ঢাকাশনিবার , ২৭ জুন ২০২৬
  1. সর্বশেষ
  2. লাইফস্টাইল

ডিজিটাল পুলিশ রাষ্ট্র: বাংলাদেশে সাইবার নজরদারি

প্রতিবেদক
Ibrahim Khalil
১৫ অগাস্ট ২০২৫, ৩:৪৯ বিকাল

Link Copied!

শহরের ব্যস্ততম এক মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে একজন তরুণ। হাতে একটি স্মার্টফোন, কানেকশন ফুল সিগনালে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বন্ধুদের সাথে আলাপ চলছে, কিন্তু তিনি জানেন না, তার পাঠানো প্রতিটি বার্তা, করা প্রতিটি কল, এমনকি কোন ওয়েবসাইটে তিনি প্রবেশ করছেন—সবকিছু নীরবে কোথাও রেকর্ড হয়ে যাচ্ছে। মোবাইল স্ক্রিনের ওপাশে, দৃশ্যত অদৃশ্য কিছু প্রযুক্তি তার প্রতিটি পদক্ষেপ নোট করছে, যেন এক অদৃশ্য ছায়া সারাক্ষণ তাকে অনুসরণ করছে। এই গল্প কেবল একজনের নয়—এটি আধুনিক বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি সংযুক্ত নাগরিকের দৈনন্দিন বাস্তবতা, যেখানে সাইবার নজরদারি ধীরে ধীরে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হয়ে উঠেছে।

দুই দশক আগেও বাংলাদেশে নজরদারি মানে ছিল রাজনৈতিক সমাবেশে সাদা পোশাকের গোয়েন্দা, চিঠিপত্র গোপনে খোলা, কিংবা ল্যান্ডলাইনের ট্যাপিং। কিন্তু সময় বদলেছে। সন্ত্রাস দমন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও প্রযুক্তির বিস্তারের অজুহাতে এই নজরদারি এখন রূপ নিয়েছে এক জটিল ডিজিটাল নেটওয়ার্কে। এখানে রয়েছে বাস্তবসময়ে যোগাযোগ আটকানোর ক্ষমতা, ইন্টারনেট ডেটা বিশ্লেষণ, সামাজিক মাধ্যম পর্যবেক্ষণ, এমনকি কারও ব্যক্তিগত ডিভাইসে অনধিকার প্রবেশ করে সমস্ত তথ্য সংগ্রহের সামর্থ্য।

এই পরিবর্তনের গতি বেড়ে যায় দুটি বড় ঘটনার পর। আন্তর্জাতিকভাবে ২০০১ সালের ৯/১১ হামলা সন্ত্রাসবিরোধী নজরদারির বৈশ্বিক কাঠামোকে শক্তিশালী করে তোলে। আর বাংলাদেশে ২০১৬ সালের হলি আর্টিজান বেকারি হামলা নিরাপত্তা ব্যবস্থায় সাইবার প্রযুক্তির প্রসারকে অভূতপূর্ব গতি দেয়। তখন সন্ত্রাসবিরোধী লড়াইয়ের যৌক্তিকতা তুলে ধরে নানা আন্তর্জাতিক সংস্থা ও কোম্পানির কাছ থেকে প্রযুক্তি কেনা শুরু হয়। কিন্তু ধীরে ধীরে এই সরঞ্জাম ও সফটওয়্যারগুলো কেবল জঙ্গি তৎপরতা নজরদারির জন্যই নয়, বরং রাজনৈতিক বিরোধী, সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী ও সাধারণ নাগরিকদের পর্যবেক্ষণেও ব্যবহৃত হতে থাকে।

তদন্তে দেখা গেছে, ২০১৫ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে বাংলাদেশে প্রায় ১৬০ ধরনের নজরদারি প্রযুক্তি ও স্পাইওয়্যার আমদানি বা স্থাপন করা হয়েছে, যার মোট খরচ প্রায় ১৯০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর মধ্যে প্রায় ৪৩ মিলিয়ন ডলারের প্রযুক্তি এসেছে ইসরায়েলি উৎস থেকে, যদিও বাংলাদেশ ও ইসরায়েলের মধ্যে কোনো কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই। এই আমদানি তৃতীয় দেশ—যেমন সিঙ্গাপুর, সাইপ্রাস বা হাঙ্গেরি—মাধ্যমে সম্পন্ন হয়েছে, যাতে রাজনৈতিক জটিলতা এড়ানো যায়। এই ক্রয় প্রক্রিয়া সাধারণ মানুষের কাছে অদৃশ্য থেকে গেছে, কারণ এখানে সরকারি টেন্ডার বা সংসদীয় অনুমোদনের বদলে অনেক সময় ব্যবহার করা হয়েছে সরাসরি গোপন চুক্তি।

