ঢাকারবিবার , ১২ এপ্রিল ২০২৬
  • অন্যান্য

আজকের সর্বশেষ সবখবর

বাংলাদেশে কাঁঠাল উৎপাদনে শীর্ষে যে ৩ জেলা

বিপ্লব হোসাইন
এপ্রিল ১২, ২০২৬ ১১:০৬ পূর্বাহ্ণ । ৩০ জন

বাংলাদেশে কাঁঠাল একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থকরী ফল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (BBS) এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (DAE)-এর তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, দেশে বছরে প্রায় ১৮ থেকে ১৯ লক্ষ মেট্রিক টন কাঁঠাল উৎপাদিত হচ্ছে। ক্রমবর্ধমান চাহিদা, কৃষকদের আগ্রহ এবং সরকারি উদ্যোগের ফলে এই খাতে সম্ভাবনা দিন দিন বাড়ছে।

বিভাগভিত্তিক উৎপাদন চিত্র

দেশের কাঁঠাল উৎপাদনে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে ঢাকা বিভাগ, যেখান থেকে মোট উৎপাদনের প্রায় ২৫-৩০ শতাংশ আসে। গাজীপুর জেলায় একাই উৎপাদিত হয় প্রায় ২.৫ থেকে ৩ লক্ষ মেট্রিক টন কাঁঠাল, যা দেশের সর্বোচ্চ। এছাড়া নরসিংদীতে ৮৫,০০০ থেকে ৯৫,০০০ মেট্রিক টন এবং টাঙ্গাইলে ৭০,০০০ থেকে ৮০,০০০ মেট্রিক টন কাঁঠাল উৎপাদিত হয়।

চট্টগ্রাম বিভাগ উৎপাদনে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে, বিশেষ করে পার্বত্য অঞ্চলের কারণে। রাঙ্গামাটিতে ১.৮ থেকে ২.২ লক্ষ মেট্রিক টন, খাগড়াছড়িতে প্রায় ১.৫ লক্ষ এবং বান্দরবানে প্রায় ১.২ লক্ষ মেট্রিক টন কাঁঠাল উৎপাদিত হয়।

ময়মনসিংহ বিভাগেও উল্লেখযোগ্য উৎপাদন রয়েছে। ময়মনসিংহ জেলায় ৯৫,০০০ থেকে ১.১০ লক্ষ মেট্রিক টন এবং শেরপুর ও জামালপুর মিলিয়ে প্রায় ৮০,০০০ মেট্রিক টন উৎপাদিত হয়।

রাজশাহী বিভাগে বগুড়ায় ৪৫,০০০ থেকে ৫০,০০০ মেট্রিক টন এবং নাটোর ও নওগাঁয় প্রতিটি জেলায় ২০,০০০ থেকে ২৫,০০০ মেট্রিক টন কাঁঠাল উৎপাদিত হয়।

রংপুর বিভাগে দিনাজপুরে প্রায় ৪০,০০০ মেট্রিক টন, পঞ্চগড়ে ১৪,৫০০ থেকে ১৫,০০০ মেট্রিক টন এবং ঠাকুরগাঁওয়ে প্রায় ১২,০০০ মেট্রিক টন উৎপাদন হয়।

খুলনা বিভাগে কুষ্টিয়ায় ৩০,০০০ থেকে ৩৫,০০০ মেট্রিক টন এবং যশোর ও ঝিনাইদহ মিলিয়ে প্রায় ৫০,০০০ মেট্রিক টন কাঁঠাল উৎপাদিত হয়।

সিলেট বিভাগে মৌলভীবাজারে ৫৫,০০০ থেকে ৬০,০০০ মেট্রিক টন এবং হবিগঞ্জে প্রায় ৪৫,০০০ মেট্রিক টন উৎপাদন হয়।

