
সন্ধ্যার হাসপাতালের বারান্দায় দাঁড়িয়ে আহমেদ আলী কাঁধে ভর করে বসে আছেন, হাতে কাগজের ফাইল। ভিতরে তার স্ত্রী হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ভর্তি। চিকিৎসক জানিয়েছেন, হার্টে রিং পরাতে হবে—খরচ প্রায় আড়াই লাখ টাকা। তৃতীয় শ্রেণির এই সরকারি কর্মচারীর চোখে তখন শুধু অন্ধকার। কিন্তু হঠাৎ এক খবরে যেন একটু আলোর রেখা দেখলেন আহমেদ আলীর মতো বহু সাধারণ মানুষ। সরকার হার্টের রিং-এর দাম উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে দিয়েছে।
বাংলাদেশে হৃদরোগের হার দিন দিন বাড়ছে। বদলে যাওয়া জীবনযাপন, খাদ্যাভ্যাস, মানসিক চাপ, এমনকি দূষণ—সব মিলিয়ে এখন প্রায় প্রতিটি পরিবারেই কেউ না কেউ হৃদরোগে আক্রান্ত। এই রোগের এক গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা পদ্ধতি হলো এনজিওপ্লাস্টি, যার মাধ্যমে হার্টে ব্লক ধরা পড়লে সেখানে রিং (স্টেন্ট) পরানো হয়।
এই স্টেন্ট বা রিং জীবনরক্ষাকারী হলেও, বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে এর উচ্চমূল্য হয়ে উঠেছিল সাধারণ মানুষের জন্য এক বড় দুর্ভোগের নাম। পাশের দেশ ভারত কিংবা অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের তুলনায় এখানে একটি রিংয়ের দাম ছিল ২ থেকে ৩ গুণ বেশি।
বছরের পর বছর এই বাড়তি দামের পেছনে ছিল নানা অভিযোগ—দায়ী করা হতো অসাধু ব্যবসায়ী এবং কিছু চিকিৎসককে। রিং আমদানিকারকদের সঙ্গে একটি চক্রের যোগসাজশে অতিরিক্ত দামে এই গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা সামগ্রী বিক্রি হতো বলে অভিযোগ রয়েছে। এর ফলে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির অনেক রোগী রিং পরানো থেকে পিছিয়ে গেছেন; অনেকেই বিদেশমুখী হয়েছেন বিকল্প চিকিৎসার আশায়।
এমন বাস্তবতায় সরকার অবশেষে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে। হার্টের রিং বা স্টেন্টের মূল্য কমিয়ে নতুন দাম নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। নতুন তালিকা অনুযায়ী, ব্র্যান্ড ও গুণমানভেদে স্টেন্টের দাম ৩ হাজার টাকা থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ৮৮ হাজার টাকা পর্যন্ত কমানো হয়েছে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর জানিয়েছে, এখন থেকে কোনো হাসপাতাল বা ক্লিনিক এই নির্ধারিত দামের বেশি চার্জ নিতে পারবে না। এতে কেবল সরকারি হাসপাতাল নয়, বেসরকারি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানগুলোকেও এই মূল্যের কাঠামো অনুসরণ করতে হবে।
এটি নিঃসন্দেহে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের একজন সিনিয়র চিকিৎসক বলেন, “আমরা বহুদিন ধরে বলে আসছিলাম যে স্টেন্টের মূল্য সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে। এবার হয়তো সেই চাপ কিছুটা কমবে।”
বেসরকারি হাসপাতালগুলোর একাংশ অবশ্য মনে করছে, এ ধরনের মূল্য নির্ধারণ তাদের ব্যবসায় প্রভাব ফেলবে। তবে সরকার বলছে, জীবনরক্ষাকারী ওষুধ ও যন্ত্রাংশের ক্ষেত্রে ব্যবসা নয়, জনগণের স্বার্থই মুখ্য।
বলা দরকার, ভারত সরকার ২০১৭ সালেই স্টেন্টের দাম কমিয়ে একটি নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে এনেছে। ফলে সেখানে হার্টের চিকিৎসা অনেক বেশি সাশ্রয়ী হয়েছে। বাংলাদেশের নাগরিকদের অনেকেই তাই চিকিৎসার জন্য ভারতে যেতে শুরু করেন। ফলে বছরে কয়েক হাজার কোটি টাকার বিদেশি মুদ্রা দেশ থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে কেবল চিকিৎসার জন্য।
নতুন দামের তালিকা কার্যকর হলে দেশের রোগীরা একদিকে যেমন কম খরচে চিকিৎসা পাবেন, তেমনি দেশীয় চিকিৎসাব্যবস্থার প্রতি আস্থা ফিরে আসবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অন্যদিকে, এই সিদ্ধান্তে কিছুটা চাপে পড়েছেন রিং আমদানিকারক ও বিপণনকারী কোম্পানিগুলো। তবে স্বাস্থ্যসচিব জানিয়েছেন, “জনস্বার্থে এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। কোম্পানিগুলোর অভিযোগ খতিয়ে দেখা হবে, কিন্তু কোনোভাবেই অতিরিক্ত মুনাফার সুযোগ দেওয়া হবে না।”
হাসপাতালগুলোকে নজরদারির আওতায় আনতে ইতোমধ্যে ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তর যৌথভাবে অভিযান শুরু করেছে। বিভিন্ন হাসপাতাল ও ক্লিনিকে অভিযান চালিয়ে রিংয়ের দাম ও মজুদ যাচাই করা হচ্ছে।
উল্লেখ্য, হৃদরোগে আক্রান্তদের মধ্যে যারা এনজিওপ্লাস্টি বা রিং পরানোর চিকিৎসা গ্রহণ করেন, তাদের প্রায় ৭০ শতাংশই দেশের বাইরে চিকিৎসা করাতে যেতে চান মূলত উচ্চমূল্যের ভয়ে। এর ফলে শুধু অর্থনৈতিক নয়, মানসিক চাপও বাড়ে রোগী ও তার পরিবারের উপর।
সরকারের এই নতুন মূল্যনির্ধারণী পদক্ষেপকে অনেকেই বলছেন ‘সাহসী পদক্ষেপ’। তবে প্রশ্ন থেকেই যায়—এই নীতির সঠিক বাস্তবায়ন কতটুকু হবে?
আহমেদ আলীর মতো অসংখ্য মানুষ এখন তাকিয়ে আছেন সরকার ও হাসপাতালগুলোর দায়িত্বশীল আচরণের দিকে। শুধু কাগজে কলমে দাম কমলে চলবে না—বাস্তবে যেন সেই কমদামেই চিকিৎসা পাওয়া যায়, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় চাওয়া।