
বাংলাদেশে টিকা কার্যক্রমের সাফল্য তুলে ধরা এবং বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় করণীয় নির্ধারণে রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবে অনুষ্ঠিত হয়েছে এক প্রেস কনফারেন্স। বৃহস্পতিবার (৯ অক্টোবর) বিকাল ৩টায় স্বাস্থ্য সুরক্ষা ফাউন্ডেশনের আয়োজনে ইউনিসেফ বাংলাদেশ ও স্বাস্থ্য সুরক্ষা ফাউন্ডেশনের যৌথ অ্যাডভোকেসি প্রোজেক্টের আওতায় “বাংলাদেশে টিকা কার্যক্রমের সাফল্য, বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ এবং করণীয়” শীর্ষক এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন স্বাস্থ্য সুরক্ষা ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক ডা. নিজাম উদ্দিন আহমেদ ও ইউনিসেফ বাংলাদেশের হেলথ ম্যানেজার ডা. রিয়াদ মাহমুদ। এছাড়া উপস্থিত ছিলেন ইপিআই-এর উপপরিচালক ডা. মোহাম্মদ শাহরিয়ার সাজ্জাদ এবং সহকারী পরিচালক ডা. হাসানুল মাহমুদ।
ডা. নিজাম উদ্দিন আহমেদ বলেন, বাংলাদেশে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (EPI) জনস্বাস্থ্যের একটি বৈশ্বিক সাফল্য হিসেবে স্বীকৃত। এই কর্মসূচির মাধ্যমে ৫ বছরের নিচে শিশু মৃত্যুহার ৮১.৫ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে-যা মাত্র ছয়টি দেশ অর্জন করেছে। গত দুই দশকে ৫ কোটির বেশি শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে, যা প্রতিবছর প্রায় ৯৪ হাজার শিশুর মৃত্যু প্রতিরোধ করছে। টিকায় বিনিয়োগকৃত প্রতি ১ ডলারে ২৫.৪ ডলার রিটার্ন আসছে-যা স্বাস্থ্য ও উন্নয়নে টিকাদানের গুরুত্বকে স্পষ্ট করে।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ ইতোমধ্যে পোলিও ও মাতৃ ও নবজাতক ধনুষ্টঙ্কার নির্মূল এবং হেপাটাইটিস নিয়ন্ত্রণে সফল হয়েছে। কিশোরী মেয়েদের মধ্যে HPV টিকার কভারেজ ৯৩ শতাংশে পৌঁছেছে, যা সার্ভিকাল ক্যান্সার প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। ইউনিসেফের সহায়তায় ইপিআই-তে ডিজিটাল উদ্ভাবন যেমন VaxEPI, ই-ট্র্যাকার, জিআইএসভিত্তিক অনলাইন মাইক্রোপ্ল্যানিং এবং ই-ভিএলএমআইএস চালু করা হয়েছে। এছাড়া ৬১টি জেলায় ও সদর দপ্তরে ১২০টি ওয়াক-ইন কুলার রুম স্থাপন করা হয়েছে।
টাইফয়েড জ্বর প্রতিরোধে সরকার বিনামূল্যে “টাইফয়েড টিকাদান ক্যাম্পেইন-২০২৫” চালু করেছে। ৯ মাস থেকে ১৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের টিসিভি (Typhoid Conjugate Vaccine) টিকা দেওয়া হবে ১২ অক্টোবর থেকে ১৩ নভেম্বর পর্যন্ত। এই ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে প্রায় ৫ কোটি শিশু টাইফয়েড প্রতিরোধে টিকার আওতায় আসবে।
তবে সাফল্যের পাশাপাশি কিছু চ্যালেঞ্জও রয়ে গেছে। ইপিআই-তে মোট জনবলের ৪০ শতাংশ পদ শূন্য, জেলা পর্যায়ে কোল্ড চেইন টেকনিশিয়ানের শূন্যতা ৫৩ শতাংশ। বাজেট বরাদ্দে বিলম্ব ও ৫ম HPNSP অনুমোদন না হওয়ায় টিকা সরবরাহে ঘাটতি দেখা দিচ্ছে। দুর্গম এলাকায় টিকাদান কেন্দ্র ও কর্মীর অভাব, নগর এলাকায় কার্যকর টিকাদান কৌশলের ঘাটতি এবং জনসংখ্যা নির্ভুলভাবে নির্ধারণ না হওয়ায় লক্ষ্যভিত্তিক টিকাদান ব্যাহত হচ্ছে।
এই প্রেক্ষাপটে বক্তারা টিকাদান কর্মসূচি আরও শক্তিশালী করতে দ্রুত শূন্যপদে নিয়োগ সম্পন্ন, নগর এলাকায় নিজস্ব টিকাদান কর্মী নিয়োগ, বাজেট বরাদ্দ দ্রুত নিশ্চিতকরণ, কোল্ড চেইন রক্ষণাবেক্ষণ, জনসচেতনতা বৃদ্ধি ও ডিজিটাল সিস্টেম সম্প্রসারণের ওপর জোর দেন।
ডা. রিয়াদ মাহমুদ বলেন, “EPI Digital Innovations যেমন eVLMIS, E-Tracker ও VaxEPI-এর স্কেল-আপ এবং Gavi Transition 2030-এর প্রেক্ষাপটে টিকাদান অর্থায়ন নিশ্চিত করতে হবে।”
ডা. হাসানুল মাহমুদ আসন্ন টাইফয়েড টিকাদান ক্যাম্পেইন সফল করতে গণমাধ্যমের সহযোগিতা কামনা করেন। ডা. মোহাম্মদ শাহরিয়ার সাজ্জাদ বলেন, “এই ক্যাম্পেইন সফল করতে সরকার, অংশীদার সংস্থা ও জনগণের সম্মিলিত উদ্যোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।”
অনুষ্ঠানের সঞ্চালনা ও স্বাগত বক্তব্য দেন প্রকল্পের পলিসি অ্যাডভাইজার অধ্যাপক ডা. মো. রফিকুল ইসলাম।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শক্তিশালী জনবল, টেকসই অর্থায়ন, ডিজিটাল ব্যবস্থার সম্প্রসারণ ও সমন্বিত পদক্ষেপের মাধ্যমে বাংলাদেশের টিকাদান কর্মসূচি আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবে। এতে শিশুস্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত হবে এবং জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থায় নতুন মাইলফলক স্থাপন করবে।