বাংলাদেশের গোয়েন্দা কাঠামো এই প্রযুক্তির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। স্পেশাল ব্রাঞ্চ (SB), ন্যাশনাল সিকিউরিটি ইন্টেলিজেন্স (NSI) এবং ডিরেক্টরেট জেনারেল অব ফোর্সেস ইন্টেলিজেন্স (DGFI) দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষণে সক্রিয়। কিন্তু ডিজিটাল যুগে তাদের কার্যক্রমে যুক্ত হয়েছে ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টার (NTMC), যা দেশের প্রায় সব মোবাইল ও ইন্টারনেট যোগাযোগের উপর নজরদারি চালাতে সক্ষম। এই সংস্থার মূল শক্তি হল এর উন্নতমানের ইন্টারসেপশন সিস্টেম, যা যেকোনো ফোনকল, মেসেজ, ইমেইল কিংবা অনলাইন চ্যাট বাস্তবসময়ে আটকাতে ও সংরক্ষণ করতে পারে।

প্রযুক্তির মধ্যে রয়েছে IMSI ক্যাচার, যা ভুয়া মোবাইল টাওয়ার তৈরি করে ফোন ব্যবহারকারীর অবস্থান ও তথ্য সংগ্রহ করে; উন্নত স্পাইওয়্যার যেমন Pegasus ও FinFisher, যা একটি স্মার্টফোনের মাইক্রোফোন ও ক্যামেরা দূর থেকে চালু করতে পারে; সোশ্যাল মিডিয়া মনিটরিং সিস্টেম, যা একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের সব পোস্ট ও বার্তা বিশ্লেষণ করতে সক্ষম; এবং ওয়েব ফিল্টারিং টুল, যা কর্তৃপক্ষকে যে কোনো ওয়েবসাইট ব্লক করতে দেয়। ড্রোনের মাধ্যমে আকাশ থেকে নজরদারি, এমনকি লেজার প্রযুক্তি ব্যবহার করে দূর থেকে কক্ষে আড়িপাতার ঘটনাও এখন আর বিরল নয়।

এত বিশাল পরিসরে নজরদারি কার্যক্রম চালানোর জন্য একটি শক্তিশালী আইনি কাঠামো থাকা জরুরি, কিন্তু বাংলাদেশে সেই কাঠামো অসম্পূর্ণ। সংবিধানের ৩৯ ও ৪৩ অনুচ্ছেদে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অধিকার স্বীকৃত হলেও, জাতীয় নিরাপত্তা ও জনশৃঙ্খলার অজুহাতে এগুলো সীমিত করার সুযোগ রাখা হয়েছে। বাংলাদেশের টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ আইন, টেলিগ্রাফ আইন এবং ওয়্যারলেস টেলিগ্রাফি আইন সরকারকে বিস্তৃত ক্ষমতা দিয়েছে, কিন্তু এখানে বিচার বিভাগীয় অনুমোদনের বাধ্যবাধকতা স্পষ্ট নয়। ফলে অনেক নজরদারি কার্যক্রম আদালতের অনুমতি ছাড়াই পরিচালিত হয়, যা স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রশ্নবিদ্ধ করে।

এই বাস্তবতার সবচেয়ে গুরুতর প্রভাব পড়েছে মানবাধিকারে। সাংবাদিকরা এখন অনলাইন যোগাযোগে সাবধানী হয়ে উঠছেন, বিরোধী রাজনৈতিক কর্মীরা খোলাখুলি আলোচনা এড়িয়ে যাচ্ছেন, এবং সাধারণ নাগরিকরা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে আত্মনিয়ন্ত্রণে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছেন। সাইবার নিরাপত্তা আইন ও ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ব্যবহার করে গ্রেফতার ও হয়রানির ঘটনা বেড়েছে, যা সরকারের সমালোচনাকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। নির্বাচনী সময়গুলোতে নজরদারি কার্যক্রম আরও তীব্র হয়—প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের অনলাইন কার্যকলাপ নজরে রাখা হয়, কখনো কখনো ব্ল্যাকআউট বা আংশিক ইন্টারনেট শাটডাউনও ঘটে।

