ঢাকাশনিবার , ২৭ জুন ২০২৬
  1. সর্বশেষ
  2. লাইফস্টাইল

বিশ্বে যুব বেকারত্বের বাস্তব চিত্র: ২০২৫ সালের প্রেক্ষাপট

প্রতিবেদক
Ibrahim Khalil
১৮ অগাস্ট ২০২৫, ৩:৫৬ বিকাল

Link Copied!

শহরের ব্যস্ত মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকা তরুণটির চোখে হয়তো ঝলক দেখা যায় স্বপ্নের, কিন্তু তার মুঠোয় ধরা থাকে অস্থিরতা। পড়াশোনা শেষ করেও চাকরির নিশ্চয়তা না থাকায় সে হাঁটে এক অজানা অনিশ্চয়তার পথে। এই চিত্র শুধু একটি দেশের নয়, বরং গোটা বিশ্বের তরুণ প্রজন্মের। আজকের বিশ্বে যুব বেকারত্ব একটি বড় সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা কেবল পরিবার ও সমাজকেই নয়, বরং জাতির উন্নয়নকেও থামিয়ে দিতে পারে।

জাতিসংঘ এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিবেদন বলছে, বর্তমান বিশ্বে তরুণদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা উন্নয়নের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। এরই প্রতিফলন পাওয়া যায় ২০২৫ সালের যুব বেকারত্বের হারে। দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে শুরু করে ইউরোপ ও এশিয়ার বহু উন্নত দেশেও বেকারত্ব তরুণদের প্রধান উদ্বেগে পরিণত হয়েছে।

দক্ষিণ আফ্রিকা আজ বিশ্বের সর্বোচ্চ যুব বেকারত্বের দেশ হিসেবে পরিচিত। দেশটিতে যুব বেকারত্বের হার দাঁড়িয়েছে ৬২.২ শতাংশে। এর মানে হলো, প্রতি ১০ জন তরুণের মধ্যে ৬ জনই চাকরি পাচ্ছে না। রাজনৈতিক অস্থিরতা, দুর্বল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, শিক্ষার মান এবং দক্ষতা প্রশিক্ষণের ঘাটতি—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। এই অবস্থা কেবল দারিদ্র্য বাড়াচ্ছে না, বরং তরুণদের মধ্যে হতাশা, অপরাধপ্রবণতা এবং সামাজিক অস্থিরতাও সৃষ্টি করছে।

ইউরোপের স্পেন দীর্ঘদিন ধরেই উচ্চ যুব বেকারত্বে ভুগছে। বর্তমানে দেশটিতে এই হার ২৪ শতাংশ। অর্থনৈতিক মন্দা কাটিয়ে উঠলেও তরুণদের জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারছে না দেশটি। অনেক তরুণ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক হলেও চাকরির বাজারে প্রতিযোগিতা এত বেশি যে তারা প্রত্যাশিত সুযোগ পাচ্ছে না। একই সমস্যা ইতালিতেও, যেখানে যুব বেকারত্বের হার ২০.১ শতাংশ। এই দুই দেশেই তরুণদের একাংশ চাকরির সন্ধানে ইউরোপের অন্যান্য দেশে পাড়ি জমাচ্ছে।

ফ্রান্সেও একই ধারা দেখা যাচ্ছে। দেশটির যুব বেকারত্বের হার ১৭.৫ শতাংশ। সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা শক্তিশালী হলেও চাকরির প্রতিযোগিতা তরুণদের জন্য এক বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। শিক্ষা ও শিল্পক্ষেত্রের মধ্যে দক্ষতার ফারাক অনেক তরুণকে শ্রমবাজার থেকে দূরে সরিয়ে রাখছে।

এশিয়ার তুরস্কেও বেকারত্বের চাপ বাড়ছে। দেশটিতে যুব বেকারত্বের হার ১৬.২ শতাংশ। রাজনৈতিক অস্থিরতা, মুদ্রাস্ফীতি এবং অর্থনৈতিক চাপের কারণে কর্মসংস্থানের সুযোগ সঙ্কুচিত হয়েছে। এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে তরুণদের ওপর, যারা ভবিষ্যতের অর্থনীতিকে এগিয়ে নেওয়ার কথা ছিল।

উত্তর আমেরিকার দুটি বড় দেশ—কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্র—তরুণদের কর্মসংস্থান পরিস্থিতিতে তুলনামূলকভাবে ভালো অবস্থানে থাকলেও সমস্যা এখনো রয়েছে। কানাডায় যুব বেকারত্ব ১৪.৬ শতাংশ এবং যুক্তরাষ্ট্রে ১০ শতাংশ। উন্নত শিক্ষা ব্যবস্থা ও প্রযুক্তি নির্ভর কর্মক্ষেত্র থাকা সত্ত্বেও প্রতিযোগিতা এতটাই তীব্র যে অনেক তরুণ তাদের যোগ্যতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ চাকরি পাচ্ছে না।

চীন, বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি, এখানেও যুব বেকারত্ব একটি উদ্বেগজনক বিষয়। দেশটিতে এই হার ১৪.৫ শতাংশ। প্রযুক্তি খাতের অগ্রগতি এবং শিল্পায়নের বিস্তার সত্ত্বেও বিপুল সংখ্যক তরুণ কর্মসংস্থানের বাইরে থেকে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শ্রমবাজারে দক্ষতার অভাব এবং অটোমেশনের কারণে অনেক তরুণ চাকরির সুযোগ হারাচ্ছে।

যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়া তুলনামূলকভাবে ভালো অবস্থানে রয়েছে। যুক্তরাজ্যে যুব বেকারত্ব ১২ শতাংশ এবং অস্ট্রেলিয়ায় ৯.৮ শতাংশ। তবে এই দেশগুলোতেও তরুণরা স্থায়ী চাকরি বা দীর্ঘমেয়াদি ক্যারিয়ার গড়ার ক্ষেত্রে সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে।

নেদারল্যান্ডস ও জার্মানিতে পরিস্থিতি আরও নিয়ন্ত্রিত। নেদারল্যান্ডসে যুব বেকারত্ব ৮.৭ শতাংশ এবং জার্মানিতে মাত্র ৬.৪ শতাংশ। জার্মানি এ ক্ষেত্রে একটি উদাহরণ তৈরি করেছে। দেশটির ‘ডুয়াল ভোকেশনাল ট্রেনিং সিস্টেম’ তরুণদের একদিকে শিক্ষা এবং অন্যদিকে হাতে-কলমে কাজ শেখার সুযোগ দেয়। এর ফলে তারা শ্রমবাজারে প্রবেশের আগে থেকেই দক্ষ হয়ে ওঠে।

এশিয়ার মধ্যে দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানও তুলনামূলকভাবে ভালো অবস্থায় রয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ায় যুব বেকারত্ব ৫.৫ শতাংশ এবং জাপানে ৩.৯ শতাংশ। প্রযুক্তি, শিল্প এবং শিক্ষা ব্যবস্থার শক্তিশালী কাঠামো তরুণদের জন্য চাকরির সুযোগ তৈরি করছে। তবে সেখানেও প্রতিযোগিতা এবং কাজের চাপ তরুণদের জন্য মানসিক চাপের কারণ হয়ে উঠছে।

সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক চিত্র দেখা যায় সুইজারল্যান্ডে। দেশটিতে যুব বেকারত্ব মাত্র ২.৭ শতাংশ। উন্নত অর্থনীতি, প্রশিক্ষণভিত্তিক শিক্ষা এবং বহুমুখী কর্মক্ষেত্র তরুণদের জন্য নিশ্চিত করেছে প্রায় সবার চাকরির সুযোগ। ফলে দেশটি শুধু ইউরোপেই নয়, গোটা বিশ্বেই সফলতার একটি উদাহরণ হয়ে উঠেছে।

বিশ্বব্যাপী এই পরিসংখ্যান আমাদের সামনে স্পষ্টভাবে দেখায়, তরুণদের কর্মসংস্থান কেবল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য নয়, বরং সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্যও অপরিহার্য। যেখানে বেকারত্বের হার বেশি, সেখানে অপরাধপ্রবণতা, দারিদ্র্য এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা বেড়ে যায়। বিপরীতে যেখানে তরুণরা কাজে যুক্ত হয়, সেখানে অর্থনীতি গতিশীল হয়, উদ্ভাবন বাড়ে এবং সমাজ এগিয়ে যায়।

আজকের বিশ্বে যুবকদের সবচেয়ে বড় সম্পদ বলা হলেও, সেই সম্পদকে কাজে লাগাতে না পারলে তা হয়ে দাঁড়াবে বোঝা। এজন্য প্রয়োজন সুপরিকল্পিত শিক্ষা ব্যবস্থা, দক্ষতা উন্নয়ন, উদ্যোক্তা সৃষ্টির সুযোগ এবং প্রযুক্তিনির্ভর কর্মসংস্থান। প্রতিটি দেশকে বুঝতে হবে, তরুণরা তাদের ভবিষ্যৎ। তাদের বেকারত্ব কেবল ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়, বরং জাতীয় ব্যর্থতা।

তরুণ প্রজন্মের হাতে যদি কাজ থাকে, তবে সমাজে শান্তি থাকবে, পরিবারে স্বচ্ছলতা থাকবে এবং রাষ্ট্রে উন্নয়ন এগিয়ে যাবে। তাই যুব বেকারত্ব হ্রাস করা আজকের দিনে মানব সভ্যতার অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।

Facebook Comments Box

আরও পড়ুন

মোহাম্মদপুরে মোটরসাইকেলের ধাক্কায় প্রাণ গেল নিরাপত্তাকর্মীর

এক দিনের ব্যবধানে আবারও কমলো স্বর্ণের দাম

২৮ জুন ভিটামিন এ প্লাস ক্যাম্পেইন, ক্যাপসুল পাবে ২ কোটি ৪০ লাখ শিশু

শেরপুরে মাইক্রোবাস-সিএনজি সংঘর্ষে ডিবির ৮ পুলিশ সদস্য আহত

ভেনেজুয়েলায় জোড়া ভূমিকম্পের পর কাঁপল জাপান

গৌরীপুরে বিজয় এক্সপ্রেসের ৩ বগি লাইনচ্যুত

নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতে মানসম্পন্ন গবেষণার আহ্বান কৃষিমন্ত্রীর

৩৯ সেকেন্ডে দুই ভূমিকম্প, কাঁপল ভেনেজুয়েলা ও জাপান

তিন দশকের আস্থার নাম চট্টগ্রাম মেইল, নেই কোনো সাপ্তাহিক ছুটি

দেশের ১১ অঞ্চলে ঝড়-বজ্রবৃষ্টির পূর্বাভাস

উপায়-ফুডপান্ডা চুক্তি, লেনদেন হবে আরও সহজ

হামে ২৪ ঘণ্টায় ৩ শিশুর মৃত্যু, হাসপাতালে ভর্তি ১ হাজার ৮৯