ঢাকাবুধবার , ২৪ জুন ২০২৬
  1. সর্বশেষ
  2. লাইফস্টাইল

বিশ্বের বনাঞ্চলের চিত্র ও বাংলাদেশের অবস্থান

প্রতিবেদক
Ibrahim Khalil
২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ১২:১৮ বিকাল

Link Copied!

বনভূমি পৃথিবীর পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় অনন্য ভূমিকা পালন করে। এটি শুধু বন্যপ্রাণীর আবাসস্থলই নয়, বরং অক্সিজেন সরবরাহ, মাটির উর্বরতা রক্ষা, জলবায়ু নিয়ন্ত্রণ এবং মানুষের জীবনধারণের জন্য অপরিহার্য। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে পৃথিবীর মোট ভূমির প্রায় ৩১.২ শতাংশ বনভূমি দিয়ে আচ্ছাদিত। তবে দেশভেদে এই হার ব্যাপক ভিন্নতা লক্ষ্য করা যায়। কোথাও ভূমির প্রায় পুরোটাই বনভূমি, আবার কোথাও কার্যত কোনো বনভূমি নেই।

দক্ষিণ আমেরিকার ছোট্ট দেশ সুরিনাম এই তালিকায় শীর্ষে রয়েছে, যার প্রায় ৯৭.৪ শতাংশ ভূমি বনভূমি দিয়ে আচ্ছাদিত। এর কাছাকাছি অবস্থানে রয়েছে গায়ানা ৯৩.৬ শতাংশ এবং আফ্রিকার গ্যাবন ৯১.৩ শতাংশ নিয়ে। এই দেশগুলোর বিস্তীর্ণ অরণ্য স্থানীয় জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ছাড়াও বৈশ্বিক জলবায়ু স্থিতিশীলতায় বিশেষ ভূমিকা রাখছে। ইউরোপের ফিনল্যান্ড (৭৩.৭ শতাংশ) ও সুইডেন (৬৮.৭ শতাংশ) দীর্ঘদিন ধরে বনসম্পদ ব্যবস্থাপনায় বিশ্বে অগ্রগামী হিসেবে পরিচিত। তারা টেকসই কাঠ শিল্প ও কাগজ শিল্পের পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনেও বনকে কার্যকরভাবে ব্যবহার করছে।

এশিয়ার দেশগুলির মধ্যে জাপান (৬৮.৪ শতাংশ) ও দক্ষিণ কোরিয়া (৬৪.৪ শতাংশ) বন সংরক্ষণে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। যদিও এরা শিল্পোন্নত দেশ, তারপরও প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষায় কার্যকর নীতিমালা গ্রহণ করেছে। একইভাবে দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপের স্লোভেনিয়া ও মন্টেনেগ্রোর ৬১.৫ শতাংশ ভূমি বনভূমিতে আচ্ছাদিত। ব্রাজিলও বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ বনভূমি সমৃদ্ধ দেশ, যেখানে মোট ভূমির ৫৯.৪ শতাংশ বনভূমি। তবে আমাজন রেইনফরেস্ট ধ্বংস হওয়ায় সেখানে ভবিষ্যৎ নিয়ে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

লাতিন আমেরিকার কলম্বিয়া (৫৩.৩ শতাংশ) ও ভেনেজুয়েলা (৫২.৪ শতাংশ) বনভূমি সমৃদ্ধ দেশগুলির মধ্যে অন্যতম। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ইন্দোনেশিয়া (৪৯.১ শতাংশ) ও ভিয়েতনাম (৪৬.৭ শতাংশ) শিল্পায়ন ও কৃষিজমি সম্প্রসারণের কারণে বন হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছে। থাইল্যান্ডের বনভূমি ৩৮.৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। উত্তর আমেরিকার কানাডা (৩৮.৭ শতাংশ) ও নিউজিল্যান্ড (৩৭.৬ শতাংশ) পরিবেশ সংরক্ষণে ইতিবাচক পদক্ষেপ নিলেও শিল্পায়নের চাপে প্রাকৃতিক ভারসাম্য হুমকির মুখে। ইউরোপের স্পেন (৩৭.২ শতাংশ), ক্রোয়েশিয়া (৩৪.৭ শতাংশ), জার্মানি (৩২.৭ শতাংশ), ইতালি (৩২.৩ শতাংশ), সুইজারল্যান্ড (৩২.১ শতাংশ) ও ফ্রান্স (৩১.৫ শতাংশ) মধ্যম মানের বনভূমি ধরে রেখেছে। যুক্তরাষ্ট্রে বনভূমির হার ৩৩.৯ শতাংশ, মেক্সিকোতে ৩৩.৮ শতাংশ এবং নরওয়েতে ৩৩.৪ শতাংশ।

