
তুলার আমদানি নির্ভরতা কমাতে এবং দেশের বস্ত্র ও পোশাক শিল্পের কাঁচামালের জোগান শক্তিশালী করতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। এর আওতায় ২০৫০ সালের মধ্যে দেশীয় তুলার আঁশ উৎপাদন ১৯ লাখ গাঁটে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
বর্তমানে দেশে বছরে প্রায় ২ দশমিক ২৪ লাখ গাঁট তুলার আঁশ উৎপাদিত হয়, যা দেশের মোট চাহিদার মাত্র ১৬ থেকে ১৭ শতাংশ পূরণ করে। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে উৎপাদন ৫ লাখ গাঁটে এবং ২০৫০ সালের মধ্যে তা ১৯ লাখ গাঁটে উন্নীত করা হবে।
তুলা উন্নয়ন বোর্ডের (সিডিবি) উপ-পরিচালক কুতুব উদ্দিন বলেন, হাইব্রিড তুলার জাত উদ্ভাবন, চাষের জমি সম্প্রসারণ এবং কৃষকদের ধারাবাহিক প্রণোদনার মাধ্যমে এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব। আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি ব্যবহার করে ফলন বাড়ানোরও যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে।
বর্তমানে দেশের প্রায় ৪৫ হাজার হেক্টর জমিতে তুলা চাষ হচ্ছে। তবে তুলা চাষের সম্ভাব্য জমির পরিমাণ প্রায় ২ লাখ হেক্টর। খাদ্য উৎপাদনে প্রভাব না ফেলে চরাঞ্চল, রাজশাহীর বরেন্দ্র অঞ্চল এবং পাহাড়ি এলাকার উপযুক্ত জমিতে তুলা চাষ সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করছে সরকার।
দেশের তৈরি পোশাকশিল্পে প্রতি বছর প্রায় ৯০ লাখ গাঁট কাঁচা তুলার প্রয়োজন হয়। এই বিপুল চাহিদার বিপরীতে দেশে উৎপাদন কম হওয়ায় প্রতিবছর ৭৫ থেকে ৮০ লাখ গাঁট তুলা আমদানি করতে হয়।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে প্রায় ৭৩ লাখ গাঁট কাঁচা তুলা আমদানি করা হয়েছে। এতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা। ফলে দেশীয় উৎপাদন বাড়িয়ে আমদানিনির্ভরতা কমানোর বিষয়টি সরকারের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সিডিবির কর্মকর্তারা বলছেন, ২০৩০ সালের মধ্যে দেশীয় তুলার আঁশ উৎপাদন ৫ লাখ গাঁটে উন্নীত করা সম্ভব হলে আমদানি নির্ভরতা কিছুটা কমবে এবং বছরে প্রায় ৮০০ কোটি টাকা বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হতে পারে।
এ লক্ষ্যে তুলা চাষিদের প্রণোদনা, কৃষক কার্ড কর্মসূচিতে তাদের অন্তর্ভুক্ত করা এবং কার্বন ট্রেডিংয়ের মাধ্যমে ঋণ সুবিধা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে তুলা চাষে প্রণোদনা হিসেবে ২০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে।
তুলা উন্নয়ন বোর্ডের মৃত্তিকা উর্বরতা ও পানি ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ ড. এম গাজী গোলাম মুর্তুজা জানান, ২৬ জেলার প্রায় ২৫ হাজার প্রান্তিক কৃষককে এক বিঘা জমিতে আন্তঃফসল হিসেবে তুলা চাষের জন্য উন্নত বীজ, সার ও কীটনাশক দেওয়া হবে। উৎপাদন খরচ কমিয়ে কৃষকের লাভ বাড়ানোই এ উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।
তুলা উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী পরিচালক মো. রেজাউল আমিন বলেন, তুলা চাষ কৃষকদের জন্য অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক। এক বিঘা জমিতে তুলা উৎপাদনে প্রায় ১৫ হাজার টাকা খরচ হয়। ভালো ফলন হলে প্রায় ১৫ মণ কাঁচা তুলা পাওয়া যায়, যার মূল্য প্রায় ৬০ হাজার টাকা হতে পারে।
তবে তুলা চাষে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে চাষযোগ্য জমির সংকট, অন্যান্য লাভজনক ফসলের সঙ্গে প্রতিযোগিতা, দীর্ঘ উৎপাদন সময়, জলবায়ু পরিবর্তন, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, বাজারদরের ওঠানামা ও কীটপতঙ্গের আক্রমণ।
সিডিবির উপ-পরিচালক ড. মো. তাসদিকুর রহমান বলেন, এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা, আধুনিক প্রযুক্তি এবং সরকারের ধারাবাহিক বিনিয়োগ প্রয়োজন। পাশাপাশি তুলা চাষের জমি বাড়ানো, মূল্য সহায়তা ও বিশেষ কৃষিঋণের মতো উদ্যোগও জরুরি।
সাধারণত জুনের মাঝামাঝি তুলার বীজ বপন করা হয় এবং ডিসেম্বরের দিকে ফসল সংগ্রহ করা হয়। সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, উন্নত বীজ, আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতি ও উচ্চফলনশীল জাতের ব্যবহার বাড়ানো গেলে উৎপাদন আরও বাড়ানো সম্ভব।
তুলা উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা আশা করছেন, সরকারের ধারাবাহিক সহায়তা, আধুনিক প্রযুক্তি ও কৃষকদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর মাধ্যমে দেশে তুলার উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। এতে একদিকে কৃষকের আয় বাড়বে, অন্যদিকে কাঁচা তুলার আমদানি ব্যয় কমিয়ে দেশের বস্ত্র ও পোশাকশিল্পকে আরও শক্তিশালী করা সম্ভব হবে।