
সূর্যের আলো ও বাতাসের পাশাপাশি এবার বৃষ্টির ফোঁটা থেকেও বিদ্যুৎ উৎপাদনের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। স্পেনের গবেষকরা মাত্র ১০০ ন্যানোমিটার পুরু একটি স্বচ্ছ আবরণ তৈরি করেছেন, যা সোলার প্যানেলের ওপর ব্যবহার করা যায়। পানির ফোঁটা ওই আবরণের ওপর দিয়ে গড়িয়ে যাওয়ার সময় বৈদ্যুতিক চার্জ তৈরি করতে সক্ষম হচ্ছে।
সেভিলের একটি গবেষণাগারে তৈরি করা এই প্রযুক্তি এখনো পরীক্ষামূলক পর্যায়ে রয়েছে। গবেষকদের লক্ষ্য হলো, একই সোলার প্যানেলকে সূর্যের আলো ও বৃষ্টির পানি-দুই উৎস থেকেই শক্তি সংগ্রহে সক্ষম করে তোলা।
গবেষকদের তৈরি বিশেষ আবরণটি মূলত ফ্লোরিনযুক্ত একটি পলিমার। এর পুরুত্ব প্রায় ১০০ ন্যানোমিটার এবং স্বচ্ছতা ৯০ শতাংশের বেশি। ফলে আবরণটি সোলার প্যানেলের ওপর থাকলেও সূর্যের আলো সোলার সেলে পৌঁছাতে বড় ধরনের বাধা সৃষ্টি করে না।
বৃষ্টির ফোঁটা থেকে বিদ্যুৎ তৈরির পেছনে কাজ করছে ‘ট্রাইবোইলেকট্রিক প্রভাব’। দুটি ভিন্ন পদার্থের পৃষ্ঠ পরস্পরের সংস্পর্শে এসে আবার আলাদা হলে তাদের মধ্যে বৈদ্যুতিক চার্জের আদান-প্রদান ঘটে। পানির ফোঁটা যখন বিশেষ আবরণের ওপর দিয়ে গড়িয়ে যায়, তখন পানি ও আবরণের মধ্যে চার্জের পার্থক্য তৈরি হয়। উপযুক্ত সার্কিটের মাধ্যমে এই বৈদ্যুতিক বিভব থেকে কারেন্ট সংগ্রহ করা সম্ভব।
পরীক্ষায় দেখা গেছে, একটি পানির ফোঁটা আবরণের ওপর দিয়ে গড়িয়ে যাওয়ার সময় সর্বোচ্চ প্রায় ১১০ ভোল্ট পিক ভোল্টেজ তৈরি করতে পারে। তবে ভোল্টেজ তুলনামূলক বেশি হলেও উৎপন্ন কারেন্ট ও মোট শক্তির পরিমাণ কম। ফলে এই প্রযুক্তি দিয়ে এখনই একটি বাড়ির সব বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম চালানো সম্ভব নয়।
গবেষকদের মতে, পেরোভস্কাইট সোলার সেলের ক্ষেত্রে প্রযুক্তিটি বিশেষভাবে সম্ভাবনাময় হতে পারে। পেরোভস্কাইট সেল তুলনামূলক কম খরচে তৈরি করা সম্ভব এবং উচ্চ শক্তি-রূপান্তর দক্ষতার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে আর্দ্রতার প্রতি সংবেদনশীলতা এ ধরনের সেলের অন্যতম বড় সমস্যা। নতুন আবরণটি একদিকে পানি ও আর্দ্রতা থেকে সোলার সেলকে সুরক্ষা দিতে পারে, অন্যদিকে বৃষ্টির ফোঁটা থেকে বৈদ্যুতিক চার্জ সংগ্রহেও সহায়তা করতে পারে।
বৃষ্টির সময় সোলার প্যানেলের ওপর জমে থাকা বা গড়িয়ে পড়া পানির ফোঁটা থেকেই অতিরিক্ত শক্তি সংগ্রহ করা হবে। আর বৃষ্টি না থাকলে প্যানেল প্রচলিত পদ্ধতিতে সূর্যের আলো থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে।
তবে প্রযুক্তিটি এখনো গবেষণাগারেই সীমাবদ্ধ। বাস্তব পরিবেশে দীর্ঘ সময় ধরে এর কার্যকারিতা, স্থায়িত্ব এবং বিভিন্ন আবহাওয়ায় কর্মক্ষমতা যাচাই করা বাকি রয়েছে। বৃষ্টির ফোঁটা থেকে উৎপন্ন শক্তির পরিমাণও সীমিত।
তাই আপাতত বড় পরিসরে বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিকল্প হিসেবে নয়, বরং কম বিদ্যুৎ প্রয়োজন এমন ওয়্যারলেস সেন্সর, আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা, হাইওয়ে সাইনেজ বা ছোট সহায়ক আলোতে প্রযুক্তিটি ভবিষ্যতে ব্যবহার করা যেতে পারে।
সব মিলিয়ে, প্রচলিত সৌরবিদ্যুতের বিকল্প নয়-বরং একই সোলার প্যানেলকে রোদ ও বৃষ্টি উভয় প্রাকৃতিক উৎস থেকে শক্তি সংগ্রহে সক্ষম করে তোলাই এই প্রযুক্তির মূল লক্ষ্য।