তবে কিছু দেশে বনভূমির হার আশঙ্কাজনকভাবে কম। ভারত তার মোট ভূমির মাত্র ২৪.৩ শতাংশ বনভূমি ধরে রাখতে পেরেছে, পাকিস্তানে এই হার মাত্র ৪.৮ শতাংশ। চীনে বনভূমি ২৩.৪ শতাংশ হলেও দেশটি কৃত্রিম বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে এ হার বাড়ানোর চেষ্টা করছে। অস্ট্রেলিয়ায় বনভূমি রয়েছে ১৭.৪ শতাংশ, তবে সেখানে দাবানল প্রায়শই বড় হুমকি তৈরি করে। আফ্রিকার দক্ষিণাঞ্চলের দেশ দক্ষিণ আফ্রিকায় বনভূমির হার ১৪.১ শতাংশ। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যে সৌদি আরব (০.৫ শতাংশ), সংযুক্ত আরব আমিরাত (৪.৫ শতাংশ) ও ইসরায়েল (৬.৫ শতাংশ) কার্যত প্রায় বনশূন্য। আর মিশরে বনভূমির হার শূন্যের কোঠায়।

এই বৈশ্বিক চিত্রে বাংলাদেশের অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ। বন বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশের মোট ভূমির প্রায় ১৪.১ শতাংশ বনাঞ্চল দ্বারা আচ্ছাদিত, যদিও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা এ হারকে আরও কম ধরে। সুন্দরবন, যা বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন, বাংলাদেশের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলে বিস্তৃত এই বন শুধু বাঘ, হরিণ ও নানা প্রজাতির প্রাণীর আশ্রয়স্থল নয়, বরং উপকূলীয় এলাকাকে ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস থেকে রক্ষা করে। এর পাশাপাশি চট্টগ্রাম ও সিলেট অঞ্চলের পাহাড়ি বনও বাংলাদেশের জীববৈচিত্র্যের প্রধান ভাণ্ডার।

তবে দুঃখজনকভাবে, বাংলাদেশে জনসংখ্যার চাপ, অবৈধ দখল, কাঠ সংগ্রহ, কৃষিজমি সম্প্রসারণ এবং শিল্পায়নের কারণে বনভূমি দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে। এর ফলে দেশের জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়েছে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতও বাড়ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সরকার সামাজিক বনায়ন ও বন সংরক্ষণে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চলে ম্যানগ্রোভ বন সম্প্রসারণ এবং বৃক্ষরোপণ কার্যক্রম উল্লেখযোগ্য।

মোটের ওপর, বৈশ্বিক পরিসংখ্যান আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে বনভূমি সংরক্ষণ মানবজাতির টিকে থাকার জন্য অপরিহার্য। পৃথিবীর কোথাও যদি বনভূমি ধ্বংস হয়, তার প্রভাব গোটা বিশ্বেই অনুভূত হয়। তাই বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ ও জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশে বন রক্ষা কেবল পরিবেশ নয়, অর্থনৈতিক ও সামাজিক নিরাপত্তার সাথেও জড়িত। বিশ্বব্যাপী যেমন বন সংরক্ষণের প্রয়োজন, তেমনি বাংলাদেশেও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা ও সচেতন উদ্যোগ ছাড়া টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়।

Facebook Comments Box

আরও পড়ুন

এসবিএসি ব্যাংকের গ্রাহক ও কর্মীদের স্বাস্থ্যসেবা সুবিধা দিতে চিকিৎসা ইন্টারন্যাশনালের সঙ্গে চুক্তি

DMP will toughen traffic laws and speed limits guideline enforcement

ট্রাফিক আইন বাস্তবায়নে জোর, ডিএমপি কর্মকর্তাদের বিশেষ প্রশিক্ষণ

যমুনার পানি বাড়ছে, সিরাজগঞ্জে তীব্র নদীভাঙনে আতঙ্ক

ল্যাবে তৈরি কৃত্রিম অঙ্গের অভাবনীয় সাফল্য

বাংলাদেশ জাতীয় চিড়িয়াখানায় যুক্ত হলো নতুন আফ্রিকান বন্যপ্রাণী

আগামী ৪ দিন যেমন থাকতে পারে দেশের আবহাওয়া

কর্মসৃজন ও দক্ষতা উন্নয়নে পিকেএসএফের অর্থায়ন ৪৫ শতাংশ বৃদ্ধি

শ্রীলঙ্কায় ভয়াবহ ডেঙ্গু পরিস্থিতি, নিয়ন্ত্রণে সেনা মোতায়েন

বিজয়নগরে সিমেন্টবোঝাই ট্রাক খাদে, শ্রমিক নিহত

জলবায়ু প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে বিশ্বনেতাদের প্রতি তারেক রহমানের আহ্বান

কবিরহাটে ট্রাক-মোটরসাইকেল সংঘর্ষে নিহত ২