
একটা সময় মানুষ তার জন্মভূমিতে থেকে নতুন নতুন স্বপ্ন গড়ত। কিন্তু বর্তমান বিশ্বে বাস্তবতা অনেকটা পাল্টে গেছে। অর্থনৈতিক সংকট, রাজনৈতিক অস্থিরতা, যুদ্ধ, দারিদ্র্য আর উন্নত জীবনের আকাঙ্ক্ষা মানুষকে নিজ ভূমি ছেড়ে বিদেশের পথে ঠেলে দিচ্ছে। জাতিসংঘের World Population Prospects 2024 অনুসারে এ বছর বিশ্বজুড়ে কয়েকটি দেশ সবচেয়ে বেশি মানুষ হারাচ্ছে অভিবাসনের কারণে।
সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে পাকিস্তানে। মাত্র এক বছরেই প্রায় ১৬ লাখ মানুষ দেশ ছেড়েছে। এর মূল কারণ অর্থনৈতিক মন্দা, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং কর্মসংস্থানের অভাব। পাকিস্তানের পরেই আছে সুদান, যেখান থেকে প্রায় ১৪ লাখ মানুষ বেরিয়ে গেছে। সুদানে দীর্ঘদিন ধরে চলা রাজনৈতিক অস্থিরতা ও গৃহযুদ্ধ সেখানে জীবনযাপনকে অসহনীয় করে তুলেছে।
এশিয়ার অন্য দেশগুলোতেও ব্যাপক হারে মানুষ দেশ ছেড়ে যাচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, ভারত থেকে প্রায় ৯.৭ লাখ মানুষ বিদেশে পাড়ি জমিয়েছে। বাংলাদেশ থেকেও প্রায় ৫.৫ লাখ মানুষ অভিবাসন করেছে, মূলত উন্নত কর্মসংস্থান ও ভালো জীবনযাত্রার আশায়। চীন থেকেও ৫.৬ লাখ মানুষ দেশ ছেড়েছে, যেখানে অর্থনৈতিক চাপ ও সামাজিক স্বাধীনতার সীমাবদ্ধতা বড় কারণ হিসেবে দেখা যাচ্ছে। প্রতিবেশী নেপাল থেকেও ৪.১ লাখ মানুষ দেশত্যাগ করেছে, যার বড় অংশ মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার শ্রমবাজারে গেছে।
আফ্রিকায় সুদানের পর উগান্ডা থেকে প্রায় ১.২৬ লাখ মানুষ বিদেশে গিয়েছে। লাতিন আমেরিকায় ভেনেজুয়েলা ও মেক্সিকো থেকে যথাক্রমে ১.১৩ লাখ এবং ১.০১ লাখ মানুষ দেশ ছেড়েছে। এ অঞ্চলের দেশগুলোতে দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক সংকট, রাজনৈতিক দুর্নীতি ও সামাজিক অস্থিরতা মানুষকে অন্যত্র আশ্রয় নিতে বাধ্য করছে।
ইউরোপেও একই ধারা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। গ্রিস থেকে প্রায় ১.৫৯ লাখ এবং তুরস্ক থেকে ৩.১৮ লাখ মানুষ দেশত্যাগ করেছে। ইউক্রেনের পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ—চলমান যুদ্ধের কারণে দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছে প্রায় ৩ লাখ মানুষ।
অন্যদিকে, ব্রাজিল থেকেও প্রায় ২.৪ লাখ মানুষ দেশ ছেড়েছে। একইভাবে ফিলিপাইন থেকেও ১.৬৪ লাখ মানুষ বিদেশে পাড়ি দিয়েছে, যাদের বেশিরভাগ মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও আমেরিকার শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে।
এই পরিসংখ্যানগুলো দেখায় যে, বিশ্বের অনেক দেশই তাদের কর্মক্ষম ও তরুণ জনগোষ্ঠী হারাচ্ছে, যা ভবিষ্যতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। উন্নত দেশগুলো অভিবাসীদের স্বাগত জানাচ্ছে তাদের শ্রমবাজার পূরণের জন্য, কিন্তু উৎস দেশগুলো ক্রমশ জনশূন্য হয়ে পড়ছে।
এ যেন এক বৈশ্বিক মানবপ্রবাহ, যেখানে মানুষ নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক স্থিতি ও উন্নত জীবনের আশায় নিজের জন্মভূমি পেছনে ফেলে নতুন দেশে নতুন জীবনের সন্ধানে বেরিয়ে পড়ছে।