ঢাকাশুক্রবার , ১৬ জানুয়ারি ২০২৬

জলবায়ু সুরক্ষায় বিশ্বজুড়ে ৫টি ইতিবাচক খবর

বিপ্লব হোসাইন
জানুয়ারি ১৬, ২০২৬ ৮:১৭ পূর্বাহ্ণ । ২২৬ জন

বর্তমানে বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব যখন ক্রমশ প্রকট হচ্ছে, তখন ক্যালিফোর্নিয়ার দাবানল কিংবা আন্তর্জাতিক জলবায়ু চুক্তি থেকে শক্তিশালী দেশগুলোর সরে দাঁড়ানোর মতো সংবাদ আমাদের শঙ্কিত করে তোলে। তবে এই হতাশার মেঘের আড়ালেও ২০২৬ সালের শুরুটা পৃথিবীর জন্য বয়ে এনেছে বেশ কিছু আশাব্যঞ্জক বার্তা। থাইল্যান্ডের বর্জ্য আমদানি নিষিদ্ধ করা থেকে শুরু করে নরওয়ের বৈদ্যুতিক গাড়ির বিপ্লব কিংবা যুক্তরাজ্যের রেকর্ড পরিমাণ নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার-প্রমাণ করে যে পরিবেশ রক্ষায় বিশ্বব্যাপী নীতিগত পরিবর্তন শুরু হয়েছে। টেকসই ভবিষ্যৎ গড়ার পথে গত এক মাসে ঘটে যাওয়া এমনই ৫টি ইতিবাচক ও অনুপ্রেরণামূলক জলবায়ু সংবাদ এখানে তুলে ধরা হলো।

১. প্লাস্টিক বর্জ্য আমদানিতে থাইল্যান্ডের নিষেধাজ্ঞা
‘বর্জ্য উপনিবেশবাদের’ (Waste Colonialism) অবসান ঘটাতে বড় পদক্ষেপ নিয়েছে থাইল্যান্ড। উন্নত দেশগুলো থেকে প্লাস্টিক বর্জ্য আমদানি পুরোপুরি নিষিদ্ধ করেছে দেশটি। ২০১৮ সালে চীন এই নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার পর থাইল্যান্ড পশ্চিমা দেশগুলোর বর্জ্যের প্রধান গন্তব্য হয়ে উঠেছিল। আমদানিকৃত এই প্লাস্টিক পুনর্ব্যবহারের বদলে পুড়িয়ে ফেলায় স্থানীয় পরিবেশ ও স্বাস্থ্যের মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছিল। থাইল্যান্ডের এই সিদ্ধান্ত বিশ্বব্যাপী প্লাস্টিক চুক্তি (INC-5) বাস্তবায়নে ধনী দেশগুলোর ওপর নতুন করে চাপ সৃষ্টি করবে।

২. বৈদ্যুতিক গাড়ির বিপ্লবে বিশ্বসেরা নরওয়ে
বৈদ্যুতিক গাড়ি (EV) ব্যবহারে অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছে নরওয়ে। ২০২৪ সালের হিসাব অনুযায়ী, দেশটিতে বিক্রি হওয়া মোট গাড়ির ৮৮.৯% ছিল বৈদ্যুতিক। যেখানে যুক্তরাজ্যে এই হার ১৯.৬% এবং যুক্তরাষ্ট্রে মাত্র ৮%। নব্বইয়ের দশক থেকে পেট্রোল-ডিজেল গাড়িতে উচ্চ কর এবং বৈদ্যুতিক গাড়িতে কর ছাড় ও বিনামূল্যে পার্কিংয়ের মতো সুযোগ সুবিধা দিয়ে নরওয়ে এই বিপ্লব ঘটিয়েছে। ২০৩৫ সালের মধ্যে ইইউ ও যুক্তরাজ্য নতুন জীবাশ্ম জ্বালানিচালিত গাড়ি নিষিদ্ধ করার যে লক্ষ্য নিয়েছে, তার জন্য নরওয়ে এখন একটি সফল মডেল।

৩. আয়ারল্যান্ডে নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পে আদালতের সবুজ সংকেত
আয়ারল্যান্ডের হাইকোর্ট সম্প্রতি কর্কে একটি বায়ু বিদ্যুৎ কেন্দ্র (Wind Farm) নির্মাণের পক্ষে রায় দিয়েছে। ইইউ এবং আইরিশ জলবায়ু আইনের ওপর ভিত্তি করে আদালত জানিয়েছে, গ্রহের অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থে ‘স্বাভাবিক ব্যবসা’ (Business as usual) বন্ধ করা জরুরি। এই রায় আইনি নজির হিসেবে ভবিষ্যতে বিমান চলাচল, শিপিং এবং ইস্পাত শিল্পের মতো উচ্চ-নির্গমনকারী খাতগুলোকে কম কার্বন প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করতে বাধ্য করবে।

৪. যুক্তরাজ্যের ইতিহাসে রেকর্ড পরিমাণ ‘পরিষ্কার’ বিদ্যুৎ
২০২৪ সালে যুক্তরাজ্য তাদের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি পরিষ্কার বিদ্যুৎ উৎপাদন করেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, দেশটির মোট বিদ্যুতের মাত্র ২৯% এসেছে জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে, যা এ যাবৎকালের সর্বনিম্ন। বিপরীতে, নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে এসেছে রেকর্ড ৪৫% এবং পারমাণবিক উৎস থেকে ১৩%। গত বছর যুক্তরাজ্যের শেষ কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি বন্ধ হওয়া এই সাফল্যের পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে। ২০৩০ সালের মধ্যে বিদ্যুৎ খাতকে সম্পূর্ণ কার্বনমুক্ত করার লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে এটি একটি বড় মাইলফলক।

৫. দক্ষিণ কোরিয়ার জৈববস্তুপুঞ্জ (Biomass) ভর্তুকি কমানোর সিদ্ধান্ত
বন উজাড় এবং কার্বন নির্গমনের দায়ে সমালোচিত জৈববস্তুপুঞ্জ বা বায়োমাস শক্তিতে ভর্তুকি কমানোর ঘোষণা দিয়েছে দক্ষিণ কোরিয়া। এতদিন কাঠের গুঁড়ো বা খোসা পুড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনকে ‘সবুজ শক্তি’ বলা হলেও, এর জন্য আমদানিকৃত কাঠের ওপর নির্ভরতা বন উজাড় বাড়িয়ে দিচ্ছিল। নতুন নীতি অনুযায়ী, ২০২৫ থেকে ২০৪০ সালের মধ্যে পর্যায়ক্রমে এই ভর্তুকি বন্ধ করা হবে এবং নতুন কোনো বায়োমাস বিদ্যুৎ কেন্দ্রকে সমর্থন দেওয়া হবে না।

বিশ্বের বড় বড় অর্থনীতির দেশগুলোর এই ইতিবাচক পরিবর্তনগুলো প্রমাণ করে যে, সঠিক নীতি এবং আইনি পদক্ষেপের মাধ্যমে জলবায়ু সংকট মোকাবিলা সম্ভব।