ঢাকাশনিবার , ১৪ মার্চ ২০২৬
  • অন্যান্য

আসন্ন বাজেটের প্রেক্ষাপটে তামাক কর জোরদারের আহ্বান বিশেষজ্ঞদের

নিজস্ব প্রতিবেদক
মার্চ ১৪, ২০২৬ ১২:০৪ অপরাহ্ণ । ৮ জন

আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটকে সামনে রেখে জনস্বাস্থ্য রক্ষা ও রাজস্ব ঘাটতি মেটাতে তামাকজাত পণ্যের কর ও মূল্য বৃদ্ধির জোর দাবি জানিয়েছেন অর্থনীতিবিদ ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, তামাক কর কাঠামোর সঠিক সংস্কার করা হলে অতিরিক্ত প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব অর্জন সম্ভব, যা দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত জরুরি।

বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) রাজধানীর পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (PPRC)-এর কার্যালয়ে সাংবাদিক ও তামাক নিয়ন্ত্রণ কর্মীদের জন্য আয়োজিত এক ওরিয়েন্টেশন কর্মশালায় এই প্রস্তাবনা তুলে ধরা হয়। প্রস্তাবনাটি যৌথভাবে প্রণয়ন করেছে ইকোনমিক্স ফর হেলথ, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO), ক্যাম্পেইন ফর টোব্যাকো-ফ্রি কিডস (CTFK), ভাইটাল স্ট্র্যাটেজিস এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব হেলথ ইকোনমিক্স (IHE)।

সেশনে মূল উপস্থাপনা দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব হেলথ ইকোনমিক্সের অধ্যাপক ও পরিচালক ড. শাফিউন এন. শিমুল। তিনি প্রস্তাবিত সংস্কারের মাধ্যমে সম্ভাব্য অতিরিক্ত রাজস্ব কীভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে তার পদ্ধতি ব্যাখ্যা করেন। তিনি উল্লেখ করেন, প্রতিবেশী অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশে সিগারেটের দাম এখনো তুলনামূলকভাবে কম, ফলে তামাকজাত পণ্য সহজলভ্য হয়ে পড়েছে এবং এর ব্যবহারও বেশি। সাম্প্রতিক গবেষণার তথ্য তুলে ধরে তিনি জানান, দেশের সিগারেট বাজারের প্রায় ৯০ শতাংশই নিম্ন ও মধ্যম মূল্যের সিগারেট দ্বারা দখল হয়ে আছে, যা সহজলভ্য হওয়ার কারণে ব্যবহার বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর ফলে জনস্বাস্থ্য খাত মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তামাকজনিত রোগের কারণে প্রতিবছর প্রায় ৮৭ হাজার কোটি টাকা স্বাস্থ্যব্যয় হয়। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, তামাক কর বৃদ্ধি জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে।

এই প্রেক্ষাপটে আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের জন্য তামাকজাত পণ্যের মূল্য ও কর কাঠামোতে সংস্কারের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী নিম্ন ও মধ্যম স্তরের সিগারেট একীভূত করে প্রতি ১০ শলাকার সিগারেটের প্যাকেটের ন্যূনতম মূল্য ১০০ টাকা নির্ধারণ এবং সিগারেটের সব মূল্যস্তরে সমানভাবে প্রতি ১০ শলাকার প্যাকেটে ৪ টাকা নির্দিষ্ট কর (Specific Tax) আরোপের সুপারিশ করা হয়েছে। ড. শিমুল তামাক কর নিয়ে প্রচলিত বিভিন্ন ভুল ধারণা সম্পর্কেও আলোচনা করেন। তিনি বলেন, তামাক কর বাড়ালে সরকারের রাজস্ব কমে যাবে-এমন দাবির পক্ষে শক্ত কোনো প্রমাণ নেই। বরং প্রস্তাবিত কর সংস্কার বাস্তবায়িত হলে আগের অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত রাজস্ব অর্জন করা সম্ভব, যা জনস্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ করা যেতে পারে। এছাড়া কর বৃদ্ধি করা হলে প্রায় চার লাখ কিশোর-কিশোরী তামাকের আসক্তি থেকে শুরুতেই সুরক্ষিত থাকতে পারে।

অংশগ্রহণকারীদের কেউ কেউ কর বৃদ্ধির ফলে স্থানীয় তামাক কোম্পানি ও তাদের কর্মীদের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। জবাবে ড. শাফিউন এন. শিমুল জানান, প্রস্তাবিত কর কাঠামো পূর্ববর্তী বছরের প্রবণতা বিবেচনা করে নির্ধারণ করা হয়েছে এবং এতে দেশীয় তামাক শিল্পের টিকে থাকার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা হয়েছে। তিনি বলেন, এই প্রস্তাব মূলত শিল্পের কম মুনাফার অংশকে লক্ষ্য করে তৈরি করা হয়েছে, একই সঙ্গে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।

অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, তামাক নিয়ন্ত্রণকে একটি বৃহত্তর গণতান্ত্রিক নীতি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে দেখা উচিত। তিনি বলেন, “তামাক নিয়ন্ত্রণ মানে কাউকে নিষিদ্ধ করা বা ধূমপায়ীদের শাস্তি দেওয়া নয়; বরং কর, বিক্রয় নিয়ন্ত্রণ ও বিজ্ঞাপন সীমিতকরণের মতো নীতিগত উপায় ব্যবহার করে জনকল্যাণ নিশ্চিত করা।”

তিনি আরও বলেন, এটি মূলত সংকীর্ণ মুনাফাকেন্দ্রিক স্বার্থ ও বৃহত্তর জনস্বার্থের মধ্যে একটি প্রতিযোগিতা, যেখানে সমাজকে জনস্বার্থের পক্ষেই দৃঢ়ভাবে অবস্থান নিতে হবে। তিনি গণমাধ্যমের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার ওপরও জোর দিয়ে বলেন, তামাক নিয়ন্ত্রণ একটি চলমান ধারণা ও বর্ণনার প্রতিযোগিতা। এই প্রক্রিয়ায় শক্তিশালী তথ্য ও পরিসংখ্যান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি আরও বলেন, করনীতি সরকারের অন্যতম কার্যকর নীতি-উপকরণ, যা একইসঙ্গে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা ও রাজস্ব বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্বাস্থ্যকর ও উৎপাদনশীল খাতের দিকে স্থানান্তরিত হওয়ার সুযোগও তৈরি হয়।

কর্মশালায় অংশগ্রহণকারীরা বাংলাদেশের বর্তমান রাজস্ব ঘাটতির প্রেক্ষাপটে তামাক কর সংস্কারের জরুরি প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন। তারা বলেন, তামাক কর জোরদার করা শুধু রাজস্ব আহরণের একটি কার্যকর উপায়ই নয়, বরং তামাক ব্যবহার কমিয়ে জনস্বাস্থ্যের উন্নয়নে একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল। কর্মশালার শেষে গবেষক, নীতিনির্ধারক, সাংবাদিক এবং নাগরিক সমাজের মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে এই সংস্কার বাস্তবায়নের আহ্বান জানানো হয়।