ঢাকাসোমবার , ২ মার্চ ২০২৬
  • অন্যান্য

হরমুজ প্রণালী বন্ধের প্রভাব: বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা

নিজস্ব প্রতিবেদক
মার্চ ২, ২০২৬ ১১:৩১ পূর্বাহ্ণ । ২৩৪ জন

হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই জ্বালানি রুট দিয়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) পরিবাহিত হয়। বিশ্লেষকদের মতে, প্রণালীটি দীর্ঘ সময়ের জন্য অচল থাকলে আন্তর্জাতিক অর্থনীতি বড় ধরনের চাপের মুখে পড়তে পারে।

কেন গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী

বিশ্বের মোট তেলের প্রায় ২০ শতাংশ হরমুজ প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইরাক, কুয়েত ও ইরানসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর প্রধান রপ্তানি রুট এটি। পাশাপাশি কাতারের অধিকাংশ এলএনজি রপ্তানিও এই পথেই আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছে।

জ্বালানি বিশ্লেষকদের মতে, এ পথ বন্ধ বা দীর্ঘ সময় ব্যাহত হলে বিশ্ববাজারে সরবরাহ হঠাৎ কমে যেতে পারে, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে আন্তর্জাতিক তেলের দামে।

কোন দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে

চীন, ভারত, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো এশিয়ার বড় আমদানিকারক দেশগুলো উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ তেল আমদানি করে। হরমুজ প্রণালীতে অচলাবস্থা তৈরি হলে এসব দেশে জ্বালানির দাম বাড়তে পারে। এতে শিল্প উৎপাদন ব্যয় ও বিদ্যুৎ খরচ বৃদ্ধি পেয়ে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ইউরোপের জ্বালানি নিরাপত্তা

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর ইউরোপ জ্বালানি উৎসে বৈচিত্র্য আনার চেষ্টা করছে। তবে মধ্যপ্রাচ্যের তেল ও কাতারের এলএনজি এখনো ইউরোপের জন্য গুরুত্বপূর্ণ উৎস। সরবরাহ ব্যাহত হলে ইউরোপের জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের পরোক্ষ প্রভাব

যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি মধ্যপ্রাচ্যের তেলের ওপর আগের তুলনায় কম নির্ভরশীল হলেও বৈশ্বিক বাজারে তেলের দাম বাড়লে তার প্রভাব মার্কিন অর্থনীতিতেও পড়ে। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ভোক্তা ব্যয়, পরিবহন খরচ ও মুদ্রাস্ফীতিকে প্রভাবিত করতে পারে।

উপসাগরীয় রপ্তানিকারক দেশগুলোর চ্যালেঞ্জ

সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত ও ইরাকের মতো দেশগুলো সরাসরি রপ্তানি বিঘ্নের মুখে পড়তে পারে। কিছু বিকল্প পাইপলাইন থাকলেও সেগুলোর সক্ষমতা সীমিত এবং পুরো সরবরাহ বহনের জন্য যথেষ্ট নয়। ফলে দীর্ঘমেয়াদি অচলাবস্থা রপ্তানি আয়ে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

বৈশ্বিক অর্থনীতিতে সম্ভাব্য প্রভাব

সরবরাহ অনিশ্চিত হয়ে পড়লে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত ঊর্ধ্বমুখী হতে পারে, যা জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি করবে। জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে দেয়, যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামে প্রতিফলিত হয় এবং সামগ্রিক মূল্যস্ফীতিকে ত্বরান্বিত করে।

ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রপথে জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হওয়ায় শিপিং ব্যয় বেড়ে যেতে পারে। এর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে যুদ্ধঝুঁকি (ওয়ার রিস্ক) কভারেজসহ সামুদ্রিক বীমার প্রিমিয়াম বৃদ্ধি। কার্গো বিলম্ব, ক্ষতি বা রুট পরিবর্তনের কারণে দাবি বৃদ্ধির সম্ভাবনাও রয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে আর্থিক বাজারেও প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে- বিশেষ করে জ্বালানি, পরিবহন ও বীমা খাতে শেয়ারদরে উল্লেখযোগ্য ওঠানামা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এলএনজি বাজারে বাড়তি চাপ

কাতার বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ এলএনজি রপ্তানিকারক দেশ। এর উল্লেখযোগ্য অংশ হরমুজ প্রণালী হয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছায়। সরবরাহ ব্যাহত হলে এশিয়া ও ইউরোপের গ্যাসনির্ভর বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্প খাতে চাপ বাড়তে পারে। এতে আন্তর্জাতিক গ্যাসের দামও বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

বিকল্প রুট কতটা কার্যকর

উপসাগরীয় কয়েকটি দেশ বিকল্প পাইপলাইন ও রুট ব্যবহার করতে পারে। তবে এসব রুটের ধারণক্ষমতা সীমিত। দীর্ঘমেয়াদি অচলাবস্থা বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে বড় ধরনের ব্যাঘাত ঘটাতে পারে বলে মনে করছেন বাজার বিশ্লেষকরা।

বীমা ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় নতুন বাস্তবতা

পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে সামুদ্রিক বীমা, কার্গো বীমা ও রি-ইনস্যুরেন্স খাতে অতিরিক্ত ঝুঁকি প্রিমিয়াম আরোপ করা হতে পারে। অঞ্চলটিকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হলে সারচার্জ বাড়বে, যা আমদানি-রপ্তানি ব্যয় আরও বৃদ্ধি করবে।

হরমুজ প্রণালীতে অচলাবস্থা কেবল একটি আঞ্চলিক সংকট নয়; এটি বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি। জ্বালানি সরবরাহ, মূল্যস্ফীতি, বাণিজ্য ব্যয় ও বীমা খাত- সবখানেই এর প্রভাব পড়তে পারে। পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে বিশ্ববাজারে আরও গভীর অস্থিরতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।