ঢাকাশনিবার , ২৭ জুন ২০২৬
  1. সর্বশেষ
  2. লাইফস্টাইল

জাতিসংঘের পূর্বাভাসে বদলে যাচ্ছে বিশ্বের শক্তির ভারসাম্য

প্রতিবেদক
Ibrahim Khalil
২৩ অগাস্ট ২০২৫, ১:৪৫ বিকাল

Link Copied!

বিশ্বের ইতিহাস সবসময়ই মানুষের সংখ্যা, তাদের বিস্তার, এবং জনসংখ্যার ঘনত্বের সঙ্গে জড়িয়ে থেকেছে। কৃষি বিপ্লব থেকে শুরু করে শিল্প বিপ্লব কিংবা আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর সভ্যতা—সবকিছুতেই জনসংখ্যা ছিল এক নির্ধারক উপাদান। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে যখন জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা ২১০০ সালের জন্য জনসংখ্যার পূর্বাভাস প্রকাশ করেন, তখন সেটি কেবল সংখ্যা নয়, বরং আগামী শতাব্দীর বিশ্বরাজনীতি, অর্থনীতি এবং সামাজিক পরিবর্তনের দিকনির্দেশক হিসেবে ধরা হয়। ২০২৪ সালের বর্তমান চিত্রের সঙ্গে ২১০০ সালের সম্ভাব্য অবস্থার তুলনা করলে বোঝা যায়, পৃথিবীর মানচিত্রে কেমন এক মৌলিক পরিবর্তন অপেক্ষা করছে।

২০২৪ সালে ভারত পৃথিবীর সবচেয়ে জনবহুল দেশ হিসেবে এগিয়ে গেছে, যেখানে জনসংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ১,৪৫১ মিলিয়নে। এর ঠিক পরেই রয়েছে চীন, যার জনসংখ্যা ১,৪১৯ মিলিয়ন। ইউরোপীয় ইউনিয়নের (EU-27) দেশগুলো মিলিয়ে জনসংখ্যা ৪৫১ মিলিয়ন হলেও একক রাষ্ট্রের হিসেবে আমেরিকা তৃতীয় স্থানে আছে ৩৪৫ মিলিয়ন মানুষ নিয়ে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ইন্দোনেশিয়া, দক্ষিণ এশিয়ার পাকিস্তান ও বাংলাদেশ, আর আফ্রিকার নাইজেরিয়া ও ইথিওপিয়া এই তালিকায় নিজেদের জায়গা করে নিয়েছে। লাতিন আমেরিকার ব্রাজিল ও উত্তর ইউরেশিয়ার রাশিয়াও এখনও শীর্ষ দশের মধ্যে আছে।

কিন্তু মাত্র ৭৫ বছর পর, অর্থাৎ ২১০০ সালের চিত্র হবে সম্পূর্ণ ভিন্ন। ভারত তখনও থাকবে প্রথম স্থানে, তবে তার জনসংখ্যা সামান্য বাড়বে ১,৫০৫ মিলিয়নে। চীন নামবে দ্বিতীয় থেকে অনেক নিচে, মাত্র ৬৩৩ মিলিয়ন মানুষের দেশ হয়ে। জনসংখ্যা হ্রাসের এই ধারা চীনের অর্থনীতি ও বৈশ্বিক অবস্থানে বড় পরিবর্তন আনবে বলেই বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। পাকিস্তান অবিশ্বাস্য গতিতে এগিয়ে গিয়ে হবে বিশ্বের তৃতীয় জনবহুল দেশ, জনসংখ্যা অর্ধ ট্রিলিয়নেরও বেশি, ৫১১ মিলিয়ন। নাইজেরিয়া ৪৭৮ মিলিয়ন মানুষ নিয়ে আফ্রিকার সর্বশক্তিমান দেশ হিসেবে উঠে আসবে। এর পাশাপাশি কঙ্গোর গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র ৪৩১ মিলিয়ন মানুষ নিয়ে বিশ্বমঞ্চে নতুন ভূমিকায় আবির্ভূত হবে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যা ২০২৪ সালে তৃতীয় স্থানে ছিল, ২১০০ সালে নেমে আসবে ষষ্ঠ স্থানে, যদিও জনসংখ্যা তখন বেড়ে দাঁড়াবে ৪২১ মিলিয়নে। আফ্রিকার ইথিওপিয়া ও তানজানিয়ার জনসংখ্যা তীব্র বৃদ্ধি পেয়ে যথাক্রমে ৩৬৭ মিলিয়ন ও ২৬৩ মিলিয়নে পৌঁছাবে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ইন্দোনেশিয়া জনসংখ্যা কমতে শুরু করলেও ২৯৬ মিলিয়ন নিয়ে শীর্ষ দশে থাকবে। আর বাংলাদেশ, যে ২০২৪ সালে ৮ম স্থানে ছিল, সেটি ২১০০ সালে ১০ম স্থানে থেকে ২০৯ মিলিয়ন জনসংখ্যা নিয়ে তালিকায় টিকে যাবে।

