
পৃথিবীর প্রতিটি কোণেই মানুষের কৌতূহল তাকে টেনে নিয়ে যায় নতুন শহরে, নতুন প্রাকৃতিক দৃশ্যে এবং ভিন্ন সংস্কৃতির অভিজ্ঞতায়। মহামারির নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে উঠেই বিশ্বজুড়ে ভ্রমণ যেন এক নতুন জোয়ারে ভেসে গেছে। বিমানবন্দরগুলো এখন মৌমাছির চাকের মতো গমগম করছে, ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো আবারও সেলফি স্টিকের ভিড়ে মুখর, আর স্থানীয় রেস্টুরেন্টগুলোতে আবারও পর্যটকদের পদচারণা। জাতিসংঘের বিশ্ব অর্থনৈতিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০২৪ সালে বৈশ্বিক পর্যটন বেড়েছে প্রায় ২.৯ শতাংশ। এ যেন প্রমাণ করছে, মানুষকে ভ্রমণ থেকে আটকানো সম্ভব নয়।
২০২৪ সালের হিসাব অনুযায়ী বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ভ্রমণকারী যে দশটি দেশে গিয়েছে, সেখানে একদিকে আছে ইউরোপের ঐতিহ্যবাহী শক্তিশালী দেশগুলো, অন্যদিকে আছে এশিয়া ও আমেরিকার বহুবর্ণিল সংস্কৃতির দেশ। এসব দেশ শুধু সুন্দর প্রাকৃতিক দৃশ্যই নয়, বরং পর্যটন অবকাঠামো, পরিবহন, খাবার, ইতিহাস ও আধুনিক বিনোদনের সমন্বয় ঘটিয়েছে।
তালিকার শীর্ষে অবস্থান করছে ফ্রান্স। প্রায় ৮৯.৪ মিলিয়ন মানুষ দেশটিতে ভ্রমণ করেছে ২০২৪ সালে। রাজধানী প্যারিসের আইফেল টাওয়ার কিংবা ল্যুভর মিউজিয়ামের মোনালিসা একাই লক্ষ লক্ষ মানুষকে টানে। কিন্তু ফ্রান্স কেবল প্যারিসেই সীমাবদ্ধ নয়। দক্ষিণে ফ্রেঞ্চ রিভেরা, পশ্চিমে আটলান্টিক উপকূল, আর দেশের অভ্যন্তরে লোয়ার ভ্যালির দুর্গগুলো এক অন্যরকম সৌন্দর্য উপহার দেয়। ফরাসি খাবারও যেন ভ্রমণকারীদের জন্য এক আলাদা যাত্রা—সকালের কফি আর ক্রোসাঁ থেকে শুরু করে দক্ষিণের কাসুলে কিংবা নর্ম্যান্ডির সামুদ্রিক খাবার।

দ্বিতীয় স্থানে স্পেন, যেখানে গিয়েছে প্রায় ৮৩.৭ মিলিয়ন ভ্রমণকারী। বার্সেলোনার গাউদির স্থাপত্য, মাদ্রিদের প্রাদো মিউজিয়াম, আর গ্রানাডার আলহাম্ব্রা প্রাসাদই শুধু নয়, স্পেন মানেই উৎসব আর খাবারের দেশ। টাপাস বারের আড্ডা, লা টমাটিনা টমেটো উৎসব কিংবা পামপ্লোনার ষাঁড় দৌড়—এসবই পর্যটকদের বারবার টেনে আনে। সূর্যস্নাত সমুদ্রসৈকত আর বৈচিত্র্যময় প্রদেশগুলো স্পেনকে করে তুলেছে ইউরোপের শীর্ষ গন্তব্য।

তৃতীয় স্থানে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, যেখানে ভ্রমণ করেছে প্রায় ৭৯.৩ মিলিয়ন মানুষ। নিউইয়র্কের স্কাইলাইন, লাস ভেগাসের ঝলমলে আলো, ক্যালিফোর্নিয়ার সমুদ্রসৈকত কিংবা ইয়েলোস্টোনের জাতীয় উদ্যান—সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্র এক বিশাল অভিজ্ঞতার ভান্ডার। পরিবারভিত্তিক পর্যটনে থিম পার্কগুলো যেমন ওয়াল্ট ডিজনি ওয়ার্ল্ড বিশেষ আকর্ষণ, তেমনি বৈচিত্র্যময় খাবার যেমন টেক্সাস বারবিকিউ বা নিউ অরলিন্সের কেজুন কুইজিন ভ্রমণকে সমৃদ্ধ করে।

