
খুলনায় হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসার আড়ালে ভয়ঙ্করভাবে ছড়িয়ে পড়েছে রেক্টিফাইড স্পিরিট বা অ্যালকোহলের অবৈধ বিক্রি। সম্প্রতি বিষাক্ত এই তরল সেবনে পাঁচজনের মৃত্যুর ঘটনায় এলাকাজুড়ে দেখা দিয়েছে চাঞ্চল্য। দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনের চোখের সামনে চলে আসা এ মরণফাঁদের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো উদ্যোগ না থাকায় ক্ষোভে ফুঁসছেন স্থানীয়রা।
গত ১৯ জুলাই খুলনা নগরীর বয়রা পুজাখোলা ইসলামিয়া কলেজ মোড় এলাকায় বিষাক্ত মদপানে পাঁচজন মারা যান। পরদিন পুলিশ, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর ও ওষুধ প্রশাসনের তৎপরতায় গ্রেফতার করা হয় স্থানীয় হ্যানিম্যান হোমিও ফার্মেসির মালিক মোসলেম আলীকে। পুলিশ জানায়, নিহতরা তার কাছ থেকেই রেক্টিফাইড স্পিরিট সংগ্রহ করেছিলেন।
সরেজমিনে অনুসন্ধানে জানা গেছে, বৈকালী বাজার এলাকার ওই হোমিও ফার্মেসি ও শিশু মাতৃমঙ্গল চিকিৎসালয় বহুদিন ধরেই পরিচালনা করে আসছিলেন মোসলেম আলী। এলাকাবাসীর অভিযোগ, হোমিওপ্যাথির ছদ্মাবরণে তিনি দীর্ঘদিন ধরে রেক্টিফাইড স্পিরিট বিক্রি করে আসছিলেন। তার বিরুদ্ধে এর আগেও পুলিশের হাতে আটক হওয়ার রেকর্ড রয়েছে।
স্থানীয়রা বলছেন, প্রশাসনের উদাসীনতা, অনিয়মিত নজরদারি এবং জনবল সংকটের কারণে এমন ভয়াবহ চিত্র গড়ে উঠেছে। খুলনা হোমিওপ্যাথিক মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের অধ্যক্ষ ডা. এন এম শামীমুল ইসলাম বলেন, ‘‘হোমিও চিকিৎসায় রেক্টিফাইড স্পিরিট ওষুধ তৈরিতে ব্যবহার করা হলেও সরাসরি বিক্রি সম্পূর্ণ অবৈধ। মোসলেম আলীর কোনো নিবন্ধন নেই, অথচ বহু বছর ধরে ব্যবসা চালিয়ে আসছিল। শুধু সে একা নয়, আরও অনেকে জড়িত।’’
তিনি জানান, বিষয়টি নিয়ে চিকিৎসক, ব্যবসায়ী ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনায় বসা হয়েছে। প্রশাসনের আরও সক্রিয় হওয়া এখন জরুরি।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের তথ্য বলছে, খুলনা শহর ও জেলার অন্তত কয়েক ডজন হোমিও দোকানে নিয়মিতভাবে রেক্টিফাইড স্পিরিট বিক্রি হচ্ছে। চলতি বছর ৮ মে সোনাডাঙ্গা থেকে ৫১০ বোতল স্পিরিট জব্দ করা হয়, ২০ ও ২১ জুলাই অভিযানে আরও ১২ বোতল উদ্ধার এবং তিনজনকে গ্রেফতার করা হয়।
জেলায় বর্তমানে হোমিও ওষুধ বিক্রি ও চিকিৎসাকেন্দ্র রয়েছে প্রায় ৫০০টি, কিন্তু বৈধ নিবন্ধন আছে মাত্র ১৫৮টির।
খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের সহকারী কমিশনার খন্দকার হোসেন আহম্মদ বলেন, ‘‘মোসলেম আলীকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। গোয়েন্দা টিম কাজ করছে। মাদকসেবী ও বিক্রেতারা কৌশল বদলাচ্ছে, আমরাও সতর্ক আছি।’’
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের খুলনা শাখার উপ-পরিচালক মো. মিজানুর রহমান জানান, গত তিন মাসে ৭৫০ বোতল রেক্টিফাইড স্পিরিট জব্দ করা হয়েছে। সাম্প্রতিক মৃত্যুর ঘটনায় বিভিন্ন দপ্তর একযোগে কাজ শুরু করেছে।
খুলনা বিভাগীয় ওষুধ প্রশাসনের উপ-পরিচালক সুবর্ণ আহমেদ বলেন, ‘‘আমাদের জনবল ও যানবাহনের সংকট রয়েছে। ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা না থাকায় জেলা প্রশাসনের সহায়তা ছাড়া অভিযান চালানো সম্ভব হয় না।’’
স্থানীয়রা বলছেন, কাগজে-কলমে অভিযান থাকলেও বাস্তবে কোনো পরিবর্তন নেই। তাই অনিয়ন্ত্রিত হোমিওপ্যাথিক কেন্দ্র ও অবৈধ স্পিরিট বিক্রির বিরুদ্ধে নিয়মিত নজরদারি এবং কঠোর আইন প্রয়োগ ছাড়া পরিস্থিতির উন্নয়ন সম্ভব নয়। আর তা না হলে আরও প্রাণহানির আশঙ্কা থেকেই যাবে।