দেশে নিরাপদ কৃষি ও খাদ্যব্যবস্থা নিশ্চিত করতে ফসলের বিমা, কৃষকের ঝুঁকি ভাতা চালু, কৃষি কার্ড প্রদান ও স্থানীয় বীজনির্ভর কৃষির প্রসারসহ ২০ দফা দাবি জানিয়েছে ‘নিরাপদ কৃষি ও খাদ্য আন্দোলন’ নামের একটি সংগঠন। সংগঠনটির প্রত্যাশা, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীরা এসব প্রস্তাবকে গুরুত্ব দিয়ে তাদের নির্বাচনি ইশতেহারে অন্তর্ভুক্ত করবেন এবং বাস্তবায়নে অঙ্গীকার করবেন।
রোববার (১৮ জানুয়ারি) রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটির পক্ষ থেকে এসব দাবি তুলে ধরা হয়। ‘নিরাপদ কৃষি ও খাদ্যব্যবস্থা বিষয়ক ২০ দফার বাস্তবায়ন চাই’ শীর্ষক এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয় নিরাপদ, ন্যায্য, জলবায়ুসহিষ্ণু, লাভজনক, স্বাস্থ্যকর, দূষণমুক্ত, টেকসই ও সার্বভৌম কৃষি ও খাদ্যব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে।
সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটির দাবি তুলে ধরেন নিরাপদ কৃষি ও খাদ্য আন্দোলনের মুখপাত্র, লেখক ও গবেষক পাভেল পার্থ। এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন সংগঠনটির আরেক মুখপাত্র ও কৃষক দেলোয়ার জাহান। অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন অর্থনীতিবিদ আনু মুহাম্মদ। এছাড়া দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আগত কৃষক ও কৃষি বিপণনের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরাও উপস্থিত ছিলেন।
সংবাদ সম্মেলনে অর্থনীতিবিদ আনু মুহাম্মদ বলেন, দেশে কৃষি উৎপাদন বাড়লেও কৃষকের জীবন নিরাপদ নয়। কৃষক আত্মহত্যা করছে, ক্যানসারসহ নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। গ্রামে ফসল বাড়ছে, কিন্তু পানি বিষাক্ত হয়ে উঠছে, ভূপৃষ্ঠের পানি কমে যাচ্ছে এবং খাদ্য হয়ে উঠছে ঝুঁকিপূর্ণ। ক্যানসার রোগীদের একটি বড় অংশ কৃষক-এটি কোনো দুর্ঘটনা নয়, বরং বর্তমান উন্নয়ন ধারারই ফল। এর প্রভাব শুধু কৃষকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না, শেষ পর্যন্ত পুরো সমাজই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
তিনি আরও বলেন, সবুজ বিপ্লবের পর কৃষি গবেষণার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত ছিল দেশীয় জাত, পানি সম্পদ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা। কিন্তু গবেষণা হয়েছে কীভাবে দ্রুত উৎপাদন বাড়ানো যায় তা নিয়ে। ফলে মাটি, পানি ও মানুষ-সবকিছুই ক্ষতির মুখে পড়েছে। কৃষি এখন শুধু খাদ্য উৎপাদনের ক্ষেত্র নয়, বরং অসুস্থতা তৈরির বড় উৎসে পরিণত হয়েছে।
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে আন্দোলনের মুখপাত্র পাভেল পার্থ বলেন, আমরা হঠাৎ করে বা একদিনে এই ২০ দফা বাস্তবায়নের দাবি করছি না। নিরাপদ কৃষির স্বার্থে স্বল্পমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে এটি ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করতে হবে। এক্ষেত্রে কৃষকসহ সব শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি।
তিনি আরও বলেন, রাসায়নিক সার, ডিজেল, যন্ত্রপাতি ও বিষাক্ত কীটনাশকের মাধ্যমে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো প্রতিবছর কৃষকের পকেট থেকে বিপুল অর্থ নিয়ে যাচ্ছে। তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশ অনুযায়ী বাংলাদেশ কার্বোফুরান, ডিডিটি ও অন্যান্য অতি বিপজ্জনক কীটনাশক নিষিদ্ধ করেছে, যা একটি ইতিবাচক অগ্রগতি।
আন্দোলনের আরেক মুখপাত্র ও কৃষক দেলোয়ার জাহান বলেন, বর্তমানে দেশের প্রায় ৭২ শতাংশ মাটিতে গাছের জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি নেই এবং ৬০ শতাংশের বেশি মাটিতে জিংকের ঘাটতি রয়েছে। এর অর্থ হলো দেশের মানুষের শরীরেও জিংকের ঘাটতি রয়েছে, ফলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাচ্ছে। দেশের মাটিকে সুস্থ রাখতে হলে বিষ ও ক্ষতিকর কীটনাশক ব্যবহার বন্ধ করে নিরাপদ কৃষি ও খাদ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
সংবাদ সম্মেলন থেকে সংগঠনটি কৃষক পরিচয়ের মর্যাদা নিশ্চিত, কৃষিজমি সুরক্ষা, স্থানীয় বীজ সংরক্ষণ, জৈব সার ব্যবহার, অতি বিপজ্জনক বিষ নিষিদ্ধ, ফসলের ন্যায্যমূল্য নির্ধারণ, কৃষি শ্রমিকের ন্যূনতম মজুরি, কৃষক পেনশন, কৃষি ফসলের বিমা, কৃষকের ঝুঁকি ভাতা ও কৃষিকার্ড চালুসহ ২০ দফা বাস্তবায়নের জোর দাবি জানায়।
বক্তারা বলেন, এসব দাবি বাস্তবায়ন করা না হলে কৃষি, খাদ্য ও জনস্বাস্থ্যের সংকট আরও গভীর হবে। তাই নিরাপদ কৃষি ও খাদ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে রাষ্ট্র, রাজনৈতিক দল ও সমাজের সব স্তরের মানুষকে এখনই দায়িত্বশীল ভূমিকা নিতে হবে।