চতুর্থ স্থানে চীন, যেখানে গিয়েছে প্রায় ৬৫.৭ মিলিয়ন ভ্রমণকারী। প্রাচীন মহাপ্রাচীর, বেইজিংয়ের ফরবিডেন সিটি কিংবা সাংহাইয়ের আধুনিক স্কাইলাইন—চীনের বৈচিত্র্য বিস্ময়কর। দ্রুতগতির ট্রেন আর আধুনিক অবকাঠামো চীনকে করে তুলেছে ভ্রমণবান্ধব। আবার সিচুয়ানের ঝাল খাবার থেকে শুরু করে ক্যান্টনিজ ডিম সাম পর্যন্ত খাদ্যরসিকদের জন্য চীন এক অভূতপূর্ব অভিজ্ঞতা।

ইতালি পঞ্চম স্থানে, যেখানে ভ্রমণ করেছে ৬৪.৫ মিলিয়ন মানুষ। রোমের প্রাচীন কলোসিয়াম, ভ্যাটিকানের সিস্টিন চ্যাপেলের শিল্পকর্ম, ভেনিসের খালপথ কিংবা ফ্লোরেন্সের রেনেসাঁস—সবই ইতালিকে এক জীবন্ত জাদুঘরে পরিণত করেছে। ইতালিয়ান খাবারও পৃথিবীব্যাপী খ্যাত—নেপোলিটান পিজা, পাস্তা বা জেলাটো যেন পর্যটনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

ষষ্ঠ স্থানে তুরস্ক, যেখানে এসেছে ৫১.২ মিলিয়ন ভ্রমণকারী। ইস্তানবুলের হাজিয়া সোফিয়া আর ব্লু মসজিদ, কাপাদোকিয়ার বেলুন ভ্রমণ কিংবা ভূমধ্যসাগরের উপকূলীয় সৈকত—তুরস্ক যেন ইউরোপ ও এশিয়ার সংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে থাকা এক সেতুবন্ধ। এখানকার বাজার, খাবার এবং ঐতিহ্য পর্যটকদের জন্য অনন্য অভিজ্ঞতা তৈরি করে।

মেক্সিকো সপ্তম স্থানে, যেখানে এসেছে ৪৫ মিলিয়ন মানুষ। রিভিয়েরা মায়ার সৈকত, মেক্সিকো সিটির ইতিহাস আর ডে অব দ্য ডেড উৎসব ভ্রমণকারীদের আকর্ষণ করে। ইউনেস্কো স্বীকৃত মেক্সিকান খাবার যেমন টাকো বা মোল সস বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয়।

অষ্টম স্থানে থাইল্যান্ড, ৩৯.৮ মিলিয়ন পর্যটক নিয়ে। ব্যাংককের মন্দির, ফুকেটের সৈকত কিংবা ফাং নাগা বে-র নাটকীয় প্রাকৃতিক দৃশ্য ভ্রমণকারীদের মুগ্ধ করে। এখানকার স্ট্রিট ফুড সংস্কৃতি আর আতিথেয়তা ভ্রমণকে করে তুলেছে সহজ ও প্রাণবন্ত।

নবম স্থানে জার্মানি, যেখানে ভ্রমণ করেছে ৩৯.৬ মিলিয়ন মানুষ। বার্লিনের ইতিহাস, মিউনিখের অক্টোবারফেস্ট, নইশভানস্টাইন দুর্গ কিংবা ক্রিসমাস মার্কেট—সবই জার্মানিকে বৈচিত্র্যময় অভিজ্ঞতার দেশ করে তুলেছে।

দশম স্থানে রয়েছে যুক্তরাজ্য, যেখানে গিয়েছে ৩৯.৪ মিলিয়ন মানুষ। লন্ডনের বাকিংহাম প্যালেস, ব্রিটিশ মিউজিয়াম, এডিনবারার ঐতিহাসিক রাস্তা কিংবা শেক্সপিয়ারের শহর—সব মিলিয়ে যুক্তরাজ্য যেন ঐতিহ্য আর আধুনিকতার মিলনস্থল।

সবশেষে বলা যায়, ২০২৫ সালে ভ্রমণকারীদের জন্য পৃথিবী এক নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত করেছে। কোথাও ইউরোপের ক্যাফের পাশে বসে কফি চুমুক, কোথাও এশিয়ার সমুদ্রসৈকতে সূর্যাস্ত দেখা, আবার কোথাও নতুন ভাষার অদ্ভুত উচ্চারণ শেখার চেষ্টা—সবই ভ্রমণকে করে তোলে এক অবিস্মরণীয় অভিজ্ঞতা।