
মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘায়িত ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা, বিশ্ব জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এবং আসন্ন অতি শক্তিশালী এল নিনোর সম্মিলিত প্রভাবে মারাত্মক শ্লথগতি ও বহুমাত্রিক সংকটের মুখে পড়তে যাচ্ছে এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনীতি। এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (এডিবি) সদ্য প্রকাশিত ‘এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট আউটলুক (সেপ্টেম্বর ২০২৬)’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এই উদ্বেগজনক পরিসংখ্যান ও তথ্যচিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়েছে, সাপ্লাই চেইনে বিঘ্ন, মূল্যস্ফীতির চাপ এবং কৃষি ও উৎপাদন খাতে এল নিনোর নেতিবাচক প্রভাব এই অঞ্চলের প্রবৃদ্ধির গতিকে কেবল মন্থরই করবে না, বরং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকেও এক গভীর অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দেবে।
চলমান মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দামে বড় ধরনের ঊর্ধ্বমুখী চাপ তৈরি হয়েছে। এডিবি তাদের নতুন মূল্যায়নে ২০২৬ সালের জন্য ব্রেন্ট ক্রুডের দাম বাড়িয়ে প্রতি ব্যারেল ৯০ মার্কিন ডলার এবং ২০২৭ সালের জন্য ৭৮ মার্কিন ডলার নির্ধারণ করেছে। কেবল কাঁচা তেলই নয়, পরিশোধিত জ্বালানি যেমন ডিজেল এবং জেট ফুয়েলের দাম অপরিশোধিত তেলের তুলনায় আরও বেশি হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।
এশিয়ার অধিকাংশ উদীয়মান অর্থনীতি আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় এই জ্বালানি শক তাদের উৎপাদন খরচ এবং সামগ্রিক মূল্যস্ফীতিকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। যদিও অনেক সরকার ভর্তুকি ও মূল্য নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ভোক্তাদের স্বস্তি দেওয়ার চেষ্টা করছে, তবে এই দীর্ঘস্থায়ী ব্যয় রাষ্ট্রীয় কোষাগারের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে। এই পরিস্থিতিতে উদীয়মান বাজারগুলোতে উচ্চ ঋণ এবং মুদ্রাস্ফীতির বোঝা কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর জন্য সুদের হার নির্ধারণ ও মুদ্রানীতি পরিচালনা করা দুরূহ করে তুলেছে।
প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে যে, ২০২৬ সালের শেষ দিক থেকে শুরু হয়ে ২০২৭ সাল পর্যন্ত স্থায়ী হতে যাওয়া অতি শক্তিশালী এল নিনো এশিয়ার কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় ধরণের হুমকি তৈরি করবে। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) এবং মার্কিন জাতীয় মহাসাগর ও বায়ুমণ্ডলীয় প্রশাসন (এনওএএ)-এর আগস্ট ২০২৬-এর পূর্বাভাস অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর ২০২৬ থেকে ফেব্রুয়ারি ২০২৭-এর মধ্যে অতি শক্তিশালী এল নিনো সংঘটিত হওয়ার সম্ভাবনা ৯০ শতাংশেরও বেশি। অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে যে ইভেন্টটি ঘটতে চলেছে, তা ১৯৫০ সালের পর থেকে অতীতের সমস্ত রেকর্ড ছাড়িয়ে যেতে পারে। এর পাশাপাশি ভারত মহাসাগরের ডাইপোল-এর ইতিবাচক প্রভাব এই অঞ্চলের খরা, বন্যা ও দাবানলের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে।
ঐতিহাসিকভাবে দেখা গেছে, শক্তিশালী এল নিনো সমাপ্ত হওয়ার পরের মাসগুলোতে আন্তর্জাতিক বাজারে পাম অয়েল, কাঁচা চিনি এবং থাই চালের মতো প্রধান খাদ্যপণ্যের দাম রেকর্ড পরিমাণে বৃদ্ধি পায়। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় খরা এবং অনাবৃষ্টির কারণে ধানের চাষ এবং রেইনফেড কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এর ফলে একদিকে যেমন খাদ্য সরবরাহ শৃঙ্খল ব্যাহত হবে, অন্যদিকে খাদ্যপণ্যের চড়া দাম সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে আরও দুর্বিষহ করে তুলবে।
