
বাংলাদেশে লবণ উৎপাদন ২০২৪–২৫ মৌসুমে অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে নতুন ইতিহাস গড়েছে। এবারের মৌসুমে দেশে মোট প্রায় ২৪ লাখ ৩৭ হাজার ৮৯০ মেট্রিক টন লবণ উৎপাদিত হয়েছে, যা স্বাধীনতার পর থেকে সর্বোচ্চ। তবে উৎপাদনের এই সাফল্যের মাঝেও বাজারমূল্য, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও নীতিগত চ্যালেঞ্জে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন প্রান্তিক চাষিরা।
সরকারি ও সংশ্লিষ্ট সূত্র অনুযায়ী, এবারের মৌসুমে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছিল প্রায় ২৬ দশমিক ১০ লাখ মেট্রিক টন। বাস্তবে উৎপাদন হয়েছে প্রায় ২৪.৩৮ লাখ মেট্রিক টন। দেশে লবণের বার্ষিক চাহিদা সাধারণত ২২ থেকে ২৫.৫০ লাখ মেট্রিক টনের মধ্যে ওঠানামা করে।
বর্তমানে প্রায় ৬৯,১৯৮ একর জমিতে লবণ চাষ হচ্ছে এবং সরাসরি এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত আছেন প্রায় ৪২,০০০ চাষি। উৎপাদনের বড় অংশ আসে উপকূলীয় অঞ্চলের লবণ মাঠ থেকে।
বাংলাদেশের লবণ শিল্প মূলত উপকূলভিত্তিক। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হলো কক্সবাজার অঞ্চল। বিশেষ করে টেকনাফ, মহেশখালী, কুতুবদিয়া, পেকুয়া, চকরিয়া ও সদর উপজেলায় দেশের সিংহভাগ লবণ উৎপাদিত হয়।
এছাড়া চট্টগ্রাম জেলার বাঁশখালী, আনোয়ারা ও পটিয়া এলাকায়ও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ লবণ উৎপাদন হয়। সাম্প্রতিক সময়ে খুলনা ও সাতক্ষীরা অঞ্চলেও পরীক্ষামূলকভাবে লবণ চাষ শুরু হয়েছে।
দেশে মূলত দুই ধরনের পদ্ধতিতে লবণ উৎপাদন করা হয়—
পলিথিন পদ্ধতি: আধুনিক এই পদ্ধতিতে মাঠে পলিথিন বিছিয়ে সাগরের লোনা পানি শুকিয়ে লবণ তৈরি করা হয়। এতে উৎপাদন প্রায় ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত বেশি হয়।
সনাতন পদ্ধতি: মাটির ওপর সরাসরি পানি জমিয়ে লবণ উৎপাদন করা হয়, তবে এতে উৎপাদন ও গুণগত মান তুলনামূলক কম।
বাংলাদেশে লবণ উৎপাদনের মৌসুম সাধারণত নভেম্বর থেকে মে মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত চলে। উৎপাদিত লবণের প্রায় অর্ধেক শিল্প-কারখানায় ব্যবহৃত হয়, বিশেষ করে চামড়া ও রাসায়নিক শিল্পে। বাকি অংশ খাদ্য ও পশুখাদ্যে ব্যবহৃত হয়।
লবণ শিল্পের নীতিগত তদারকি ও নিয়ন্ত্রণ করে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক)। শিল্পটির অর্থনৈতিক অবদান বছরে প্রায় ২,৫০০ থেকে ৩,০০০ কোটি টাকা।
উৎপাদনে রেকর্ড অর্জনের পরও লবণ শিল্প নানা সংকটে রয়েছে। ঘূর্ণিঝড়, ভারী বৃষ্টি ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে প্রতি বছরই উৎপাদন ব্যাহত হয়। একইসঙ্গে বাজারে ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় চাষিরা উৎপাদন খরচও তুলতে পারছেন না।
প্রান্তিক চাষিদের অভিযোগ, মাঠ পর্যায়ে লবণের দাম অনেক সময় উৎপাদন খরচের চেয়েও কমে নেমে যায়। ফলে ধারদেনা ও লোকসানের চাপ বাড়ছে। এছাড়া শিল্প লবণের নামে বিদেশি আমদানি দেশি উৎপাদনের ওপর প্রতিযোগিতার চাপ তৈরি করছে বলে দাবি করছেন সংশ্লিষ্টরা।
উৎপাদনে সাফল্য থাকলেও বাংলাদেশের লবণ শিল্প এখন এক জটিল অবস্থার মধ্যে রয়েছে—একদিকে রেকর্ড উৎপাদন, অন্যদিকে প্রান্তিক চাষিদের অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা। ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা ও প্রাকৃতিক ঝুঁকি মোকাবিলা করতে না পারলে এই ‘সাদা সোনা’ শিল্প দীর্ঘমেয়াদে চাপে পড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।