রাজনৈতিক বিবেচনায় দায়ের করা গণমামলায় আটক বুদ্ধিজীবী, লেখক, সাংবাদিক, শিক্ষকসহ বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার নাগরিকদের বিনা বিচারে আটক না রেখে জামিনে মুক্তি এবং মামলাগুলো পুনর্মূল্যায়নের আহ্বান জানিয়েছেন দেশের ৩০ জন বিশিষ্ট নাগরিক।
শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) দেওয়া এক যৌথ বিবৃতিতে তারা বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে অসংখ্য গণমামলা দায়ের করা হয়েছে। কোনো কোনো মামলায় ১২০০ থেকে ২০০০ জন পর্যন্ত ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে, যা তাদের মতে হয়রানি ও প্রতিশোধমূলক মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ।
বিবৃতিতে বলা হয়, এসব মামলায় বুদ্ধিজীবী, আইনজীবী, সাংবাদিক, শিক্ষক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, গবেষক ও বিভিন্ন পেশার মানুষকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট প্রমাণ উপস্থাপন না করেই গ্রেফতার করা হয়েছে এবং দেড় বছরের বেশি সময় অতিবাহিত হলেও অনেকে জামিন পাননি।
স্বাক্ষরকারীরা উল্লেখ করেন, আটক ব্যক্তিদের মধ্যে অনেকেই বয়স্ক-কেউ কেউ সত্তর বা আশি বছরের ঊর্ধ্বে। বেশ কয়েকজন গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছেন বলে সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। ফলে তারা প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সুবিধা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন। এতে তাদের পরিবার ও স্বজনরা চরম উদ্বেগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, অনেক ক্ষেত্রে মামলার তদন্ত এখনো সম্পন্ন হয়নি কিংবা চার্জশিট দাখিল করা হয়নি। ফলে কার্যত বিনা বিচারে দীর্ঘ সময় কারাবন্দি থাকার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যা সংবিধান স্বীকৃত মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী বলে তারা মনে করেন।
স্বাক্ষরকারীদের অভিযোগ, শুধুমাত্র পেশাগত দায়িত্ব পালন বা সরকারের সমালোচনা করার কারণেও কিছু সাংবাদিককে গ্রেফতার করা হয়েছে। এমনকি কোনো মামলায় উচ্চ আদালত থেকে জামিন লাভের পরও অন্য মামলায় পুনরায় গ্রেফতারের ঘটনাও ঘটেছে বলে তারা দাবি করেন।
বিবৃতিতে বলা হয়, বর্তমান সরকার তার নির্বাচনী ইশতেহারে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং বেআইনি নিপীড়নের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে। সম্প্রতি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যে গণমামলা পুনর্মূল্যায়নের আশ্বাসের কথাও উল্লেখ করা হয়। এ অবস্থানকে স্বাগত জানিয়ে স্বাক্ষরকারীরা আশা প্রকাশ করেন, সরকার দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে হয়রানিমূলক মামলাগুলো পুনর্বিবেচনা করবে।
তারা বলেন, যেসব ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ অবস্থায় কারাবন্দি আছেন, তাদের মানবিক কারণে অবিলম্বে জামিনে মুক্তি দেওয়া উচিত এবং যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে যাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট ও প্রমাণসমর্থিত অভিযোগ রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও দ্রুত বিচারপ্রক্রিয়া নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়।
স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে যাঁরা রয়েছেন-
যৌথ বিবৃতিতে স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে রয়েছেন, মানবাধিকার কর্মী ও মানবাধিকার সংরক্ষণ পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল, ‘নিজেরা করি’-এর সমন্বয়কারী খুশী কবির, টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ও আইন ও সালিস কেন্দ্রের সভাপতি অ্যাডভোকেট জেড আই খান পান্না, নারী পক্ষের সদস্য শিরীন পারভিন হক, আলোকচিত্রী ড. শহিদুল আলম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সামিনা লুৎফা, এএলআরডির নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী ও অ্যাডভোকেট তবারক হোসেন, লেখক রেহেনুমা আহমেদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক তাসনিম সিরাজ মাহবুব, একই বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস, নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. জোবাইদা নাসরীন, সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. খায়রুল চৌধুরী, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. ফিরদৌস আজিম, ল্যানচেস্টার ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ড. সাদাফ নূর, নৃবিজ্ঞানী ড. নাসরিন খন্দকার, লেখক ও গবেষক পাভেল পার্থ, বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতি (বিএনডব্লিউএলএ)-এর নির্বাহী পরিচালক অ্যাডভোকেট সালমা আলী, সাংবাদিক সায়দিয়া গুলরুখ, বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মনিন্দ্র কুমার নাথ, সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক সালেহ আহমেদ, আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মী পারভেজ হাসেম, নাগরিক উদ্যোগের প্রধান নির্বাহী জাকির হোসেন, মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী অ্যাডভোকেট সাইদুর রহমান, মানবাধিকার কর্মী সাঈদ আহমেদ ও দীপায়ন খীসা, আদিবাসী অধিকার কর্মী মেইনথিন প্রমীলা এবং কানাডার ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি গবেষক হানা শামস আহমেদ।
স্বাক্ষরকারীরা মানবিক বিবেচনায় অসুস্থ ও বয়স্ক আটক ব্যক্তিদের অবিলম্বে জামিনে মুক্তি দিয়ে সুচিকিৎসা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন। পাশাপাশি গণমামলাগুলো পুনর্মূল্যায়ন করে হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহার এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানান তারা।