বরিশাল বিভাগে তুলনামূলকভাবে উৎপাদন কম হলেও মোট উৎপাদন প্রায় ১ লক্ষ মেট্রিক টন। বরিশাল জেলায় ২০,০০০ থেকে ২৫,০০০ মেট্রিক টন এবং ভোলা ও পিরোজপুর মিলিয়ে প্রায় ৪০,০০০ মেট্রিক টন উৎপাদিত হয়।

অপচয় ও চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশে উৎপাদিত কাঁঠালের প্রায় ৩০ থেকে ৪৫ শতাংশ সঠিক সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের অভাবে নষ্ট হয়ে যায়। এটি এই খাতের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। এ সমস্যা সমাধানে সরকার সংরক্ষণ ব্যবস্থা উন্নয়ন এবং প্রক্রিয়াজাত শিল্প সম্প্রসারণে কাজ করছে, যাতে অপচয় কমিয়ে রপ্তানি বাড়ানো যায়।

শীর্ষ উৎপাদনকারী জেলার প্রবণতা (২০২১-২০২৫)

গত পাঁচ বছরে শীর্ষ তিন উৎপাদনকারী জেলা—গাজীপুর, রাঙ্গামাটি ও নরসিংদীর উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে।

২০২১ সালে গাজীপুরে ২,৪০,০০০ মেট্রিক টন, রাঙ্গামাটিতে ১,৮৫,০০০ এবং নরসিংদীতে ৭২,৫০০ মেট্রিক টন উৎপাদিত হয়।

২০২২ সালে তা বেড়ে যথাক্রমে ২,৫২,০০০, ১,৯২,০০০ ও ৭৫,২০০ মেট্রিক টনে পৌঁছায়।

২০২৩ সালে গাজীপুরে ২,৬৫,০০০, রাঙ্গামাটিতে ২,০৫,০০০ এবং নরসিংদীতে ৭৮,০০০ মেট্রিক টন উৎপাদন হয়।

২০২৪ সালে উৎপাদন দাঁড়ায় যথাক্রমে ২,৭৫,০০০, ২,১৫,০০০ ও ৮২,৪০০ মেট্রিক টনে।

২০২৫ সালে সম্ভাব্য উৎপাদন গাজীপুরে ২,৮৫,০০০+, রাঙ্গামাটিতে ২,২৫,০০০+ এবং নরসিংদীতে ৮৫,০০০+ মেট্রিক টনে পৌঁছানোর ধারণা করা হচ্ছে।

জেলা ভিত্তিক বিশ্লেষণ

গাজীপুরকে দেশের ‘কাঁঠালের রাজধানী’ বলা হয়। এখানে প্রতি বছর গড়ে ৪-৫ শতাংশ হারে উৎপাদন বৃদ্ধি পাচ্ছে, বিশেষ করে শ্রীপুর ও কাপাসিয়া উপজেলায় ফলন বেশি।

রাঙ্গামাটিতে পার্বত্য অঞ্চলে বাণিজ্যিকভাবে কাঁঠাল চাষ বৃদ্ধি পাওয়ায় এটি এখন দ্বিতীয় বৃহত্তম উৎপাদনকারী জেলায় পরিণত হয়েছে।

নরসিংদীর কাঁঠাল স্বাদ ও গুণগত মানে উন্নত হওয়ায় দেশের বাজারে এর চাহিদা বেশি এবং এটি বাজারের বড় অংশ দখল করে আছে।

বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৬ সালে কাঁঠাল উৎপাদন আরও ১০-১৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেতে পারে। বর্তমানে রপ্তানিযোগ্য জাতের কাঁঠাল চাষে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ থেকে ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে কাঁঠাল রপ্তানি শুরু হয়েছে।

সার্বিকভাবে বলা যায়, সঠিক সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজারজাতকরণ ব্যবস্থা উন্নত করা গেলে কাঁঠাল খাত বাংলাদেশের অর্থনীতিতে আরও বড় অবদান রাখতে সক্ষম হবে।