ঢাকাবুধবার , ১ এপ্রিল ২০২৬
  • অন্যান্য

আজকের সর্বশেষ সবখবর

তেলের সংকট মোকাবিলায় কোন দেশ কী পদক্ষেপ নিচ্ছে

নিজস্ব প্রতিবেদক
এপ্রিল ১, ২০২৬ ১২:০৩ অপরাহ্ণ । ২২ জন

বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের সংকট নতুন কোনো বিষয় নয়, তবে সাম্প্রতিক ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং সরবরাহ ব্যবস্থার বিঘ্ন পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ রুটে অনিশ্চয়তা দেখা দেওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম দ্রুত বেড়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে অর্থনীতি, শিল্প, পরিবহন ও সাধারণ মানুষের জীবনে। এমন পরিস্থিতিতে বিভিন্ন দেশ তাদের নিজস্ব সক্ষমতা ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা অনুযায়ী জ্বালানি সাশ্রয়, রেশনিং, কর কমানো কিংবা বিকল্প ব্যবস্থার মাধ্যমে সংকট মোকাবিলার চেষ্টা করছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, জ্বালানির দাম বাড়লে এর প্রভাব ধীরে ধীরে পুরো অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়ে। পরিবহন ব্যয় বাড়ার ফলে নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি পায়, শিল্প ও কৃষি খাতে উৎপাদন ব্যয় বাড়ে, এবং সামগ্রিকভাবে মুদ্রাস্ফীতির চাপ তৈরি হয়। আমদানিনির্ভর অর্থনীতিতে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়ে এবং বাজেট ঘাটতির ঝুঁকি তৈরি হয়। সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষ।

এমন পরিস্থিতিতে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সাশ্রয়ে বিভিন্ন দেশ নানা ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছে। যুক্তরাজ্যে পেট্রলের দাম ১৮ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চে পৌঁছেছে। সরকার নিম্ন আয়ের পরিবারকে সহায়তায় বিশেষ আর্থিক প্যাকেজ বাস্তবায়ন করছে।

বিশ্বের বৃহত্তম তেল আমদানিকারক দেশ চীন ইতোমধ্যে বিপুল মজুত গড়ে তুলেছে এবং দেশের বাজার নিয়ন্ত্রণে তেলজাত পণ্য রপ্তানি সীমিত করেছে। ভারত জানিয়েছে, আগামী ৬০ দিনের জন্য জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়েছে এবং পরিস্থিতি নিয়ে আতঙ্কিত না হতে জনগণকে আহ্বান জানানো হয়েছে।

ইউরোপের আয়ারল্যান্ড জ্বালানির ওপর কর কমিয়েছে, যাতে ভোক্তাদের ওপর চাপ কমে। অস্ট্রেলিয়া গণপরিবহন ব্যবহারে উৎসাহ দিতে বিভিন্ন রাজ্যে ভাড়া মওকুফ করেছে।

মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের প্রভাবে মিসর দোকান ও রেস্তোরাঁর সময়সীমা কমিয়েছে এবং বিদ্যুৎ ব্যবহারে কড়াকড়ি আরোপ করেছে। ফিলিপাইনস জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে জাতীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে।

অন্যদিকে, শ্রীলঙ্কা জ্বালানি রেশনিং চালু করেছে এবং থাইল্যান্ড বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবহারে সীমাবদ্ধতা দিয়েছে। ভিয়েতনাম মানুষকে কম গাড়ি ব্যবহার এবং গণপরিবহন ব্যবহারে উৎসাহিত করছে।

ইউরোপের স্লোভেনিয়া জ্বালানি রেশনিং চালু করেছে। আফ্রিকার দক্ষিণ সুদান-এ বিদ্যুৎ সরবরাহে রেশনিং চলছে, আর ইথিওপিয়া জ্বালানি সরবরাহে অগ্রাধিকার নির্ধারণ করেছে।

এছাড়া মিয়ানমার জ্বালানি ব্যবহারে কড়াকড়ি আরোপ করেছে এবং ফিলিপাইনস মজুত বাড়ানোর পরিকল্পনা নিয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালির সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা আরও বাড়তে পারে, যার প্রভাব পড়বে অর্থনীতি, পরিবহন এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর।

সব মিলিয়ে জ্বালানি তেলের সংকট এখন আর শুধু একটি অর্থনৈতিক সমস্যা নয়, এটি বৈশ্বিক স্থিতিশীলতা ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। প্রতিটি দেশই নিজ নিজ সক্ষমতা অনুযায়ী এই সংকট মোকাবিলার চেষ্টা করছে—কোথাও রেশনিং, কোথাও ভর্তুকি, আবার কোথাও ব্যবহার কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তবে পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে এর প্রভাব আরও ব্যাপক হতে পারে। তাই টেকসই জ্বালানি নীতি, বিকল্প শক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করাই হতে পারে এই সংকট থেকে উত্তরণের মূল পথ।