
খাদ্যপণ্যের মোড়কে স্বাস্থ্য সতর্কবাণী ও ফ্রন্ট-অফ-প্যাক লেবেলিং নিশ্চিত করার পাশাপাশি শিশুদের ছোটবেলা থেকেই খাদ্যের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে সচেতন করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন মাদারীপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য আনিসুর রহমান খোকন।
সোমবার (১৭ আগস্ট) রাজধানীর বাংলামটরে বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের ৬০৫ নম্বর কক্ষে ‘জনস্বাস্থ্য, ভোক্তা অধিকার রক্ষায় খাদ্যের মোড়কে স্বাস্থ্য সতর্কবাণী: ফ্রন্ট-অফ-প্যাক লেবেলিং বিধান নিশ্চিতে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা এবং করণীয়’ শীর্ষক সেমিনারে তিনি এসব কথা বলেন। সেন্টার ফর ল’ অ্যান্ড পলিসি এফেয়ার্স (সিএলপিএ), পাবলিক হেলথ ল’ইয়ার্স নেটওয়ার্ক ও সিটিজেন নেটওয়ার্ক-সিনেট যৌথভাবে এ সেমিনারের আয়োজন করে।

আনিসুর রহমান খোকন বলেন, প্রতিদিন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ চিকিৎসা সংক্রান্ত সহায়তার জন্য রাজনৈতিক নেতাদের কাছে ফোন করেন। কারও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক প্রয়োজন, কারও আইসিইউ বেড, আবার কারও বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার সামর্থ্য না থাকায় সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার ব্যবস্থা প্রয়োজন হয়। এসব অভিজ্ঞতা থেকে তিনি মনে করেন, শুধু হাসপাতাল ও চিকিৎসা ব্যবস্থা বাড়ালেই হবে না, মানুষ যাতে অসুস্থ হওয়ার আগেই প্রয়োজনীয় সচেতনতা তৈরি করতে পারে, সে ব্যবস্থাও জরুরি।
সংসদ সদস্য আনিসুর রহমান খোকন বলেন, গত ছয় মাসে শিশুদের বিভিন্ন রোগের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে যাওয়ার পর রোগ শনাক্ত হতে দেরি হওয়া এবং গুরুতর অবস্থায় চলে যাওয়ার অনেক ঘটনা তিনি দেখেছেন। অনেক ক্ষেত্রে বিভিন্ন রোগের উপসর্গ একসঙ্গে দেখা যাওয়ায় চিকিৎসকদেরও রোগ শনাক্ত করতে সময় লাগে। ফলে রোগ শনাক্ত হওয়ার আগেই কোনো কোনো শিশু লাইফ সাপোর্টে চলে যায় এবং অনেক শিশুর মৃত্যু হয়।
এ কারণে খাদ্যের গুণগত মান ও ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। তার মতে, সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও খাদ্যপণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিনিধিদের নিয়ে এ ধরনের আলোচনা করা প্রয়োজন। উৎপাদকদেরও বোঝাতে হবে, তাদের পণ্যের কারণে জনস্বাস্থ্যের কী ধরনের ক্ষতি হতে পারে।
শিশুদের সচেতন করার জন্য প্রাথমিক বিদ্যালয়কেও কাজে লাগানোর প্রস্তাব দেন আনিসুর রহমান খোকন। তিনি বলেন, দেশের প্রতিটি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে একজন করে শিক্ষককে খাদ্যের গুণগত মান ও ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেওয়া যেতে পারে। পরে ওই শিক্ষক সপ্তাহে অন্তত একদিন ১০ মিনিট করে শ্রেণিকক্ষে স্বাস্থ্য সচেতনতামূলক বক্তব্য দিলে শিশুরা ছোটবেলা থেকেই এ বিষয়ে ধারণা পাবে।
তার মতে, শিশুরা নিজেরা সচেতন হলে পরিবারেও এর প্রভাব পড়বে। একটি শিশু সচেতন হলে সে তার ছোট ভাই-বোনকেও ক্ষতিকর খাবার থেকে দূরে রাখতে পারে। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে সন্তানরা অভিভাবকদেরও সচেতন করতে পারে বলে নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন তিনি।
এ প্রসঙ্গে নিজের একটি অভিজ্ঞতা তুলে ধরে সংসদ সদস্য বলেন, একসময় তার সন্তানরা বিদেশি কোমল পানীয় বর্জনের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল এবং তাকেও তা না খাওয়ার জন্য বলেছিল। সন্তানের সচেতনতা তাকে ওই ধরনের পানীয় না খাওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে উদ্বুদ্ধ করে। তার মতে, শিশুদের সচেতনতা ভবিষ্যতে খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
তিনি বলেন, আজ যারা খাদ্যপণ্য উৎপাদন করছেন, ভোক্তারা সচেতন হয়ে এসব পণ্য কেনা কমিয়ে দিলে উৎপাদকরাও নিজেদের পণ্য সম্পর্কে সচেতন হতে বাধ্য হবেন। কোনো পণ্যের বিক্রি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেলে উৎপাদক প্রতিষ্ঠান মানুষের আস্থা ফেরাতে পণ্যের মান ও তথ্য উপস্থাপনের বিষয়ে গুরুত্ব দেবে।
খাদ্যপণ্যের ক্ষতিকর দিক নিয়ে যারা কাজ করছেন, তাদের সংসদে বিষয়টি তুলে ধরার আশ্বাসও দেন আনিসুর রহমান খোকন। তিনি বলেন, এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখবেন এবং প্রয়োজন হলে স্বাস্থ্য ও খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বৈঠকের ব্যবস্থা করতে সহযোগিতা করবেন।
আনিসুর রহমান খোকন বলেন, এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ একটি অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের আরও প্রতিনিধিত্ব থাকা প্রয়োজন ছিল। বিষয়টি ছোট পরিসরের হলেও এর গুরুত্ব অনেক বেশি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
খাদ্যপণ্য উৎপাদনকারীদের আইন মেনে চলার ওপরও গুরুত্ব দেন আনিসুর রহমান খোকন। তিনি বলেন, যেসব প্রতিষ্ঠানের পণ্যের কারণে জনস্বাস্থ্যের ক্ষতি হচ্ছে, তাদের আইনের আওতায় আনতে হবে এবং প্রয়োজন হলে জরিমানার ব্যবস্থা করতে হবে।
সেমিনারে সরকারের যুগ্ম সচিব, ঢাকা ডেন্টাল কলেজের সাবেক ভাইস প্রিন্সিপাল অধ্যাপক ডা. মো. শিব্বির আহমেদ ওসমানী, ঢাকা আহছানিয়া মিশনের স্বাস্থ্য ও পুষ্টি সেক্টরের পরিচালক ইকবাল মাসুদ, ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনের হেড অব প্রোগ্রাম ডা. সোহেল রেজা চৌধুরী, ডব্লিউবিবি ট্রাস্টের পরিচালক গাউস পিয়ারী এবং সিএলপিএর কনসালটেন্ট অধ্যাপক ড. আ ফ ম সারোয়ার আলোচনায় অংশ নেন। সভাপতিত্ব করেন বিএমইউয়ের ডিপার্টমেন্ট অব পাবলিক হেলথের চেয়ারম্যান মো. আতিকুল হক।