তরুণ ধূমপায়ীদের উপর তামাক কর বৃদ্ধির প্রভাব বিশ্লেষণ করে পরিচালিত এক সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, ৩৭.৩৪% তরুণ ধূমপায়ী ধূমপান কমিয়েছে। সিংহভাগ তরুণই ধূমপান কমায়নি বরং তাদের বড় অংশ কম দামের নতুন ব্র্যান্ডে স্থানান্তরিত হয়েছে। মূল্যস্ফীতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে তামাক কর বৃদ্ধি না করায় এর সুফল মাঠপর্যায় থেকে প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যাচ্ছেনা। গবেষণাটির ফলাফল প্রকাশের জন্য আজ বিকাল ৩ টায় ডাব্লিউবিবি ট্রাস্টের কৈবর্ত সভাকক্ষে বাংলাদেশ তামাক বিরোধী জোট (বাটা), বাংলাদেশ নেটওয়ার্ক ফর টোব্যাকো ট্যাক্স পলিসি (বিএনটিটিপি), পাবলিক হেলথ২৪.কম ও ডাব্লিউবিবি ট্রাস্ট যৌথভাবে একটি সভা আয়োজন করে।
২০০৬-০৭ অর্থবছরে নিম্ন মূল্যস্তরের সিগারেট বাজারে আসলেও অন্য মূল্যস্তরের তুলনায় এর করভার ছিলো অনেক কম। দীর্ঘ ১৯ বছর পর, বাংলাদেশ সরকার ২০২৪-২৫ অর্থবছরের মাঝামাঝি সময়ে সকল মূল্যস্তরের সিগারেটের ওপর সমানভাবে ৬৭% সম্পূরক শুল্ক আরোপ করে। এই উদ্যোগটি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় (MoHFW)-এর জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার লক্ষ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। একইসঙ্গে জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ সেল এর তামাক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমকেও তরান্বিত করার কথা। তবে মাঠপর্যায়ের তথ্য বলছে, মূল্যস্ফীতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে কর বৃদ্ধি না করায় তামাক নিয়ন্ত্রণে কাঙ্ক্ষিত সুফল অর্জিত হয়নি। এই বিষয়টিকে গুরুত্বারোপ করে কর বৃদ্ধির পরবর্তীতে তরুণ ধূমপায়ীদের মধ্যে আচরণগত পরিবর্তন এবং ব্র্যান্ড পরিবর্তনের চিত্র নিরুপণের জন্য দেশের ৮টি বিভাগীয় জেলা থেকে ১৮-৩০ বছর বয়সী ৩৯১ জন তরুণ ধূমপায়ীর উপর একটি গবেষণা পরিচালনা করা হয়।
গবেষণায় উঠে এসেছে যে, সিগারেটের কর/মূল্য বৃদ্ধি সত্ত্বেও মাত্র ৩৭.৩৪% তরুণ ধূমপায়ী তাদের ধূমপানের পরিমাণ কমিয়েছে, বিপরীতে ৫৯.০৮% ধূমপায়ী ধূমপানের মাত্রা অপরিবর্তিত রেখেছে। মূল্য বৃদ্ধির পরও একাধিক স্তর থাকায় ধূমপায়ীদের বড় একটি অংশ বিকল্প কৌশল হিসেবে সাশ্রয়ী মূল্যের সিগারেট বা নতুন ব্র্যান্ডে ঝুঁকেছে। ৭৮.৭৭ শতাংশ ধূমপায়ী নতুন বা কম দামের ব্র্যান্ড ব্যবহার করেছে, ২৮.৩৯% সরাসরি ব্র্যান্ড পরিবর্তন করেছে এবং প্রায় ৬৭% অন্তত কিছু পরিমাণে নতুন ব্র্যান্ড গ্রহণ করেছে। একইসঙ্গে ১৮.৬৭% ধূমপায়ী অন্য প্রয়োজনীয় খাতের ব্যয় সংকুচিত করে সিগারেট ক্রয় অব্যাহত রেখেছে, যা একটি উদ্বেগজনক সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রবণতার চিত্র বহন করে।
