
নভূমি ধ্বংস, আবাসস্থল সংকোচন, অপরিকল্পিত বসতি স্থাপন এবং কৃষিজমি সম্প্রসারণের ফলে কক্সবাজার অঞ্চলে মানুষ ও বন্যপ্রাণীর (বিশেষ করে এশীয় হাতি) মধ্যকার সংঘাত দিন দিন ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। এই সংকট মোকাবিলায় এবং মানুষ ও বন্যপ্রাণীর নিরাপদ সহাবস্থান নিশ্চিত করতে কক্সবাজারে একটি নতুন সমন্বিত প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) অর্থায়নে এবং যৌথ এই প্রকল্পের আওতায় মাঠপর্যায়ে সক্রিয়ভাবে কাজ করে যাচ্ছে শীর্ষস্থানীয় সংরক্ষণ সংস্থা অরণ্যক ফাউন্ডেশন।
রোহিঙ্গা সংকট ও স্থানীয় জনবসতি বৃদ্ধির কারণে কক্সবাজারের পাহাড় ও বনাঞ্চলের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হয়েছে। এর ফলে বন্যপ্রাণীরা তাদের প্রথাগত চলাচলের পথ ও নিরাপদ আবাসস্থল হারিয়ে প্রায়শই লোকালয়ে চলে আসছে। এতে একদিকে যেমন মানুষের জীবন ও ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে, অন্যদিকে বন্যপ্রাণীগুলোও সংঘাতের শিকার হয়ে মারা যাচ্ছে।
এই বাস্তব সমস্যা সমাধানে বাংলাদেশ বন অধিদপ্তর ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে সংশ্লিষ্ট বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলো। প্রকল্পের আওতায় মাঠপর্যায়ে তাৎক্ষণিক সাড়া দিতে এবং মানুষকে সুরক্ষা দিতে স্থানীয় যুবকদের নিয়ে গঠিত ওয়াইল্ডলাইফ রেসপন্স টিম বা হাতি মোকাবিলা দলগুলোকে বিশেষ প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম প্রদান করা হচ্ছে।
মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম সম্পর্কে অরণ্যক ফাউন্ডেশনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, বনের ভেতর খাবারের তীব্র সংকট থাকায় হাতিগুলো প্রায়ই লোকালয়ে ছুটে আসে। এই সংঘাত কমাতে তারা কৃষকদের মধ্যে হাতির অপছন্দ এমন ফসল (যেমন—লেবু জাতীয় ফল, মরিচ ইত্যাদি) চাষে উৎসাহিত করছেন। এছাড়া প্রাকৃতিকভাবে তৈরি জৈব-বেড়া বা বায়ো-ফেন্সিংয়ের মাধ্যমে ফসলের খেত ও লোকালয় সুরক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা স্থানীয় কৃষকদের মাঝে বেশ সাড়া ফেলেছে।
সেই সঙ্গে প্রযুক্তির ব্যবহার ও প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় জোরদার করতে জাতীয় মানব-বন্যপ্রাণী দ্বন্দ্ব নিরসন প্রটোকল পর্যালোচনা ও যুগোপযোগী করা হচ্ছে। পাশাপাশি আগাম সতর্কবার্তা আদান-প্রদান এবং ঘটনা দ্রুত জানানোর পদ্ধতি উন্নত করা হচ্ছে যাতে যেকোনো জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়।
প্রযুক্তিগত কার্যক্রমের পাশাপাশি স্থানীয় সম্প্রদায় ও স্কুল পর্যায়ে সচেতনতামূলক প্রচারণা, বিশেষ মহড়া এবং বন্যপ্রাণীর মুখোমুখি হলে করণীয় সম্পর্কে নিরাপদ আচরণ বিষয়ক প্রশিক্ষণ পরিচালনা করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, স্থানীয় জনসাধারণ, বন বিভাগ এবং উন্নয়ন অংশীদারদের এমন সমন্বিত উদ্যোগ কক্সবাজারের জীববৈচিত্র্য রক্ষার পাশাপাশি মানুষ ও বন্যপ্রাণীর সংঘাত কমাতে দীর্ঘমেয়াদী ভূমিকা রাখবে।