জ্বালানি সংকট ও জলবায়ু পরিবর্তনের দ্বিমুখী প্রভাবে উন্নয়নশীল এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি শ্লথ হয়ে আসছে। এই অঞ্চলে প্রবৃদ্ধি ২০২৫ সালের ৫.৫ শতাংশ থেকে কমে ২০২৬ সালে ৫ শতাংশে নেমে আসবে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে এবং ২০২৭ সালে এটি সামান্য বেড়ে ৫.১ শতাংশ হতে পারে। ভারতের শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও প্রযুক্তি-সংক্রান্ত পণ্য রপ্তানির প্রবৃদ্ধি সামগ্রিক অর্থনীতিকে কিছুটা টেনে ধরে রাখলেও অন্যান্য উপ-অঞ্চলে এর নেতিবাচক প্রভাব স্পষ্ট। অঞ্চলটির গড় মূল্যস্ফীতি ২০২৬ সালে ৪.২ শতাংশ এবং ২০২৭ সালে ৩.৫ শতাংশে দাঁড়াতে পারে বলে প্রাক্কলন করা হয়েছে, যা মহামারীর আগের স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় বেশ উঁচুতে অবস্থান করছে।
এদিকে এল নিনো ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট দাবদাহ এবং অনাবৃষ্টি কেবল কৃষিতেই সীমাবদ্ধ থাকছে না, বরং এটি শ্রম উৎপাদনশীলতা এবং শিল্প উৎপাদনকেও ক্ষতিগ্রস্ত করছে। চরম তাপপ্রবাহের কারণে খোলা আকাশের নিচের কাজ—যেমন কৃষি, নির্মাণ ও অনানুষ্ঠানিক শ্রমবাজারে—কার্যঘণ্টা ও শ্রমিকের কর্মক্ষমতা মারাত্মকভাবে হ্রাস পাচ্ছে। এর ফলে এশিয়ার উদীয়মান শ্রমবাজারগুলোতে দীর্ঘমেয়াদী উৎপাদনশীলতার ক্ষতি হচ্ছে। পাশাপাশি, মেকং নদী অববাহিকা সহ বিভিন্ন প্রধান অববাহিকায় জলবিদ্যুৎ উৎপাদন হ্রাসের ফলে দেশগুলোকে জীবাশ্ম জ্বালানি বা কয়লার ওপর অতিরিক্ত নির্ভর করতে হচ্ছে, যা সার্বিক জ্বালানি মূল্য আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
একই সঙ্গে তীব্র গরমে এয়ার কন্ডিশনিংয়ের চাহিদা বহুগুণ বেড়ে যাওয়ায় বিদ্যুৎ গ্রিডগুলো চরম চাপের মুখে পড়ছে এবং সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনও অনেক অঞ্চলে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশুদ্ধ পানির সংকট এবং খরাজনিত পরিবেশের কারণে মশাবাহিত ও পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব বেড়ে যাওয়ায় জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। সরবরাহ শৃঙ্খলে বিঘ্ন ঘটার কারণে কলকারখানায় কাঁচামালের ঘাটতি দেখা দিচ্ছে, যা সামগ্রিক শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধিকে শ্লথ করে দিচ্ছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতি:
এশিয়ার এই সামগ্রিক অর্থনৈতিক ও জলবায়ু সংকটের প্রভাব থেকে বাংলাদেশও মুক্ত নয়। এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের প্রতিবেদনে বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতির বর্তমান অবস্থা এবং আগামী দিনের কিছু পূর্বাভাস তুলে ধরা হয়েছে।
জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার: সমাপ্ত ২০২৬ অর্থবছরে (যা জুনে শেষ হয়েছে) বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি প্রাক্কলন করা হয়েছে ৩.৭ শতাংশ, যেখানে কৃষি ও সেবা খাতের স্থিতিশীলতা শিল্প খাতের শ্লথগতিকে কিছুটা পুষিয়ে দিয়েছে। তবে আগামী ২০২৭ অর্থবছরের জন্য প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়ে ৪ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে (যা এর আগের পূর্বাভাসে ৪.৫ শতাংশ ছিল)। সরকারের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় এটি বেশ কম।
মূল্যস্ফীতির চাপ: বিগত অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে ৮.৭ শতাংশে নামলেও, ২০২৭ অর্থবছরে তা আবার বেড়ে ৯.০ শতাংশে পৌঁছাতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে (যা পূর্বের পূর্বাভাসে ৮.৮ শতাংশ ছিল)। বিশ্ববাজারে জ্বালানি ও আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং এল নিনোর কারণে খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ার দীর্ঘমেয়াদী প্রভাবেই এই মূল্যস্ফীতি ঊর্ধ্বমুখী থাকবে।
চলতি হিসাবের ঘাটতি ও বৈদেশিক খাত: আমদানির গতি রপ্তানির তুলনায় কিছুটা বৃদ্ধি পাওয়ায় এবং জ্বালানি আমদানির চাপ থাকায় চলতি হিসাবের ঘাটতি জিডিপির জিরো দশমিক ৬ শতাংশে উন্নীত হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। তবে শক্তিশালী রেমিট্যান্স প্রবাহ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও বৈদেশিক খাতের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে বড় ভূমিকা পালন করছে।
