মার্কিন ডলার (USD)
শীর্ষ ১০-এর শেষ স্থানে রয়েছে মার্কিন ডলার। এক ডলারের মূল্য স্বাভাবিকভাবেই ১ ডলার হলেও এটি বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ও লেনদেনকৃত মুদ্রা। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, তেল বাজার এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে ডলারের আধিপত্য এখনও অটুট।
অর্থনীতিবিদদের মতে, একটি মুদ্রার শক্তি শুধু বিনিময় হারের ওপর নির্ভর করে না। এর সঙ্গে জড়িত থাকে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, মুদ্রানীতি, প্রাকৃতিক সম্পদ, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং বৈশ্বিক আস্থা। এসব সূচকের পরিবর্তনের সঙ্গে ভবিষ্যতে বিশ্বের শক্তিশালী মুদ্রার এই তালিকাতেও পরিবর্তন আসতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।