উল্লেখ্য যেসকল তরুণ ধূমপায়ী সিগারেটকে “অনেক বেশি দামি” হিসেবে উপলব্ধি করেছে, তাদের মধ্যে ৪৬.৪% ধূমপান কমানোর প্রবণতা দেখিয়েছে, অর্থাৎ মূল্য বৃদ্ধির উপলব্ধি আচরণগত পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিশেষভাবে লক্ষণীয় যে, নিম্ন আয়ের অর্থাৎ ৫০০০ টাকা বা এর কম আয়ের ধূমপায়ীদের মধ্যে ধূমপান কমানোর সম্ভাবনা তুলনামূলকভাবে বেশি। অপরদিকে যাদের আয় ২৫,০০০-৩০,০০০ টাকা বা পেশাজীবনে চ্যালেন্জিং সময় পার করছেন তাদের মধ্যে ধূমপান কমানোর সম্ভাবনা তুলনামূলকভাবে বেশি- ৩৮.৫%। যা নির্দেশ করে যে নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠী মূল্য বৃদ্ধির প্রতি অধিক প্রতিক্রিয়াশীল। গবেষণা বলছে, ব্যক্তিপর্যায়ে মূল্য বৃদ্ধির বিষয়ে উপলব্ধি যত বেশি, ধূমপান কমানোর সম্ভাবনা ততই বেশি। নিম্ন আয়ের তরুণরা তুলনামূলকভাবে বেশি মূল্য সংবেদনশীল; অর্থাৎ তাদের মধ্যে ধূমপান কমানোর প্রবণতা বেশি দেখা গেছে।
মূল্য বৃদ্ধি সত্ত্বেও অধিকাংশ তরুণ ধূমপায়ী ধূমপান বন্ধ না করে কম দামের ব্র্যান্ডে স্থানান্তরিত হয়েছে। এছাড়া অনেক তরুণ ধূমপায়ী কর বৃদ্ধি পরবর্তী সময়ে ধূমপানের অভ্যাস অপরিবর্তিত রাখতে তাদের নিত্যপ্রয়োজনীয় খাতের ব্যয় কমিয়ে ধূমপান চালিয়ে যাচ্ছে। এটি জনস্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তার জন্য দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকিপূর্ণ।
পাশাপাশি ফোকাস গ্রুপ ডিসকাশনের (FGD) মাধ্যমে তরুণ ধূমপায়ীদের আচরণ, সামাজিক প্রভাব ও মানসিক দৃষ্টিভঙ্গি আচরণগত ও সামাজিক দিক বিশ্লেষণ করা হয়। এতে দেখা গেছে, অংশগ্রহণকারীদের অধিকাংশই ৬৭% সম্পূরক শুল্ক সম্পর্কে সচেতন হলেও সাধারণ যুবসমাজের মধ্যে ধূমপান কমানোর ব্যাপারে পূর্ণ সচেতনতা নেই। অনেকেই ধূমপান কমিয়েছে, তবে বেশিরভাগই বিকল্প কৌশল যেমন কম দামের ব্র্যান্ড বা বন্ধুদের সঙ্গে শেয়ারিং করে ধূমপান অব্যাহত রেখেছে। এছাড়া অংশগ্রহণকারীরা মনে করেন শুধুমাত্র মূল্য বৃদ্ধি যথেষ্ট নয়; স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি ও নতুন ব্র্যান্ড নিয়ন্ত্রণ জরুরি।
গবেষণাটি ইঙ্গিত করে যে, তামাক নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘমেয়াদে সুফল পেতে একটি শক্তিশালী ও প্রমাণভিত্তিক তামাক কর নীতি গ্রহণ করার পাশাপাশি নিয়মিত মূল্যস্ফিতি বিবেচনায় নিয়ে করভার সমন্বয় করার কোনো বিকল্প নেই। এছাড়া সরকার নির্ধারিত মূল্যস্তরভিত্তিক সিগারেটের বাইরে অন্য কোনো ব্র্যান্ড বাজারে যাতে না আসে তার জন্য বাজার মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করা জরুরি।