বিনিয়োগ ও অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ: দুর্বল ব্যাংক খাত, তরলতার সংকট, উচ্চ সুদের হার এবং সরকারি খাতের অভ্যন্তরীণ ঋণ বৃদ্ধির কারণে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ ও বিনিয়োগ কিছুটা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এডিবি উল্লেখ করেছে যে, এই কাঠামোগত দুর্বলতাগুলো কাটিয়ে উঠতে আর্থিক ও ব্যাংক খাতে দ্রুত শৃঙ্খলা ফেরানো অত্যন্ত জরুরি।
এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (এডিবি) প্রধান অর্থনীতিবিদ আলবার্ট পার্ক প্রতিবেদনটি প্রকাশের সময় আয়োজিত মূল মূল্যায়নে উল্লেখ করেছেন যে, বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ‘ঝুঁকিগুলো এখনও নিম্নমুখী প্রবণতার দিকেই রয়েছে’। তিনি সতর্ক করে বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক সংঘাতের জেরে জ্বালানি বাজারের দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা এবং আসন্ন অতি শক্তিশালী এল নিনোর প্রভাবে সাধারণ মানুষ ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো আগামী দিনগুলোতে বড় ধরনের চাপের মুখে পড়তে পারে।
তবে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে জানান, আঞ্চলিক প্রবৃদ্ধি কিছুটা শ্লথ হলেও ইলেকট্রনিক্স এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা প্রযুক্তি-সংক্রান্ত পণ্যের জোরালো চাহিদা এবং শক্তিশালী নিট রপ্তানি এশিয়ার অর্থনীতিকে কিছুটা হলেও টেনে ধরে রাখতে সহায়তা করছে।
অন্যদিকে, বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা এবং বৈশ্বিক জলবায়ু বিশ্লেষকরা এল নিনোর প্রপঞ্চ ও এর অর্থনৈতিক পরিণতি নিয়ে তাদের মূল্যায়নে বলেছেন যে, ২০২৬ সালের শেষ দিক থেকে শুরু হয়ে ২০২৭ সাল পর্যন্ত স্থায়ী হতে যাওয়া এই অতি শক্তিশালী এল নিনো গত কয়েক দশকের সমস্ত রেকর্ড ছাড়িয়ে যেতে পারে। আবহাওয়া ও কৃষি অর্থনীতি বিশেষজ্ঞরা তীব্র খরা ও অনাবৃষ্টির কারণে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় প্রধান খাদ্যশস্যের উৎপাদন ব্যাপকভাবে ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
তাদের মতে, এর ফলে আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ বাজারে খাদ্যপণ্যের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাবে, যা উন্নয়নশীল দেশগুলোর মুদ্রাস্ফীতিকে দীর্ঘমেয়াদে উর্ধ্বমুখী রাখবে এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তুলবে।
নীতিনির্ধারকদের করণীয় :
বর্তমান বৈশ্বিক অস্থিরতা এবং জলবায়ু সংকট মোকাবেলায় এশিয়ার দেশগুলোর পাশাপাশি বাংলাদেশকে কিছু সুনির্দিষ্ট ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। যেমন- এল নিনোর মতো চরম আবহাওয়া মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতি এবং কৃষি ও জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ খাতগুলোতে পূর্বাভাসভিত্তিক অর্থায়ন নিশ্চিত করতে হবে। জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমা এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের প্রসারে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে এবং আঞ্চলিক গ্রিড ইন্টারকানেকশন জোরদার করতে হবে। এবং ব্যাংকিং খাতের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, রাজস্ব আহরণ বাড়ানো এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও ঋণ ব্যবস্থাপনা নিয়ন্ত্রণে সুনির্দিষ্ট সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতি প্রণয়ন করতে হবে।
সামগ্রিকভাবে, এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর এই প্রতিবেদনটি স্পষ্ট করে যে, আগামী দিনগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তন এবং জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এশিয়ার উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য বড় ধরনের পরীক্ষা হতে চলেছে। এই পরিস্থিতি সফলভাবে মোকাবিলা করতে আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং সময়োপযোগী অভ্যন্তরীণ সংস্কারের বিকল্প নেই।