তবে সবকিছু নেতিবাচক নয়। সঠিকভাবে ব্যবহৃত হলে উন্নত সাইবার নজরদারি অপরাধ ও সন্ত্রাস প্রতিরোধে কার্যকর হতে পারে। সমস্যাটা দেখা দেয় যখন এই প্রযুক্তি রাজনৈতিক ক্ষমতা সুসংহত করার হাতিয়ার হয়ে ওঠে, আর নাগরিকের গোপনীয়তা ও অধিকার রক্ষার জন্য কোনো নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা থাকে না। বাংলাদেশে এখনো এমন কোনো সংসদীয় কমিটি বা স্বাধীন সংস্থা নেই, যা এই নজরদারি ব্যবস্থার ব্যবহার ও অপব্যবহার পর্যবেক্ষণ করে নিয়মিত রিপোর্ট প্রকাশ করে।

আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ নজরদারি প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণহীন বাজারের অংশ। অনেক উন্নত দেশ এখন সাইবার নজরদারি সফটওয়্যার রপ্তানিতে মানবাধিকার বিবেচনা করছে, কিন্তু সেই বিধিনিষেধ সবসময় কার্যকর হয় না। এর ফলে, Pegasus বা Predator-এর মতো উচ্চঝুঁকিপূর্ণ সফটওয়্যার তৃতীয় দেশের মাধ্যমে বাংলাদেশে পৌঁছায়। এতে প্রযুক্তি সরবরাহকারীর দায়িত্ব ও ক্রেতা দেশের স্বচ্ছতা—দুটোই অনুপস্থিত থেকে যায়।

সামনে এগোতে হলে জরুরি কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রথমত, নজরদারির জন্য একটি স্বচ্ছ ও কঠোর আইনি কাঠামো প্রণয়ন করতে হবে, যেখানে প্রতিটি ক্ষেত্রে বিচার বিভাগীয় অনুমতি বাধ্যতামূলক হবে। দ্বিতীয়ত, একটি স্বাধীন পর্যবেক্ষণ সংস্থা গঠন করতে হবে, যা সংসদের কাছে দায়বদ্ধ থাকবে এবং বার্ষিক স্বচ্ছতা প্রতিবেদন প্রকাশ করবে। তৃতীয়ত, ব্যক্তিগত ডেটা সুরক্ষার জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ আইন প্রণয়ন জরুরি, যাতে নাগরিকের গোপনীয়তা রাষ্ট্রীয় নজরদারি থেকেও সুরক্ষিত থাকে।

এই মুহূর্তে বাংলাদেশ এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে প্রযুক্তি হয়তো তাকে নিরাপত্তা ও উন্নতির পথে এগিয়ে নিতে পারে, আবার একই প্রযুক্তি ভুল ব্যবহারে ব্যক্তিস্বাধীনতা ও গণতন্ত্রকে সংকুচিত করে ফেলতে পারে। তরুণটির হাতে থাকা স্মার্টফোনে যে বার্তা লেখা হচ্ছে, তা কেবল তার বন্ধুর কাছে নয়—আরও অনেক অদৃশ্য চোখের কাছেও পৌঁছাচ্ছে। প্রশ্ন হল, এই অদৃশ্য চোখগুলো কাদের জন্য কাজ করছে—জনগণের নিরাপত্তার জন্য, নাকি ক্ষমতার স্থায়িত্বের জন্য? এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের ডিজিটাল ভবিষ্যতের প্রকৃতি।

Facebook Comments Box

আরও পড়ুন

ভেনেজুয়েলায় ভয়াবহ ভূমিকম্প, দুর্যোগ এলাকা ঘোষণা

Upay-foodpanda partnership to simplify transactions

মোহাম্মদপুরে মোটরসাইকেলের ধাক্কায় প্রাণ গেল নিরাপত্তাকর্মীর

এক দিনের ব্যবধানে আবারও কমলো স্বর্ণের দাম

২৮ জুন ভিটামিন এ প্লাস ক্যাম্পেইন, ক্যাপসুল পাবে ২ কোটি ৪০ লাখ শিশু

শেরপুরে মাইক্রোবাস-সিএনজি সংঘর্ষে ডিবির ৮ পুলিশ সদস্য আহত

ভেনেজুয়েলায় জোড়া ভূমিকম্পের পর কাঁপল জাপান

গৌরীপুরে বিজয় এক্সপ্রেসের ৩ বগি লাইনচ্যুত

নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতে মানসম্পন্ন গবেষণার আহ্বান কৃষিমন্ত্রীর

৩৯ সেকেন্ডে দুই ভূমিকম্প, কাঁপল ভেনেজুয়েলা ও জাপান

তিন দশকের আস্থার নাম চট্টগ্রাম মেইল, নেই কোনো সাপ্তাহিক ছুটি

দেশের ১১ অঞ্চলে ঝড়-বজ্রবৃষ্টির পূর্বাভাস