এই পরিবর্তনগুলো কেবল জনসংখ্যার সংখ্যায় সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং বিশ্বব্যবস্থার প্রতিটি স্তরে এর প্রভাব পড়বে। উদাহরণস্বরূপ, চীনের জনসংখ্যা হ্রাসের সঙ্গে সঙ্গে তার শ্রমশক্তি সংকুচিত হবে, যার ফলে শিল্প ও উৎপাদনশীলতায় ধাক্কা লাগতে পারে। অন্যদিকে পাকিস্তান ও নাইজেরিয়ার মতো দ্রুত জনবৃদ্ধির দেশগুলোকে সামলাতে হবে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, খাদ্য নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থানের বিরাট চ্যালেঞ্জ। আফ্রিকার দেশগুলো বিশেষ করে কঙ্গো, ইথিওপিয়া ও তানজানিয়া বিশাল তরুণ জনসংখ্যার কারণে সম্ভাবনার পাশাপাশি অস্থিরতার মুখোমুখি হতে পারে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের জনসংখ্যা ২০২৪ সালের ৪৫১ মিলিয়ন থেকে নেমে আসবে ২১০০ সালে মাত্র ৩৪৮ মিলিয়নে। এর মানে হচ্ছে ইউরোপ ক্রমশ একটি ‘বুড়ো মহাদেশে’ পরিণত হবে, যেখানে জনসংখ্যার বার্ধক্য বড় অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকট ডেকে আনতে পারে। একইসঙ্গে এই পতন বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যে ইউরোপকে পিছিয়ে দেবে।

বাংলাদেশের অবস্থান তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল। ২০২৪ সালে ১৭৪ মিলিয়ন থেকে বেড়ে ২১০০ সালে ২০৯ মিলিয়ন হলেও, জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার অনেকটা নিয়ন্ত্রিত থাকবে। তবে সীমিত ভৌগোলিক আয়তন, ঘনবসতি, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, কৃষিজমি সংকোচন এবং নগরায়ণের চাপ বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠবে। অন্যদিকে, জনশক্তির সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক শক্তি অর্জনের সুযোগও পাবে।

জাতিসংঘের এই পূর্বাভাস থেকে স্পষ্ট হয়, আগামী শতাব্দীতে বৈশ্বিক ক্ষমতার কেন্দ্র ধীরে ধীরে আফ্রিকার দিকে সরে আসবে। বর্তমানে যেসব দেশ আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করছে, ২১০০ সালের মধ্যে তাদের অনেকেই পিছিয়ে পড়বে। আফ্রিকা হবে নতুন জনসংখ্যার কেন্দ্রস্থল, যেখানে নাইজেরিয়া, কঙ্গো, ইথিওপিয়া ও তানজানিয়ার মতো দেশগুলো বৈশ্বিক রাজনীতি ও অর্থনীতির কাঠামো বদলে দিতে পারে।

এই পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন ওঠে—বিশ্ব কি প্রস্তুত এই জনসংখ্যাগত রূপান্তরকে সামলানোর জন্য? খাদ্য, পানি, জ্বালানি ও পরিবেশের ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ কি সামাল দেওয়া সম্ভব হবে? স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষার মতো মৌলিক অধিকারগুলো নিশ্চিত করতে কি সক্ষম হবে দ্রুত বেড়ে ওঠা দেশগুলো? নাকি এই চাপ রাজনৈতিক অস্থিরতা, যুদ্ধ ও অভ্যন্তরীণ সংকট বাড়াবে?

অন্যদিকে, কমতে থাকা দেশগুলো যেমন চীন ও ইউরোপের দেশগুলোকে টিকে থাকতে হলে প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও অভিবাসনের ওপর আরও নির্ভর করতে হতে পারে। তারা হয়তো নিজেদের অর্থনৈতিক শক্তি ধরে রাখতে নতুন পথ খুঁজবে, যেমন দক্ষতা বাড়ানো, স্বয়ংক্রিয়তা বৃদ্ধি বা বৈশ্বিক জোট গঠন।

সবশেষে বলা যায়, জাতিসংঘের জনসংখ্যা পূর্বাভাস কেবল ভবিষ্যতের একটি সংখ্যা নয়। এটি আমাদের বলে দেয়, আগামী শতাব্দীর পৃথিবী দেখতে কেমন হতে পারে—কোন দেশ উত্থান ঘটাবে, কোন দেশ পিছিয়ে পড়বে, আর কারা নতুন শক্তি হয়ে বিশ্বমানচিত্রে প্রভাব বিস্তার করবে।

Facebook Comments Box

আরও পড়ুন

ভেনেজুয়েলায় ভয়াবহ ভূমিকম্প, দুর্যোগ এলাকা ঘোষণা

Upay-foodpanda partnership to simplify transactions

মোহাম্মদপুরে মোটরসাইকেলের ধাক্কায় প্রাণ গেল নিরাপত্তাকর্মীর

এক দিনের ব্যবধানে আবারও কমলো স্বর্ণের দাম

২৮ জুন ভিটামিন এ প্লাস ক্যাম্পেইন, ক্যাপসুল পাবে ২ কোটি ৪০ লাখ শিশু

শেরপুরে মাইক্রোবাস-সিএনজি সংঘর্ষে ডিবির ৮ পুলিশ সদস্য আহত

ভেনেজুয়েলায় জোড়া ভূমিকম্পের পর কাঁপল জাপান

গৌরীপুরে বিজয় এক্সপ্রেসের ৩ বগি লাইনচ্যুত

নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতে মানসম্পন্ন গবেষণার আহ্বান কৃষিমন্ত্রীর

৩৯ সেকেন্ডে দুই ভূমিকম্প, কাঁপল ভেনেজুয়েলা ও জাপান

তিন দশকের আস্থার নাম চট্টগ্রাম মেইল, নেই কোনো সাপ্তাহিক ছুটি

দেশের ১১ অঞ্চলে ঝড়-বজ্রবৃষ্টির পূর্বাভাস