ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের বিভিন্ন স্থানে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডসহ ধারাবাহিক সহিংসতা, বিশেষ করে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দেশের ৩২ জন বিশিষ্ট নাগরিক। এসব ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে দায়ীদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন তারা।
শনিবার (১০ জানুয়ারি) গণমাধ্যমে পাঠানো এক যৌথ বিবৃতিতে নাগরিকরা বলেন, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে সংখ্যালঘু নাগরিকদের হত্যা, তাদের বাড়িঘরে হামলা ও অগ্নিসংযোগের একের পর এক ঘটনা ঘটছে, যা আসন্ন নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ ও দেশকে অস্থিতিশীল করার উদ্দেশ্যে পরিকল্পিতভাবে সংঘটিত হচ্ছে বলে জনমনে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, ময়মনসিংহের ভালুকায় দীপু দাস, যশোরে রানা প্রতাপ বৈরাগী, নরসিংদীতে শরৎ চক্রবর্তী মণিসহ একাধিক ব্যক্তি হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। এছাড়া চট্টগ্রামের রাউজানে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বাড়িতে দরজা বন্ধ করে অগ্নিসংযোগের মতো ভয়াবহ ঘটনাও ঘটেছে। এসব ঘটনায় স্বাক্ষরকারীরা গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করে তীব্র ভাষায় নিন্দা জানান।
নাগরিকরা বলেন, বাংলাদেশের সমাজ বহুধর্মীয় ও সম্প্রীতিপূর্ণ। সাধারণ মানুষের মধ্যে ধর্ম, সম্প্রদায় বা জাতিগত বিদ্বেষ ঐতিহ্যগতভাবে বিরল। বরং যারা এসব সহিংস হামলা ও হত্যাকাণ্ড ঘটাচ্ছে, তারা সাম্প্রদায়িক উগ্রবাদী ও রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠী। তাদের লক্ষ্য আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে ব্যাহত করা। দেশি-বিদেশি উসকানিদাতা ও পৃষ্ঠপোষক গোষ্ঠীর মদদে এ সহিংসতা চালানো হচ্ছে বলেও বিবৃতিতে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, এসব ঘটনার সুষ্ঠু ও দ্রুত তদন্ত এবং প্রকৃত অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনতে বারবার ব্যর্থ হচ্ছে প্রশাসন, যা উদ্বেগজনক। স্বাক্ষরকারীরা অবিলম্বে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের শনাক্ত, গ্রেপ্তার ও বিচারের দাবি জানান। একই সঙ্গে হামলার পেছনে থাকা ইন্ধনদাতা ও পৃষ্ঠপোষকদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনার আহ্বান জানান তারা।
এ প্রেক্ষিতে নাগরিকদের পক্ষ থেকে চার দফা দাবি তুলে ধরা হয়। দাবিগুলো হলো—
১. সংখ্যালঘু হত্যা, বাড়িঘরে হামলা ও অগ্নিসংযোগের সঙ্গে জড়িতদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা এবং উসকানিদাতাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ।
২. সংখ্যালঘুদের বাড়িঘর, দোকানপাট, মন্দির, গির্জাসহ সব উপাসনালয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অন্তর্বর্তী সরকারের বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা।
৩. হিন্দুসহ দেশের সব ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুর জীবন ও ধর্মীয় নিরাপত্তা এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় প্রশাসনকে বিশেষ নির্দেশনা ও কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করা।
৪. মূলধারার সব রাজনৈতিক দলকে দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে এসব সহিংসতা প্রতিরোধে ঐক্যবদ্ধ উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান।
বিবৃতিতে স্বাক্ষরকারীরা হলেন সুলতানা কামাল, খুশী কবির, রাশেদা কে চৌধূরী, জেড আই খান পান্না, ইফতেখারুজ্জামান, আনু মুহাম্মদ, শাহীন আনাম, ফিরদৌস আজিম, শামসুল হুদা, নুর খান, সামিনা লুৎফা, সুমাইয়া খায়ের, সুব্রত চৌধুরী, তবারক হোসেন, স্বপন আদনান, তাসনিম সিরাজ মাহবুব, রোবায়েত ফেরদৌস, জোবাইদা নাসরীন, মনিন্দ্র কুমার নাথ, পাভেল পার্থ, সালেহ আহমেদ, পারভেজ হাসেম, রেজাউল করিম চৌধুরী, শাহ ই মবিন জিননাহ, জাকির হোসেন, সাইদুর রহমান, সাঈদ আহমেদ, দীপায়ন খীসা, জবা তালুকদার, ঈশিতা দস্তগীর, মেইনথিন প্রমীলা ও হানা শামস আহমেদ।


